টাইপ করার জন্য টাইপিস্টকে নিন, অ্যাডভোকেটকে নয়

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৮ এপ্রিল, ২০১৮ ২:৪২ অপরাহ্ণ

আমাদের দেশে একটি স্বীকৃত আইন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে স্নাতক পাশ এবং বার কাউন্সিল সনদ পেলে তাকে অ্যাডভোকেট বলে মনে করা হয়। তিনি টাইপরাইটিং বা শর্টহ্যান্ড বিষয়ে স্নাতক পাশ করেছে বলে অনুমিত হন না! ভদ্রলোক সিনিয়র এডভোকেটদের মধ্যে একটি অলিখিত চর্চা লক্ষ্য করা যায় যে, জুনিয়র এডভোকেটরা যখন প্রাথমিক বয়সে পেশাদার হওয়ার জন্য সিনিয়রের অফিসে যোগদান করেন তখন তাদেরকে অফিসে এক ধরনের ছাঁচে ফেলার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন সিনিয়ররা।

কিন্তু, নিঃস্বার্থ সিনিয়র এডভোকেট আজকের দিনে দেখা মেলা খুব বিরল! অধিকাংশ সিনিয়র এডভোকেট মিথ্যাচার করেন যে আইন চর্চা করার অধিকার বংশানুক্রমিক। শর্টহ্যান্ড এবং টাইপরাইটিং জানা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের চিন্তা খুবই খারাপ। এ ধরনের সিনিয়র এডভোকেটদের জন্য জুনিয়রদের কি চুপ করে থাকা উচিত?

একজন জুনিয়র অ্যাডভোকেটের আইন চর্চা করার আশা-আকাঙ্ক্ষা সঙ্কুচিত হয়ে যায়, যদি তিনি এমন একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট অফিসে যোগদান করেন, যেখানে একজন স্থায়ী টাইপিস্ট নেই। একজন জুনিয়র আইনজীবী অফিসে বসে টাইপ করার তুলনায় তার পেশাগত কাজকর্ম ও অঙ্গীকার সমূহকে গতিশীলভাবে সম্পাদনের জন্য অনেক কাজ আছে।

একজন ব্যক্তি যিনি আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে সিনিয়র অ্যাডভোকেট এর কাছে যান আইন অনুশীলন করার জন্যে। কিন্তু সিনিয়র এডভোকেটরা আইন পেশা সম্পর্কে তাদের সঠিক দিক নির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান না করে প্রায়ই জুনিয়র আইনজীবীদের দিয়ে টাইপরাইটার ও শর্টহ্যান্ডের কাজ করাতে থাকে। জুনিয়র আইনজীবী রেখে তাদেঁর আইন প্রক্রিয়া বা পেশার চর্চা সম্পর্কে আকাঙ্খা ও ইচ্ছাকে দমিত করে সিনিয়র এডভোকেটরা স্বার্থপরের মতো নিজের চাহিদা বা ইচ্ছা পূরণে উদ্বিগ্ন থাকেন।

সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, অধস্তন আদালত, ট্রাইব্যুনালে বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষের আদালতে সিনিয়র আইনজীবীদের সহায়তায় কাজ করে জুনিয়ররা। অনুশীলন করার অধিকার এবং কোর্টে হাজির হওয়ার অধিকার দুটি ভিন্ন জিনিস, এই আকাঙ্ক্ষা প্রত্যেক আইনজীবীরা তাদের মনে লালন করে। যদি একজন জুনিয়র অ্যাডভোকেটকে সিনিয়র অ্যাডভোকেটের সাথে আদালতে অনুশীলন করার অনুমতি না পায়, তাহলে কখন একজন জুনিয়র অ্যাডভোকেট আদালতে হাজির হতে পারবে?

সিনিয়র অ্যাডভোকেট কর্তৃক একজন জুনিয়র আইনজীবীকে আদালতের সামনে হাজির হওয়ার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা আইনজীবী হিসাবে আইনী সত্ত্বাকে বিলুপ্তির সমান। আইনজীবীরা একমাত্র আইন পেশার স্বীকৃত অধিকারী। আইনজীবীরা হলো এমন ব্যক্তি যাদেরকে আইনের শাসনের অভিভাবক বলে মনে করা হয়। কারণ তাদের জনসাধারণকে তাদের আইনি অধিকার, কর্তব্য, বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে পরামর্শ ও সহযোগীতা প্রদান করতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ।

জনসাধারণ মনে করে আইনজীবীরা হচ্ছে জ্ঞানী, মর্যাদাবান সৎ ব্যক্তি যারা আইনের শাসনে রক্ষাকারী হিসেবে বিবেচিত। সমাজে তারা সবসময় সম্মানজনক পেশাজীবী হিসাবে সুপরিচিত। টাইপোগ্রাফার হিসাবে নয়। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, কিছু সিনিয়র এডভোকেট তা উপেক্ষা করেন।

সিনিয়র অ্যাডভোকেট এবং এডভোকেটদের মধ্যে পার্থক্য হল শুধুমাত্র যে অন্যদের মধ্যে সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের জন্য প্রাক শ্রোতা অধিকার প্রদান করে। সিনিয়র এডভোকেটরা আইনপেশার মধ্যে একটি ভিন্ন শ্রেণী গঠন করে। পেশাগত জ্ঞান ক্ষমতা , অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং বারে নেতৃত্বের উপর ভিত্তি করে সিনিয়র এডভোকেট হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মূলত সম্মানজনক এই পার্থক্যটি সংশ্লিষ্ট অ্যাডভোকেটের পেশাগত সক্ষমতা ও দীর্ঘ স্থায়ীত্বের স্বীকৃতি স্বরুপ প্রদত্ত ।

সিদ্ধান্ত সীতীশ কুমার শর্মা ও বার বার কাউন্সিল অফ এইচপি, [(২০০১) ২ এসসিসি ৩৬৫]: (এআইআর ২০০১ এসসি ৫০৯) সুপ্রিম কোর্টের নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণ, ” আইন পেশাকে একটি রাজকীয় পেশা বলা হয়। এটা শুধুমাত্র এইভাবে বললেই রাজকীয় চরিত্র প্রকাশ হয় না, যদি না উন্নতচরিত্রের রাজকীয় পেশা হিসাবে অনুরূপ পেশাগত কার্যক্রম সার্বিকভাবে প্রকাশ এবং সেটা প্রত্যাশিত পর্যায়ে চলমান না থাকে। রাজকীয় মর্যাদার সংরক্ষণ সুরক্ষিত এবং উন্নত করতে হবে হবে। একটি প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র তার নাম বা তার অতীতের গরিমায় বেঁচে থাকতে পারে না। একটি প্রতিষ্ঠানের গৌরব এবং মহানতা নির্ভর করে ক্রমাগত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে তার অবিরত চলমান এবং অর্থপূর্ণ সার্বিক কার্যক্রমের উপর। আইন পেশাটি রাজকীয় সম্মানজনক পেশা হিসাবে তখনি বিবেচিত হবে যদি অর্থবহ, কার্যকর ও উদ্দেশ্যপূর্ণ কর্ম সম্পাদনে অব্যাহত থাকে। যেটি তার দক্ষতা এবং সম্মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুউচ্চ মর্যাদা সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হবে। অতএব, দেশে স্বচ্ছ ও সুন্দর বার যাতে বজায় থাকে সে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য এবং দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আইন পেশা পুনরায় রাজকীয় পেশা হিসাবে গণ্য হয়।

মূল লেখা – সুভাষ এম আর , ভাষান্তর – মো : রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী