‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তৎপর হলে শিশুবান্ধব বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সহজ’

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১১ মার্চ, ২০১৮ ৩:০৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান বলেছেন, মানুষের বুকের ভেতর আল্লাহর ভীতি তৈরি করতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে থাকলে চলবে না। তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েরা হবে সোনার মানুষ। তিনি বলেন, শিশু বান্ধব বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশে গড়ে তোলা সহজ যদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা আরো বেশি উদ্যোগী ও তৎপর হন। বিচারের মুখোমুখি করার আগেই অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু কিশোরটির বয়স নিশ্চিতে পুলিশ প্রশাসনকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি শনিবার সকালে “অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়া শিশু,কিশোর-কিশোরীদের অধিকার রক্ষায় মানবাধিকার কর্মীদের ভূমিকা” বিষয়ক ‘একসেস টু জাষ্টিস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান উপরোক্ত মন্তব্য করেন।

বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান বলেন, শিশু অধিকার বান্ধব সমাজ ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ চট্টগ্রাম শাখা আয়োজিত এ সেমিনার সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রধান নির্বাহী এডভোকেট এলিনা খানের সভাপতিত্বে ও পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএইচ আরএফ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ডিরেক্টর (অর্গানাইজিং) এডভোকেট জিয়া হাবীব আহ্সান।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান আলহাজ সুফী মিজানুর রহমান বলেন, বাবা মাকে ভাল মানুষ হতে হবে। খোদাভীতি ও দেশপ্রেমিক হতে হবে। সন্তানরা যাতে চরিত্রবান হয় সে জন্য বিদ্যার সাথে নৈতিকতা, বিনয় ও দেশপ্রেম শিক্ষা দিতে হবে। বাচ্চারা স্বর্গীয় দান। আমরা বাবা মারা সন্তানদের উপযুক্তভাবে লালন পালন করি না। শিশু সমালোচনার মাঝে বেঁচে থাকলে সে সমালোচক ও হিংসুক হয়।প্রশংসার মাঝে বেঁচে থাকলে নিজে কর্তব্য পরায়ন ও সম্মান করতে শিখে। তিনি অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, বাচ্চারা কখন কি করে কার সাথে মিশছে খবর রাখবেন। প্রতি সপ্তাহে একবার স্কুলে যাবেন। শিক্ষকদের সাথে কথা বলবেন।

সংগঠনের প্রধান পৃষ্টপোষক পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সুফী মিজানুর রহমান আরো বলেন, ‘শিশুদেরকে বুকে টেনে নিন, তাদের সামনে মা-বাবারা ঝগড়া করবেন না, গালাগালি করবেন না, তাদেরকে দুষ্ট বলবেন না, তাদের বলবেন -তুমি হলে আমার স্বপ্নের আকাশের তারা’ । তিনি আরো বলেন, ‘প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিউর । পরিবার থেকে শিশুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে ।”

আলহাজ্ব মিজানুর রহমান বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিশু, কিশোর-কিশোরীদের জন্য চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ আবাসন তৈরীতে সহযোগীতা করার ঘোষণা দেন ।

সেমিনারে আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আবু হান্নান বলেন, ” আমি যখন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলাম তখন দেখতাম মাদক বলতে ছিল বাংলা মদ ও ফেন্সিডিল। কিন্ত এখন কোমলমতি ছেলেরাও ইয়াবা(বাবা) সেবনকে বিনোদন মনে করছে।” মাদক নির্মূলে সরকারের পাশাপাশি অনেক বেসরকারী সংগঠন কাজ করছে।কিন্ত তা দমন করা যাচ্ছে না। মাদকের ব্যাপকতা ও অবাধ ছড়াছড়ি রোধে সকলে মিলে ফলপ্রসু একটি পদ্ধতিতে আগাতে হবে। শিশুদের খেলার মাঠ বেদখল হয়ে যাচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্য ও অন্যান্য কারণে । তাদের পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ নেই। শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার জন্য আমরা নিজেরা দায়ি।তিনি শিশুদের নীতি নৈতিকতা শিক্ষা দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রবীণ মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট সুনীল সরকার । আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন মহানগর শিশু আদালতের বিজ্ঞ বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস, ল্যান্ড সার্ভে ট্র্যাইবুন্যাল পিরোজপুরের বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান, অর্থ ঋণ আদালত চট্টগ্রামের বিজ্ঞ বিচারক আবদুল হান্নান, সিএমপি’র ডিসি (ডিবি) হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, বার কাউন্সিলের সাবেক সদস্য এডভোকেট মাহাবুদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি এডভোকেট ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী, ডাক্তার মোহাম্মদ শফিউল হাসান, এডভোকেট জান্নাতুল নাঈম রুমানা, এডভোকেট মর্জিনা বেগম, বিএইচআরএফ ডাইরেক্টর অংশু আসিফ পিয়াল, সমাজসেবা অফিসার পারুমা বেগম, কারা পরিদর্শক ও কাউন্সিলর জেসমিন পারভীন জেসী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী, এডভোকেট সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, এডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ হারুন, এডভোকেট দেওয়ান ফিরোজ, এডভোকেট প্রদীপ আইচ দীপু, এডভোকেট সেলিনা হুদা, এডভোকেট সাইফুদ্দিন খালেদ, এডভোকেট হাসান আলী, সাংবাদিক এয়ার মুহাম্মাদ, মোঃ এরশাদ আলম, এস.আই আসাদুজ্জামান, এস.আই ছন্দা ঘোষ, এনজিও কর্মকর্তা লুৎফুন্নেচ্ছা রূপসা, মানবাধিকার কর্মী বদরুল হাসান, হাসান আল বান্না, কে.এম.শান্তনু চৌধুরী, স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সদস্য ফাতিমা যাহ্‌রা আহ্‌সান রাইসা, টুম্পা দাশ, নাবিলা শারমিন জেনী, মিজবাউল জান্নাত, শামশুল আলম শাকিল, নিহার দাশ, ওবাইয়েদ রহমান, চৈতি দে, তৃতীয় লিঙ্গের পক্ষে মৌসুমি হিজড়া প্রমুখ ।

সেমিনারে ১৮ দফা সুপারিশমালা প্রণয়ন সহ বিভিন্ন প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয় । বিশেষ করে চট্টগ্রামে শিশুদের জন্য নির্ধারিত খেলার মাঠ সমূহে খেলাধূলা ব্যতীত অন্য কাজে ব্যবহার না করা । চট্টগ্রামে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়া শিশু, কিশোর-কিশোরীদের জন্য আধুনিক সেইফ হোম বা কারেকশান সেন্টার স্থাপন প্রভৃতি । মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখায় অনুষ্ঠানে ৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে মানবাধিকার সম্মাননা প্রদান করা হয় । তাঁরা হলেন যথাক্রমে মাননীয় বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান, বিজ্ঞ বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস, মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান, আবদুল হান্নান ও পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সুফী মিজানুর রহমান । অনুষ্ঠানের বি.এইচ.আর.এফ শাখা সভাপতি, সেক্রেটারী, প্যানেল আইনজীবী এবং ষ্টুডেন্ট কাউন্সিল সদস্যদের পরিচয়পত্র প্রদান করেন এডভোকেট এলিনা খান । সবশেষে ধন্যবাদ বক্তব্য রাখেন সংগঠনের চট্টগ্রাম শাখার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এডভোকেট এ এইচ এম জসিম উদ্দিন । মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সভার কাজ সমাপ্ত হয় । সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন এডভোকেট এহতেশামুল আলম জুয়েল, কাজল মজুমদার ও ক্ষুদে শিল্পী প্রিয়স্মিত সরকার।

অন্যান্য বক্তাগন অভিভাবকদের উদ্দেশ্য বলেন, শিশুদের হাতে স্মার্টফোনের পরিবর্তে সাধারণ মানের যোগাযোগের ফোন দিন। প্রায় সকল বক্তাই পর্ণোগ্রাফীর ভয়াল থাবা থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য দ্রুত আইন প্রণয়ন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন।পর্ণোগ্রাফীর কুফল শিশুদের উৎশৃংখল ও অপরাধী মনোভাবে গড়ে উঠতে বড় ভূমিকা পালন করছে।কেউ কেউ শিশুকিশোরদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্যও পরামর্শ দেন।