ছবিতে রোগে আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশু

৮৫ ভাগ রোহিঙ্গা শিশু রোগাক্রান্ত

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে লাইন দিয়ে হাঁটতে থাকা রোহিঙ্গাদের সারি এখন টেকনাফ শহরবাসীর চেনা দৃশ্য। গত ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সে দেশের সোনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপরে যে গণহত্যা ও বিতাড়ন শুরু করেছে, তা এখনো চলছে।

প্রতিদিনই টেকনাফ শহরের নে-টং পাহাড়ের পাশ থেকে দেখা যায়, নাফ নদীর পূর্ব পারে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে। সন্ধ্যার পরে সেই ধোঁয়ার ভেতরে আগুনের শিখাও চোখে পড়ে। আগুন লাগানোর দৃশ্য একেবারে দক্ষিণের সেই শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত নাফ নদীর পাশের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো থেকে থেকে চোখে পড়ে। ঘরবাড়িহারা, দেশ থেকে উৎখাত হওয়া হাজার হাজার শিশু, নারী, জোয়ান, বৃদ্ধ প্রাণ বাঁচাতে প্রায় একরকম শূন্য হাতেই জেলে নৌকায় বঙ্গোপসাগরের প্রান্ত দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে আসছে। সেখান থেকে তাদের বিজিবির তত্ত্বাবধানে সরিয়ে আনা হচ্ছে টেকনাফ ও উখিয়ার নতুন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে।

ইতিমধ্যেই টেকনাফ ও উখিয়ায় প্রায় নতুন আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, এর মধ্যে ৬০ শতাংশই শিশু। এই বিপুল জনস্রোত সামাল দেওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি প্রশাসনের ছিল না। অত্যন্ত দ্রুত বাড়তে থাকা এই জনগোষ্ঠীর আবাসন, খাদ্য, সুপেয় পানি, জ্বালানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসা—এমন মৌলিক চাহিদাগুলোর ব্যবস্থা করার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ কোনোটি প্রশাসনের ছিল না।

প্রাথমিকভাবে অনেকে টেকনাফের লেদা ও নয়াপাড়া এবং উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালির পুরোনো রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠে পড়েন। পরে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবুনিয়া পাহাড়ে এবং উখিয়ার থাইংখালিতে দুটি বড় আকারের আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়। এই দুই আশ্রয়কেন্দ্রে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা তিন লাখের মতো। এ ছাড়া টেকনাফের নেচার ক্যাম্প ও উখিয়ার জামতলি, বাগগুনা, মক্কার বিল প্রভৃতি এলাকায় অনেক ছোট ও মাঝারি বস্তি করে রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন।

এসব আশ্রয়কেন্দ্রের হাজার হাজার আশ্রিত রোহিঙ্গারা সর্দি, জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তারা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফের) শিশু সুরক্ষা প্রধান জ্যঁ লিবে গত মঙ্গলবার আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে কক্সবাজারে এক বিবৃতিতে বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ শিশু এবং এরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। গত কয়েক দিনে আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, এখন এসব শিশু ব্যাপকভাবে ডায়রিয়া, সর্দি, জ্বরসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবুনিয়ার নতুন আশ্রয়কেন্দ্রে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মেডিকেল ক্যাম্প করে চিকিৎসা চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। ক্যাম্পের চিকিৎসক মুজাইয়ান হোসেন বললেন, রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৮৫ জনই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিন এত রোগী আসছে যে তারা তাদের নামের তালিকা করার অবকাশ হচ্ছে না। অধিকাংশই পানিবাহিত রোগ, সর্দি, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত।

উখিয়ার থাইংখালির নতুন আশ্রয়কেন্দ্রের জোবায়ের হোসেনের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনজনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তিনি এসেছেন মংডুর বলি বাজার থেকে। এই আশ্রয়কেন্দ্রের নূর বেগমের দুই মেয়ে ভুগছে সর্দি-জ্বরে। এ আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ রোগে ভুগছে। এখানে আশ্রিতের সংখ্যা এক লাখের বেশি।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় ন্যূনতম তিন দিন থেকে কারও কারও ১২ থেকে ১৩ দিনও সময় লেগেছে। এই দীর্ঘ সময় অর্ধাহার অনাহারে থেকে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। এর পরে বাংলাদেশে এসেও মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে দুই-তিন দিন পেরিয়ে গেছে। এখানে প্রায় প্রতিদিনই হালকা বা মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে। রুগ্‌ণ দুর্বল শরীরে বৃষ্টিতে ভিজে রোহিঙ্গারা জ্বর, সর্দি, নিউমোনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

টেকনাফ ও উখিয়ার কোনো নতুন আশ্রয়কেন্দ্রেই বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের পাশের পাহাড়ি ছড়ার অনিরাপদ ঘোলা পানি খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করছেন।

স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় এড়াতে রোহিঙ্গা শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানান কক্সবাজারে সিভিল সার্জন আবদুস সালাম।

তিনি বলেন, উখিয়াতে ২১টি এবং টেকনাফে ১৫টি এই ৩৬টি সরকারি মেডিকেল টিম জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছে। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি আরও প্রায় অর্ধ শতাধিক সংস্থা ও সংগঠনের মেডিকেল টিম আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বিতরণ করছে।

-প্রথম আলো

 

সম্পাদনা- লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম