নির্বাচনের আগমুহুর্তে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের বিরোধ তুঙ্গে

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

সমিতির নির্বাচনের আগমুহুর্তে এসে চট্টগ্রামে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী নিয়ে দুই ভাগ হয়ে গেছেন আওয়ামীপন্থীরা।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ থেকে সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন পেয়েছিলেন আবু হানিফ। সোমবার (৮ জানুয়ারি) তার মনোনয়ন বাতিল করে সাবেক জেলা পিপি আবুল হাশেমকে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার হাশেমকে নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের একাংশ।

তবে নির্বাচনের ‍একমাস আগে আকস্মিক প্রার্থী পরিবর্তন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মনোনয়ন বাতিল হলেও নির্বাচনের মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন হানিফ। তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন কৌঁসুলিসহ সিনিয়র আইনজীবীদের একাংশ। মঙ্গলবার হানিফকে নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন তারা।

এদিকে আওয়ামীপন্থীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির জন্য জেষ্ঠ্য আইনজীবী ও নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুলেরও সমালোচনা চলছে। হানিফের প্রার্থীতা বাতিলের জন্য সোমবার আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের আন্ত:নির্বাচন পরিচালনা কমিটির (স্টিয়ারিং কমিটি) যে বৈঠক হয় তাতে সভাপতিত্ব করেন বাবুল। মূলত হানিফের প্রার্থীতা পরিবর্তন করে হাশেমকে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে বাবুলই মূখ্য ভূমিকা ‍পালন করেন বলে মনে করছেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের একাংশ।

হানিফের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত যারা মানেননি, তাদের দাবি, বিরোধীপক্ষের একজন প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুলের নিকট আত্মীয়। মূলত তাকে জেতাতেই আওয়ামীপন্থীদের মধ্যে এই বিরোধ তৈরি করেছেন বাবুল।

হানিফ এবং হাশেম-কোনপক্ষেই অবস্থান নেননি জেষ্ঠ্য আইনজীবী ও চট্টগ্রাম মহানগর পিপি ফখরুদ্দিন চৌধুরী। তিনি মনে করেন, আওয়ামীপন্থীদের মধ্যে এই বিভক্তির কারণে প্রতিপক্ষের প্রার্থী জিতে আসবেন।

তবে বিরোধীদের এই সমালোচনাকে পাত্তা দিতে রাজি নন ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল। বার কাউন্সিলের নির্বাচিত এই সদস্য বাংলানিউজকে বলেন, যার কথা বলা হচ্ছে উনি আমার আত্মীয়, ঠিক আছে। কিন্তু গতবারও তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। আমরা তাকে পরাজিত করে আমাদের প্রার্থীকে জিতিয়ে এনেছিলাম। সুতরাং এই সমালোচনার ফয়সালা গতবারই হয়ে গেছে।

‘সাধারণ সম্পাদক ছাড়া প্যানেলের আর কোন পদের প্রার্থী নিয়ে সমস্যা নেই। সমিতির চেম্বার বরাদ্দ নিয়ে যে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তাতে বিতর্কিত হয়েছেন হানিফ। আমরা কোন বোঝা নিয়ে ভোটারের সামনে যেতে চাই না। হাশেম একজন পরিচ্ছন্ন প্রার্থী। তাকে আমরা জিতিয়ে আনতে পারব।’ বলেন বাবুল

আবু হানিফ বর্তমানেও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সমিতির দু’টি ভবনে ৭৩টি চেম্বারের বরাদ্দ নিয়ে হানিফের সঙ্গে সভাপতি রতন রায়ের বিরোধ সৃষ্টি হয়। সভাপতির অবস্থান টেন্ডারের ভিত্তিতে চেম্বার বরাদ্দ দেওয়ার পক্ষে। আর সাধারণ সম্পাদক গঠনতন্ত্র অনুসারে টেন্ডার ছাড়াই চেম্বার বরাদ্দ দিতে আগ্রহী।

এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সভাপতি ৮ জানুয়ারি কার্যনির্বাহী কমিটির সভা আহ্বান করেন। কিন্তু এর আগে সভাপতির নির্দেশক্রমে সাধারণ সম্পাদক ২১ জানুয়ারি সভা ডাকেন। ৮ জানুয়ারি আইনজীবীদের দুপক্ষের হাতাহাতি-মারামারিতে সভাপতির ডাকা সভা ভণ্ডুল হয়ে যায়। এর দুই ঘণ্টার মধ্যে হানিফের মনোনয়ন বাতিল করে হাশেমকে প্রার্থীতা ঘোষণা করা হয়।

তবে এই সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক আখ্যায়িত করে মঙ্গলবার হানিফের পক্ষে গণমাধ্যমে ১২ জন জেষ্ঠ্য আইনজীবীর একটি বিবৃতি এসেছে। বিবৃতিদাতারা হলেন, এএএম আনোয়ারুল কবির, মাহাবুব উদ্দিন আহমেদ, জসীম উদ্দিন আহমেদ খান, আবু মোহাম্মদ হাশেম, জেলা পিপি আ ক ম সিরাজুল ইসলাম, জিপি নজমুল আহসান খান আলমগীর, বিশেষ পিপি এম এ নাসের চৌধুরী ও মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী, অতিরিক্ত পিপি অশোক কুমার দাশ, আইনজীবী অপূর্ব চরণ দাশ ও সামশুল আলম।

জানতে চাইলে জেলা পিপি আ ক ম সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, স্টিয়ারিং কমিটির ৩২ জন সদস্য সর্বসম্মতভাবে হানিফকে গত ১৫ নভেম্বর প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। ভোটাভুটির মাধ্যমে হানিফ জিতে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হয়েছিল। দেড় মাস ধরে তিনি প্রচারণা চালিয়েছেন। নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। গতকাল (সোমবার) একটা অজুহাত তৈরি করে স্টিয়ারিং কমিটির মাত্র ১৩ জন বসে হানিফকে বাদ দিয়ে দিল।

‘এটা হতে পারে না। এমন কী হয়ে গেল যে নির্বাচনের এক মাস আগে সাধারণ সম্পাদকের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রার্থী পরিবর্তন করতে হল ? এই সিদ্ধান্তের কারণে তো পুরো প্যানেলই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেল। ’

মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, হানিফকে নিয়ে যদি বিতর্ক থাকলে বাদ দেয়া হোক, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তো সর্বসম্মতভাবে হতে হবে। কারও ব্যক্তিগত চেম্বারে বসে লিমিটেড লোকজন নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত হলে সেটা তো আমরা মানতে পারি না।

ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা সবাইকে বৈঠকে ডেকেছিলাম। তারা কেউ আসেনি। এখন বাইরে বসে সর্বসম্মত প্রার্থী হাশেমের বিরোধিতা করছে। তবে ইনশল্লাহ আমরা আমাদের সভাপতি প্রার্থী ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আবুল হাশেমসহ পুরো প্যানেলকে জিতিয়ে আনব।

আবুল হাশেম গণমাধ্যমকে বলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশে আমাদের নেতৃবৃন্দ বসে সর্বসম্মতভাবে আমাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে আমার কোন বক্তব্য নেই। আমি সবাইকে নিয়ে সামনে এগুতে চাই। আশা করি সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারব।

আবু হানিফ গণমাধ্যমকে বলেন, আমার মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত একপেশে এবং অগণতান্ত্রিক। এই সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আইনজীবীরা মেনে নিতে পারেননি। তাদের সবার প্রতিনিধি হয়ে সভাপতি ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি অবশ্যই নির্বাচনের মাঠে আছি। বিজয় আমাদেরই হবে।

আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র : বাংলানিউজ

সম্পাদনা- ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম