ঢাকা , ২০শে আগস্ট ২০১৮ ইং , ৫ই ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » আর্টিকেল » কোটা প্রথা বাতিল এবং সাংবিধানিক অবস্থান

কোটা প্রথা বাতিল এবং সাংবিধানিক অবস্থান

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান:

ইতোমধ্যে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে, দেশের চলমান শান্তি বজায় রাখার নিমিত্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহান সংসদে বাংলাদেশে সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে কোটাপ্রথা বাতিল করার মৌখিক ঘোষণা দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র এ ধরণের সুবিধার ব্যবস্থা করতে কিংবা বাতিল করতে পারে কিনা? আবার রাষ্ট্রের জনগণ তা অধিকার হিসেবে দাবি করতে পারে কিনা? এমনকি আদালতের মাধ্যমে তা অধিকার হিসেবে বলবৎ করা যায় কিনা?

শুরুতেই বিষয়টা স্পষ্ট হওয়া দরকার সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা রাষ্ট্রের জনগণের জন্য একটা সুবিধা (privilege )। এটা কোন অধিকার বলে পরিগণিত হয়না। কারণ রাষ্ট্রের অনগ্রসর শ্রেনী এবং আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের এ ধরনের সুবিধার কথা বলা হয়েছে সংবিধানের ৩য় ভাগে যা মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভূক্ত হলেও সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় তা মৌলিক অধিকারের সমপর্যায়ের বলে পরিগনিত হয়না।

এই বিষয়টাও সবার কাছে পরিষ্কার যে অনুচ্ছেদ ৮ (২) অনুযায়ী ২য় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর করা বা রাখা বাধ্যতামূলক না। এটি রাষ্ট্রের জন্য Directive কিন্তু Mandatory না।

অন্যদিকে সংবিধানের ৩য় ভাগের সকল অধিকার জনসাধারণ তা মৌলিক অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের কাছ থেকে দাবী করার এখতিয়ার রাখে এবং আদালতের মাধ্যমে তা বলবৎ করতে পারে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর অনুচ্ছেদ ২৮ এর প্রথম ৩ টি দফায় রাষ্ট্র বিভিন্ন শ্রেনীর ক্ষেত্রে কোন বৈষম্য প্রদর্শণ করতে পারবেনা বলে বলা হলেও ৪র্থ দফায় বলা হয়েছে – ‘নারী ও শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবেনা।’

তার মানে রাষ্ট্র চাইলে কোটা সুবিধা সহ অন্যান্য সুবিধার ব্যাবস্থা কিংবা চালু রাখতে পারে তবে তা বাধ্যতামূলক না।

অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ২৯ এর প্রথম ২ টি দফায় প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও ৩য় দফায় বলা হয়েছে- ‘নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে …………..’ এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবেনা।

এতে ও বুঝা যায় সরকার তথা রাষ্ট্র কর্মে সমান সুযোগ লাভের ব্যবস্থা নিশ্চিত করলেও কোটা সুবিধা চাইলে ব্যাবস্থা কিংবা বহাল রাখতে পারে। তবে এটাও রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক না।

এদিকে সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে সচেষ্ট থাকার কথা আবারও বলা হয়েছে।

এসব অনুচ্ছেদগুলুতে endeavour, Nothing in this article shall prevent এই ধরনের শব্দ ব্যবহারের মানেই হচ্ছে রাষ্ট্র এসব বিধান মেনে চলা এবং বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে এতে বোধগম্য হয় যে রাষ্ট্রের জন্য তা বাধ্যতামূলক না।

তবে উল্লেখ্য যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল তাৎপর্য, পৃথিবীব্যাপী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থান এবং কোটা সুবিধার দীর্ঘকাল প্রেক্টিসের কারণে অধিকার না হলেও অধিকার হিসেবে দাবি করার একটা নৈতিক অবস্থান দাড়িয়ে যেতে পারে। তাছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এদেশের আপামর জনতার একটা আবেগের জায়গা বিধায় কোটাপ্রথা যৌক্তিক অবস্থানে থাকাটাও যুক্তিযুক্ত।

যেহেতু অনুচ্ছেদ ২৮ এবং ২৯ দুটি সংবিধানের ৩য় ভাগ তথা মৌলিক অধিকারের অংশ সেহেতু সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদের প্রদত্ত এখতিয়ার বলে অনুচ্ছেদ ১০২ অনুযায়ী ভবিষ্যতে কোন writ petition দাখিল হলে তা টিকবে কিনা তাও আবার আইনগত প্রশ্ন হয়ে দাড়াতে পারে।

অতএব সরকার চাইলে রাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কথা বিবেচনা করে যে কোন সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারে।তবে আন্দোলনকারী কিংবা মিডিয়ায় প্রচারিত বিভিন্ন মতামত পর্যালোচনা করে বলা যেতে পারে দেশের জনগণ কোটা সুবিধার বাতিল চায়না বরং এর কিছু যৌক্তিক সংস্কার চায় এবং সংস্কার করলে কিছুক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকার লাভবান হতে পারে যেমন:

১) এতে সংবিধানের Fundamental Principles of State Policy এর মূল তাৎপর্য সুসংহত থাকবে;

২) জনসাধারণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে Harmonious Relationship অক্ষুন্ন থাকবে ও অন্যপক্ষদের আন্দোলন করার সম্ভাবনা কম থাকবে;

৩) মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে;

৪) সুবিধা বঞ্চিত ও অনগ্রসর শ্রেনীর জন্য সুবিধাজনক হলে তা রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের ধারা তরান্বিত হবে;

৫) আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সন্তুষ্টি তথা পার্বত্য এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

তবে এখন দেখার বিষয় দেশ ও জনগনের স্বার্থে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে, তরুন প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে, শক্তিশালী বিচারবিভাগ ও প্রশাসনের কথা মাথায় রেখে, টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতার বিষয় চিন্তা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা কিভাবে বা কতটুকু কার্যকরিতায় রূপ লাভ করে। আশাকরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এর যৌক্তিক এবং win-win সমাধান হবে।

লেখক- শিক্ষক, আইন বিভাগ ও ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর, ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়