ঢাকা , ১৯শে আগস্ট ২০১৮ ইং , ৪ঠা ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » আসামির খাবার কার পেটে যায়?

আসামির খাবার কার পেটে যায়?

ছবি - প্রতীকী

গত ১৩ জানুয়ারি ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা দীন মোহাম্মদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মাদকদ্রব্য মামলায় গ্রেফতারের পর তাকে মোহাম্মদপুর থানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে ১৪ জানুয়ারি সকালে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয় তাকে। প্রায় ২৮ ঘণ্টা থানাহাজতে রাখা হলেও তাকে কোনো খাবার দেয়নি থানা কর্তৃপক্ষ।

রাজু নামে আরেকজনকে ১৩ জানুয়ারি বিকেলে গ্রেফতার করে উত্তরা-পূর্ব থানা পুলিশ। তাকেও থানা থেকে খাবার খেতে দেয়নি। শুধু পানি খেয়েই রাত কাটে তার। পরদিন সকালে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয় তাকে। এভাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৪৯ থানার অধিকাংশতেই গ্রেফতারের পর আসামিকে কোনো খাবার দেওয়া হয় না। অথচ তাদের খাবারের জন্য রয়েছে সরকারি বরাদ্দ। থানা কর্তৃপক্ষ যথারীতি সেই টাকা তুলেও নেয়। সমকালের অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে শুধু থানা নয়, গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের আসামিদেরও আদালতে হাজিরা বা শুনানির দিন সরকারি বরাদ্দের খাবার দেওয়া হয় না বলে বন্দিরা জানিয়েছেন। কারাগার ও থানা থেকে না খেয়ে আদালতে আসায় অনেক আসামি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুলিশ কর্মকর্তারাও এটা স্বীকার করেছেন।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গ্রেফতারের পর থানায় কাউকে ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখা হয় না। সেখানে তাদের খাবার না দেওয়ার ঘটনা ঘটলে খতিয়ে দেখা হবে।’

কারাগার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদাররা নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ করে বলে বন্দিরা যথাযথ খাবার পায় না- এমন অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আসামিরা যাতে খাবার সুষ্ঠুভাবে পেতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

২০১৭ সালে ডিএমপির ৪৯টি থানা ৫৫ হাজার ২৬৩ জন আসামিকে আদালতে পাঠায়। সে হিসাবে গড়ে প্রতিদিন দেড়শ’র বেশি আসামিকে থানা পুলিশ আদালতে পাঠায়। এরমধ্যে নতুন গ্রেফতার হওয়াদের পাশাপাশি রিমান্ডের আসামিও থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানায় একজন আসামির জন্য সরকারিভাবে একদিনে বরাদ্দ ৭৫ টাকার খাবার। কিন্তু ৪৯টি থানার অধিকাংশতেই গ্রেফতারের পর আসামিকে সরকারি বরাদ্দের খাবার দেওয়া হয় না। স্বজনরা খাবার দিতে গেলে উল্টো থানা পুলিশকে উপঢৌকন দিতে হয়। অবশ্য মাস শেষে থানা কর্তৃপক্ষ খাবার খরচ বাবদ আসামি সংখ্যা অনুযায়ী ডিএমপির অর্থ বিভাগ থেকে টাকা নিয়ে নেয়।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৯টি থানার আসামি খোরাকি বাবদ ৮১ লাখ আট হাজার ৯০৮ টাকা নেওয়া হয়। প্রতি অর্থবছরেই আসামির সংখ্যা অনুযায়ী খাবারের টাকা নেওয়া হয়। তবে সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসামিরা সরকারের দেওয়া টাকার খাবার পান না

সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া অন্তত ৮০ আসামির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানা থেকে তাদের খাবার দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে গত ২৪ নভেম্বর বিমানবন্দর থানায় গ্রেফতার হওয়া রহমত উল্লাহ, ডেমরা থানায় নজরুল ইসলাম, নিউমার্কেট থানায় জুয়েল ও নিরুন, দক্ষিণখান থানায় রুহুল আমিন ও সানোয়ার, শাহজাহানপুর থানায় রাকিব হোসেন ও রফিকুল ইসলাম, ভাটারা থানায় হারুনুর রশিদ, মোহাম্মদপুর থানায় মহসিন, জুয়েল ও এনামুল, পল্টন থানায় আবদুল কাদের, যাত্রাবাড়ী থানায় সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান, মুগদা থানায় ইমরান হোসেন, কাফরুল থানায় রাফি মিয়া, ফারুক, কলাবাগান থানায় সাব্বির মিয়া, মিরপুর থানায় সোহেল মিয়া এবং পল্লবী থানায় পারভেজ ও কিবরিয়া জানিয়েছেন, থানা থেকে তাদের খাবার দেওয়া হয়নি।

গত ১৩ জানুয়ারি ৪৯টি থানা থেকে ২৬৪ জন আসামি পাঠানো হয় আদালতে। তাদের অন্তত ৩০ জন আসামির সঙ্গে খাবার বিষয়ে কথা হয়। তাদেরও একই অভিযোগ- থানা থেকে খাবার দেওয়া হয়নি।

১৩ জানুয়ারি দুপুরে চুরি মামলায় কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ গ্রেফতার করে রিকশাচালক ফয়সালকে। তার বাসা একই থানা এলাকার মাতবর বাজার এলাকায়। তাকেও সরকারি বরাদ্দের খাবার দেয়নি পুলিশ। ফয়সাল সমকালকে বলেন, গ্রেফতারের পর কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশের এক সদস্য তাকে বলেন, ‘তোর বাসায় খবর দে, খাবার দিয়ে যাক।’ এরপরই ফয়সালের স্ত্রী সুবর্ণা স্বামীকে খাবার দিয়ে যান।

এদিন লালবাগ থানায় গ্রেফতার হওয়া ইমরান হোসেন বলেন, তাকেও পুলিশ খাবার দেয়নি। ১৩ জানুয়ারি গ্রেফতার হওয়া তুরাগ থানায় কাওসার, পল্লবী থানায় রাজীব, ভাটারা থানায় মিজান সাকিব, হাজারীবাগ থানায় নুর মোহাম্মদ, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ঝুমন ও আবদুল মালেক, যাত্রাবাড়ী থানায় রাসেল এবং ডেমরা থানায় গ্রেফতার হওয়া রুবেল মিয়া জানিয়েছেন, থানা থেকে তাদের খাবার দেওয়া হয়নি। তবে ডেমরা থানার ওসি এসএম কাওসার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার থানায় আসামিকে খাবার দেওয়া হয়, তবে তরকারি ভালো লাগে না বলে অনেকে খায় না।’ কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি শাহীন ফকির বলেন, ‘এসব মিথ্যা কথা। প্রত্যেক আসামিকে খাবার দেওয়া হয়। কাউকে বাসায় থেকে খাবার আনার কথা বলা হয় না।’

বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন সময় ডিএমপির মাসিক অপরাধ সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থানার ওসিদের আসামিদের খাবারের বিষয়ে অবহেলা না করতে সতর্ক করেন। এরপরও বদলায়নি পরিস্থিতি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, বরাদ্দ থাকার পরও যদি খাবার না দেওয়া হয় তাহলে এটা অন্যায়। মানুষকে অভুক্ত রাখা যাবে না। থানায় আসা মানেই কেউ অপরাধী নয়। অপরাধী হলেও তাকে খাবার দিতে হবে। কারাগার থেকে আদালতে নেওয়া বন্দিদের বিষয়ে তিনি বলেন, খাবার থেকে যে তারা বঞ্চিত হচ্ছে, এটা তাদের জন্য খুব কষ্টদায়ক। সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন বলে জানান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারাগারে এর চিত্র কম ভয়াবহ নয়। প্রতিদিন আদালতে যত বেশি বন্দির হাজিরা বা শুনানি থাকে ততই যেন সংশ্নিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষের পকেট ভারি হয়। বিশেষ করে কাশিমপুর কারাগারের ক্ষেত্রে। বন্দিদের আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় কোনো খাবার দেওয়া হয় না। নামেমাত্র চিড়া-গুড় দেওয়া হয়। তাও মুখে নেওয়ার অনুপযোগী। এমনকি ভোরে তাদের যখন আদালতের উদ্দেশ্যে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয় তখনও সকালের খাবার দেওয়া হয় না তাদের। কৌশলে খাবার সরবরাহের আগেই তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় আদালতের উদ্দেশ্যে। যানজট আর দূরত্বের কারণে আদালত থেকে কাশিমপুরে ফিরতেও অনেক সময় রাত হয়ে যায়। তার আগেই কারাগারে রাতের খাবার সরবরাহ করা হয়ে যায়। ফলে তারা কারাগারে গিয়ে আর খাবার পান না।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ঢাকার আদালতে কামিশমপুরের চারটি কারাগার থেকে দেড় শতাধিক বন্দিকে হাজিরাসহ নানা প্রয়োজনে নেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আসে দুইশ’র মতো।

খাবারের বিষয়ে অর্ধশত বন্দির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আদালতে হাজিরা বা শুনানির দিন তারা কারাগারের খাবার পান না। অথচ এই বন্দিদের খাবারের বরাদ্দের টাকা হিসাব করেই সরকারের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ক্ষুধার কারণে আসামিরা আদালত হাজতখানায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, সে তথ্য জানিয়েছে পুলিশের প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষও। ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ আনিসুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আসামি না খেয়ে আসার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালেও নিতে হয় তাদের।’

কারা সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কারাগারের বন্দিদের খাবার বাবদ মাথাপিছু টাকা বরাদ্দ নয়, খাবারের পরিমাণ বরাদ্দ। হাজতিদের মাথাপিছু প্রতিদিন নাশতার আটা ৮৭ দশমিক ৪৮ গ্রাম, আখের গুড় ১৪ দশমিক ৫৮ গ্রাম, চাল ২৪৭ দশমিক ৮৬ গ্রাম, মসুর ডাল ১৪৫ দশমিক ৮০ গ্রাম, লবণ ৩২ দশমিক ৮০ গ্রাম, ভোজ্য তেল ২০ দশমিক ৪৯ গ্রাম, পেঁয়াজ চার দশমিক ৬১ গ্রাম, শুকনা মরিচ দুই দশমিক শূন্য চার গ্রাম, হলুদ এক দশমিক শূন্য দুই গ্রাম, ধনিয়া দশমিক শূন্য পাঁচ গ্রাম, সবজি ২৯১ দশমিক ৬০ গ্রাম, মাছ অথবা মাংস ৩৬ দশমিক ৪৫ গ্রাম এবং জ্বালানি কাঠ ৬৫৬ দশমিক ১০ গ্রাম বরাদ্দ। বর্তমান বাজারে এসব দ্রব্যের মূল্য প্রায় ৬০ টাকা। তবে হাজিরার দিন কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা বন্দিদের খাবার দেওয়া হয় না।

গত ২২ নভেম্বর কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে আসা ১৮ বন্দির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা কারাগারে সকালের খাবার পাননি। এ তথ্য জানান শাহিন, আনোয়ার, লিটন, আমিনুর, আকাশ, জাফরুল, রুবেল, আসলাম, মঈন খান, তাজুল, নুরুল ইসলাম, রায়হান, জাহিদুল্লাহ, আল আমিন, বাবুল, আমজাদ, মোক্তার ও আল মামুন। দুপুরের খাবার হিসেবে তাদের গুড় ও চিড়া দেওয়া হলেও দুর্গন্ধের কারণে তা মুখে নেওয়া যায় না। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এর বন্দিদেরও একই অবস্থা। ২৩ নভেম্বর এ কারাগারের বন্দি রুবেল, নয়ন, রাব্বি, ইকবাল, আবদুর রহিম, সোহাগ ও রহমান জানান, তাদের সকালের খাবার দেওয়া হয়নি। রাতে ফিরেও তারা খাবার পাবেন না। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে ২৬ নভেম্বর আদালতে আসা বন্দি সুমন, ফারুক ও রোমান রুবেল একই অভিযোগ করেন।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সকালে খাবার খাইয়ে বন্দিদের আদালতে পাঠানো হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, গুড় ও চিড়া নিম্নমানের।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এর সিনিয়র জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বন্দিরা যদি ভোরে আদালতে যাওয়ারকালে খাবারের সময় না পায়, তাহলে তাদের সঙ্গে তা দিয়ে দেওয়া হয়। রাতে ফিরেও তারা খাবার পায়।’ বন্দিরা হাজিরার দিন খাবার পান না বলে অভিযোগ করেছেন- সেই কথা তুলতেই জেল সুপার বলেন, ‘তারা মিথ্যা কথা বলে।’ সূত্র : সমকাল