ঢাকা || শুক্রবার , ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং || ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ || ৭ই জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী

সংসদীয় কার্যক্রমে মনোযোগ নেই এমপিদের

আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চার প্রক্রিয়া ক্রমেই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন প্রচারে সরব এমপিদের মনোযোগ নেই সংসদীয় কার্যক্রমে। অধিবেশন কক্ষের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলোতেও তাদের একই ধরনের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এ কাজে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দলকেও ছাড়িয়ে গেছে বিরোধী দল। ফলে সংসদের বৈঠকে ‘প্রাণবন্ত বিতর্ক’ গত চার বছরে দেখা যায়নি।

২০১৪ সালের বহুল আলোচিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান দশম সংসদের চার বছর পূর্তি হচ্ছে আগামীকাল ২৯ জানুয়ারি। এই চার বছরে সংসদের কার্যক্রম বিশ্নেষণে দেখা গেছে, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সংসদের বৈঠক বা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের অনাগ্রহ ছিল লক্ষণীয়। একই পরিস্থিতি এমপিদের ক্ষেত্রেও। কোরাম ছাড়াই সংসদের বৈঠক চালানোর নজির সৃষ্টি করেছে এই সংসদ।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, যেখানে বিতর্ক নেই- সেটাকে কার্যকর সংসদ বলা যায় না। সংসদ বর্জন নেতিবাচক সংস্কৃতি হলেও অনুগত বিরোধী দল দিয়ে কার্যকর সংসদের চেষ্টা বৃথা। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস সুদীর্ঘ না হলেও কার্যকর সংসদের নজির এ দেশেই রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৯১-১৯৯৪ পঞ্চম সংসদের এই সময়টুকুকে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা যায়। ওই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে গঠিত সংসদীয় তদন্ত কমিটি ‘সিটিং মন্ত্রীর’ বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেছে। সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবও ভোটাভুটিতে সমাধান হয়েছে।

সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অবশ্য দাবি করেছেন, দশম সংসদ বেশ ভালোভাবেই কার্যকর রয়েছে। আইন প্রণয়নে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা অংশ নিয়েছেন। সরকারের নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির ক্ষেত্রেও বর্তমান সংসদ ভূমিকা রাখছে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন সরকারি দলের সিনিয়র সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। পাশাপাশি তিনি সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির অনুপস্থিতি অনুভব করেন এবং এর জন্য বিএনপিকেই দায়ী করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অবশ্য এই সংসদকে হাস্যকর হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, স্বাধীনতার পরে সবচেয়ে অকার্যকর সংসদ হিসেবে এটি ইতিহাসে স্থান পাবে।

আইন প্রণয়ন

দশম সংসদের এখন পর্যন্ত ১৮টি অধিবেশনে কার্যদিবস ছিল ৩২৭টি। চলতি বছর পাঁচটি অধিবেশন বসেছে। এতে ২৪টি বিল পাস হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, নবম সংসদের মতো দশম সংসদও বিল পাসে সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতের লোকসভায় ‘কয়লা খনি শ্রমিক’ সংক্রান্ত একটি বিল নিয়ে টানা ২৭ দিন আলোচনার রেকর্ড রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশেও পঞ্চম সংসদে একটি বিল নিয়ে একাধিক দিন আলোচনার রেকর্ড রয়েছে। সংসদের রেকর্ড যাচাই করে দেখা গেছে, চলতি বছরের এসব বিলের অধিকাংশই পাস হতে ৩০ মিনিটের বেশি সময় লাগেনি। বিল পাসের প্রক্রিয়ায় ঘুরেফিরে সর্বোচ্চ দশজন এমপিকে অংশ নিতে দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম।

যদিও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলছেন, সরকারি দলের সদস্যদেরও সংশোধনী দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, এমনকি নজিরও রয়েছে। তাদের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। তারপরও এত কমসংখ্যক সদস্য বিল পাসের প্রক্রিয়ায় কেন অংশ নিচ্ছেন, সেটা সাংসদরাই ভালো বলতে পারবেন। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের সংশোধনীগুলোর যথাযথ জবাব দেওয়া হয় না। প্রস্তাব কেন নাকচ করা হলো, তাও জানানো হয় না। এমনকি অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ও মন্ত্রীরা টেনে আনেন। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনাও থাকে তাদের বক্তব্যে। মন্ত্রীরা বেশিরভাগ সময়েই বলেন, বিলটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরে ভেটিং হয়েছে, সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষা করা হয়েছে- তাই এখন বেশি কিছু আলোচনার নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সরব জাপার সাংসদ ফখরুল ইমাম বলেন, মন্ত্রীদের সময়ের বড় অভাব। তারা সংসদে যে বিলটি উত্থাপন করেন, তাও ভালোভাবে পড়ে দেখেন না। বিলের ওপর প্রশ্ন করা হলে তারা অন্য প্রসঙ্গে জবাব দেন। সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করলেও তার কারণ বলেন না। এদিকে তারা মনোযোগ দেন না বলেই একই বিল পাঁচ বছর পার হওয়ার আগেই আবার সংশোধনের জন্য আনতে হয়। বিলটি নানা পর্যায় পেরিয়ে সংসদে আসার যুক্তি দিয়ে তড়িঘড়ি করে পাস করার ব্যাপারে মত দেন মন্ত্রীরা। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সংসদে বিল পাসের প্রক্রিয়াগুলো রাখার দরকার কী।

প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তর

সংসদের কাছে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির অন্যতম প্রধান মাধ্যম ধরা হয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তর। চলতি বছরের পাঁচ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য প্রশ্ন জমা পড়ে ৬৬৮টি, যার মধ্যে তিনি উত্তর দিয়েছেন ২৪৫টির। অন্য মন্ত্রীদের জন্য এ বছর ১১ হাজার ৩৫৬টি প্রশ্ন জমা পড়ে, যার মধ্যে তারা সাত হাজার ২১৮টির উত্তর দেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রশ্নের জবাবের বেশিরভাগজুড়েই থাকে সরকারের বিভিন্ন খাতে সাফল্যের বিবরণ।

এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, এর আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব বিরোধীদলীয় সদস্যরা বর্জন করলেও এই সংসদের বিরোধী দল অংশ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও তার শত ব্যস্ততার মধ্যে বুধবার সংসদের এ পর্বে অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর পর্বে যাতে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সুযোগ পান, সে ব্যাপারে স্পিকার নিজেও সচেতন ছিলেন। তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্র তো একদিনে পাওয়া যাবে না- এটা চর্চার বিষয়। ধীরে ধীরে সেই পথে হাঁটতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মুলতবি প্রস্তাব

সংসদের রেকর্ডে দেখা গেছে, দ্বিতীয় সংসদে ২২টি ও পঞ্চম সংসদে সাতটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও এরপর আর কোনো সংসদে একটিও গ্রহণ করা হয়নি। এরপর ১২ দিনের ষষ্ঠ সংসদ ছাড়া সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদে অসংখ্য মুলতবি প্রস্তাব জমা পড়লেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ স্পিকার থাকাকালে মুলতবি প্রস্তাব নাকচ হলেও বিষয় এবং তার কারণ সংসদের বৈঠকে উল্লেখ করতেন। এখন তাও হয় না।

সংসদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পঞ্চম সংসদে গৃহীত মুলতবি প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল- ‘মেহেরপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বিডিআর জওয়ানসহ চার বাংলাদেশি নিহত’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দল ছাত্রের বন্দুকযুদ্ধে উদ্ভূত পরিস্থিতি’, ‘পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে দেশের একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নিযুক্ত করা’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র হামলায় একজন নিহত ও দু’শতাধিক ছাত্র আহত হওয়া প্রসঙ্গে’।

এ ধরনের ঘটনা বর্তমান সংসদের আমলে ঘটলেও একটিও মুলতবি প্রস্তাব কেন গ্রহণ করা হচ্ছে ন- জানতে চাইলে স্পিকার শিরীন শারমিন বলেন, সংসদীয় রীতিতে এই প্রস্তাবকে সরকারের প্রতি একটি ‘তিরস্কার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই যে কোনো বিষয়কে মুলতবি প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ নেই। সেটা ওই মানের হতে হবে। চলতি অধিবেশনে কোনো মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি বলেও জানান তিনি।

অনির্ধারিত বিতর্ক ও সাধারণ আলোচনা

দশম সংসদের বেশিরভাগ সময়জুড়ে কেটেছে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অনির্ধারিত বিতর্কে সাংসদদের বিভিন্ন বিষয়ে ‘ফ্রি স্টাইল’ বক্তৃতা এবং প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনা। সাধারণ আলোচনার পরে একটি প্রস্তাব গৃহীত হলেও অনির্ধারিত বিতর্কে সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া বলেছেন, তিনি বৈঠকে সভাপতির আসনে থাকলে অনির্ধারিত বিতর্কের জন্য সাধারণত এমপিদের নিরুৎসাহিত করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি সংসদের ফ্লোরেও একাধিক দিন বলেছেন, এ আলোচনা করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি মেনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ দিলে আলোচনার পরে সংসদ সংশ্নিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যরা এসব বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী নন।

প্রতিবছর সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে সংসদীয় কার্যক্রমের অনুশীলন থেকে সাংসদরা ক্রমাগত সরে আসছেন। তাদের মূল ভূমিকা আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহ নিশ্চিত করা এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার তুলনায় তারা গৌন বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছেন। দলে এবং রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সংহত করতে তারা সংসদে ফ্রি স্টাইল বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে ব্যক্তি প্রশংসায় মেতে উঠছেন বলেও মনে করেন তিনি।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক

মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির মাসে অন্তত একটি করে বৈঠকের নির্দেশনা থাকলেও একমাত্র নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি ছাড়া আর কেউ তা পূরণ করতে পারেনি। কয়েকটি কমিটি করে মাত্র তিন থেকে চারটির বেশি বৈঠক করতে পারেনি। এ ছাড়া প্রতিমাসে বৈঠক অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি চার বছরে সর্বোচ্চ ৭৪টি বৈঠক করেছে।

কমিটির সভাপতিরা মনে করছেন, মন্ত্রীদের অনাগ্রহে নিয়মিত বৈঠক করা সম্ভব হয়নি। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে বৈঠক করে তেমন কোনো ফল পাওয়া যায় না।

বিরোধী দলের ভূমিকা

শুরু থেকেই এই সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে সমালোচনা ছিল ঘরে-বাইরে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে- দেশে সংসদ বর্জনের নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে তারা বেরিয়ে এসে সংসদকে কার্যকর করতে ভূমিকা রেখেছেন।

জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম বলেন, এর আগের নয়টি সংসদের সবগুলোতেই বেশিরভাগ সময় বিরোধী দল ছিল সংসদ বর্জনের মধ্যে। এই প্রথম বিরোধী দল ওয়াকআউট করলেও সংসদ বর্জন করছে না। সংসদীয় কার্যক্রম একটি চর্চার বিষয়। হঠাৎ করেই এটা গড়ে উঠবে না। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন। মসিউর রহমান খান/সমকাল

সম্পাদনা- ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম