ঢাকা , ২১শে এপ্রিল ২০১৮ ইং , ৮ই বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » ডিএমপির ৪৯ থানায় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম: এবার কি পাল্টাবে দৃশ্যপট

ডিএমপির ৪৯ থানায় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম: এবার কি পাল্টাবে দৃশ্যপট

বিপদে পড়ে থানায় গেলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না, উল্টো নতুন বিপদে পড়তে হয়- থানার ব্যাপারে অনেকেরই রয়েছে এমন ধারণা। প্রবাদও আছে, ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা’। পুলিশ সদস্যদের তাই জাতীয় পুলিশ সপ্তাহে জনবান্ধব হওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, পুরনো ওই প্রবাদ যেন মিথ্যা প্রমাণ হয়।

এমন বাস্তবতায় রাজধানীর ৪৯ থানায় সেবার মান বাড়াতে ও অপরাধ প্রতিরোধ করতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ঢাকার আটটি অপরাধ বিভাগের এক হাজার ২৮০ পুলিশ সদস্যকে নিয়ে হয়েছে মাসব্যাপী কর্মশালা। সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে জনকল্যাণমূলক নানা নির্দেশনা। এমন প্রেক্ষাপটে জনমনে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া- সত্যিই কি এবার থানাগুলোর দৃশ্যপট পাল্টে যাবে? পুলিশ আরও জনবান্ধব হয়ে উঠবে? গণগ্রেফতারে সতর্কতা দেখাবে? নিরীহ ব্যক্তিদের পেন্ডিং মামলায় আর চালান করা হবে না? চেকিংয়ের নামে মানিব্যাগ পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে? পকেটে ইয়াবার মতো মাদক ঢুকিয়ে হয়রানি হবে কি?

থানায় জনপ্রত্যাশা পূরণ করার মতো পরিবেশ তৈরি এবং সেবার মানোন্নয়ন ও অপরাধ প্রতিরোধ পুলিশের এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে চান পুলিশ সদস্যরা। সেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে করণীয় ও বর্জনীয় নিয়ে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের তাই মাসব্যাপী কর্মশালা করে দেওয়া হয়েছে সম্যক ধারণা। সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, কর্মশালার শিক্ষা অনুসরণ করলে থানাগুলোতে জনহয়রানি কমবে। বাড়বে সেবার মান।

গত সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কার্যালয় পরিদর্শন করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। থানাগুলোতে সেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে ডিএমপির এ উদ্যোগ সম্পর্কে তাকে তখন বিস্তারিত জানানো হয়। এর পর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে পুলিশপ্রধান বলেন, ডিএমপির এমন উদ্যোগ পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য থানায়ও নেওয়া যেতে পারে। কারণ পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে থানার সেবার মান বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, থানার সেবার মানোন্নয়ন ও থানাকে জনবান্ধব করতে যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে তা মেনে চললে থানার পরিবেশ বদলাতে বাধ্য। মাসব্যাপী গৃহীত কর্মসূচির আলোকে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ তাদের করণীয় নিয়ে স্পষ্ট ধারণাও পেয়েছে। কর্মশালা থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগাতে পারলে থানার জনসেবা অনেকাংশে নিশ্চিত করা যাবে।

ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, জনসম্পৃক্ততা ও জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া পুলিশিংয়ে সফলতা অর্জন অসম্ভব। পুলিশভীতি দূর করে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে থানায় সেবার মান বাড়ানোর বিকল্প নেই।

জনহয়রানি বন্ধে নির্দেশনা : গত মার্চে পৃথকভাবে ঢাকার আটটি অপরাধ বিভাগের মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নিয়ে কর্মশালা হয়। সেখানে সভাপতিত্ব করেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, পুলিশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের তথ্যই মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের কাছে পৌঁছায় না। যদিও থানায় কনস্টেবল থেকে পুলিশ পরিদর্শক মর্যাদার সদস্যরা জনসম্পৃক্ত বিষয়ে কাজ করেন।

কর্মশালায় পুলিশ কর্মকর্তারা নির্দেশনা দেন, কোনোভাবেই নিরীহ লোককে পেন্ডিং মামলায় চালান দেওয়া যাবে না। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে ধরে পকেটে ইয়াবা বা অন্য কোনো মাদক দিয়ে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। চেকিংয়ের নামে মানিব্যাগ পরীক্ষা করে হয়রানি দূর করার কথাও বলেন তারা। বলা হয়, অভিযোগ রয়েছে, অনেক থানার পেট্রোল পার্টি কাউকে টার্গেট করে গাড়িতে তুলে থানায় না এনে অন্য স্থানে দরকষাকষি করে। এ ধরনের ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য জড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। তথাকথিত সোর্সের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে কোনো নিরীহ ব্যক্তিকে হয়রানির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলা হয় তাদের।

কর্মশালায় নির্দেশনা দেওয়া হয়, রাজনৈতিক মামলায় ভয় দেখিয়ে (বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা ও জঙ্গি-সংক্রান্ত) জনগণকে হয়রানি করা বা উৎকোচ আদায় করা যাবে না। তথাকথিত সোর্স ব্যবহার না করে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করে পুলিশমুখী তথ্যপ্রবাহ সৃষ্টি করতে হবে। দালাল শ্রেণির ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের সম্পর্ক ত্যাগ করার বিষয়টিও উঠে আসে এ কর্মশালায়। বলা হয়, কোনো অবস্থায়ই গণগ্রেফতার করা যাবে না। ঘটনাস্থল থেকে পরিস্থিতির কারণে গ্রেফতার ব্যক্তিদের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে নির্দোষ প্রমাণ হলে মুচলেকায় ছেড়ে দিতে হবে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে ১২ নির্দেশনা : কর্মশালায় বলা হয়, সারাদেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার অন্যতম প্রধান সমস্যা। জাতীয় সংসদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটিও এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। গত দুই বছরের পুলিশ সপ্তাহেও মাদক ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ অন্যতম করণীয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

কর্মশালায় এও বলা হয়, মাদক বিস্তারের ভয়াবহতায় পুলিশ পরিবারও আক্রান্ত। উদাহরণ হিসেবে বলা হয় পুলিশ দম্পতি হত্যায় অভিযুক্ত তাদের কন্যা ঐশীর কথা। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এও মনে করেন, জনসাধারণ বিশ্বাস করে যে, মাদক ব্যবসা পরিচালনা, মাদক পরিবহন ও বিস্তারে একশ্রেণির অসাধু পুলিশ সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। তাই মাদক প্রতিরোধে পুলিশকেই প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ব্যর্থতা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়।

কর্মশালায় এলাকাভিত্তিক তালিকা করে মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের বলা হয়, মাদক ব্যবসায় রাজনৈতিক যোগসূত্র পাওয়ার পর সরাসরি পদক্ষেপ নিতে ওসির সমস্যা হলে এ ব্যাপারে ডিবিকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করা যেতে পারে। ডিবি তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। মাদক বা মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

জঙ্গি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় : সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পুলিশের সাহসী, দক্ষ ও পেশাদার ভূমিকার কারণেই জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। এ ক্ষেত্রে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তবে থানা পুলিশও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। জঙ্গি দমন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে তাদের আগের মতোই সক্রিয়, সচেতন ও হালনাগাদ থাকতে বলা হয় কর্মশালায়। মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে বলা হয় তাদের স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

কর্মশালায় বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নাশকতা জঙ্গি আক্রমণ হিসেবে প্রচারের আশঙ্কা করছে পুলিশ। এ ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সম্প্রতি জনপ্রিয় লেখক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সুযোগ পেলে জঙ্গিরা যে কোনো ধরনের হামলা চালাতে সক্ষম।

ভুক্তভোগীদের কথা শোনার পরামর্শ : কর্মশালায় বলা হয়, থানায় আগত ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ধৈর্য ধরে শুনতে হবে। যদি কোনো দেওয়ানি বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তাহলে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিকে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। সেন্ট্রির দায়িত্ব থানার নিরাপত্তা বিধান করা। থানায় কোনো ‘অতিথি’ এলে প্রথমেই সেন্ট্রির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তাকে তাই মার্জিতভাবে ‘অতিথি’র আগমনের কারণ শুনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে। সব থানায় নারী ও শিশুদের সেবা নিশ্চিত করতে নারী ও শিশুডেস্ক থাকা জরুরি। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল কমিটি ফর চাইল্ড রাইটসের সদস্যরা রমনা ও তেজগাঁও বিভাগ পরিদর্শন করে শিশুডেস্ক স্থাপন না করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি কর্মশালায়ও উঠে আসে। এ সময় শিশু আসামিদের ক্ষেত্রে শিশু আইনের নির্দেশনা মানার বিষয়টিও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। যে পরিস্থিতি তৈরি হলে কেউ নিজ জেলার থানায় যেতে আগ্রহী কর্মস্থলে সে ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। থানায় কোনো ভুক্তভোগী গেলে যাতে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান, তৈরি করতে হবে সেই অবস্থাও। সমকাল