ঢাকা , ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং , ১০ই আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকায় বাড়ছে শিশুশ্রম

আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকায় বাড়ছে শিশুশ্রম

দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে শিশুশ্রমিকে সংখ্যা বেশি। রাজধানী ঢাকাতে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বিশেষ করে রাজধানীর লেগুনা, বাস, কলকারখানা, মোটর গ্যারেজ, ইটভাটাসহ অনেক জায়গাতেই দেখা যায় শিশুশ্রমিকদের। কম বেতনে শ্রম পাওয়ার সুবিধায় আইন অমান্য করে শিশুদের কলকারখানায় নিয়োগ করা হয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু ধরা হয়। বাংলাদেশের আইন অনুসারে ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজ করার অনুমোদন দেয়া হয়নি। অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও স্কুলমুখী করা সম্ভব হচ্ছে না এসব শিশুকে।

বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝখানে গড়ে ওঠা ইটভাটায় কাজ করে সবুজ (১২)। একই সঙ্গে কাজ করেন তার মা। পিতৃহীন সবুজের সংসার চলে মা-ছেলের আয়ে। তাই পড়ালেখার কথা ভাবার সময় হয়নি বলে জানায় সবুজ। সবুজ জানায়, ‘মায় একলা কাম করলে অয়? ঘর ভাড়া দেওন লাগে, খাওয়া লাগে। এর লাইগা আমিও কাম করি। স্কুলে যামু কি দিয়া? স্কুলে গেলে কাম করুম কেমনে? আর স্কুলের বই-খাতা কিনা দিব ক্যাডা?’

একই সমস্যার কারণে কাজে নেমেছে সাকিব(১১)। সাকিব লেগুনা সহকারী। কাজ করছে প্রায় বছর খানেক ধরে। দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয়ের বিপরীতে চলে সাকিবদের সংসার। সাকিব জানায়, ‘স্কুলে গেছিলাম। আমগো বাসার ওদিকে একটা স্কুল আছে। আপারা আইয়া স্কুলে ভর্তি করছিল। এক বছর গেছিলাম। এহন আর যাই না। পড়ালেখা ভাল লাগে না।’

সাকিব আরো বলে, ‘স্কুলে গেলে টাকা দিব? ডেলি কাম করলে চাইর-পাচশো টাকা পাই। কয়দিন পর ড্রাইবার হমু। তহন তো আরো বেশি পামু।’

জানা গেছে, মাত্র ১১ বছর বয়সী সাকিব ধূমপায়ী। লেগুনা শ্রমিকদের সিংহভাগ শিশুই ধূমপান, গাঁজা ও ড্যান্ডি আসক্ত। লেগুনা সহকারী থেকে চালকের আসনে বসলেই মাদক সেবনের ধাপ পরিবর্তন হয়। তখন নিয়মিত গাঁজা সেবনের সাথে যুক্ত হয় মরণ নেশা ইয়াবা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই তথ্যদাতাও লেগুনা চালক। তিনি বলেন, ‘আমি আগে প্রাইভেট গাড়ি চালাইতাম। বেশি ইনকামের জন্য লেগুনায় আসছি। এখানে যেসব হেলপার দেখবেন, বয়স কম, কিন্তু বেশির ভাগ পোলাপান গাঁজা খায়। অল্প বয়সে পোলাপানগুলা নষ্ট হইয়া যাইতাছে। কেউ কিছু কয় না। আর কইয়া লাভ কি? ওরা টাকা কামায়, ওরা অগো টাকা দিয়া নেশা করে। কার কি কওয়ার আছে?’

বিদ্যালয়মুখী শিক্ষার্থীরাও অনেকে জড়িত শিশুশ্রমের সাথে। জীবিকার তাগিদে তাদেরও যেতে হয় কাজে। সরকারী সাহায্য সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত ‘আনন্দ স্কুল’-এর শিক্ষার্থী আকাশ (১২)। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত স্কুলে পড়াশোনা শেষে বিকেল থেকে কাজ করেন মোটর গ্যারেজে।

আকাশ বলেন, ‘খালি পড়ালেখা শিক্ষা লাভ কি? আমি কি চাকরি পামু? ইঞ্জিনের কাম শিখতাছি, এহান থিকা বেতনও পাই। কামও শিখি। মিস্ত্রী হইতে পারলে লাভ আছে।’

আবেগের বয়সে সব আকাশদের বিবেক কাজ করে না। তাই দেশের একটি বিশালসংখ্যক শিশু যখন শিশুশ্রমের প্রতি ঝুঁকছে, তখন এগিয়ে এসেছে অনেক বেসরকারি দাতা সংস্থা। নিজস্ব অর্থায়নে এসব শিশুর শিশুশ্রম থেকে দূরে রাখতে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কাজ করছে এসব দাতা সংস্থা।

দাতা সংস্থা ‘রাইটস এন্ড সাইট ফর চিলড্রেন’-এর প্রোগ্রাম এসিস্টেন্ট আরিফ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা শিশুদের নিয়ে কাজ করি। শিশুরা পড়াশোনার বয়সে যেন কাজে না যায়, সেদিকটা নিশ্চিত করাই আমাদের কাজ। আমাদের ফান্ড আছে। আমরা তাদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সকল দায়িত্ব নিচ্ছি। তাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করতে, তাদেরকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতেই আমরা কাজ করি।’

দেশের ভবিষ্যৎ হাল যারা ধরবে তারা যদি শিক্ষার বয়সে কাজে নামে, তাহলে জাতি পিছিয়ে পড়বে। কেবল দাতা সংস্থা দিয়ে নয়, এখানে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকেও। এমনটাই মনে করেন, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) এর চেয়ারম্যান এমরানুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শিশুশ্রম আইন আছে। আইনের প্রয়োগ নেই। আইনের প্রয়োগ যেমন দরকার তেমনি পুনর্বাসন দরকার। তাদের মৌলিক চাহিদার জন্যই এসব শিশু কাজে আসছে। এটা যদি নিশ্চিত করা যায়, যে তার খাওয়া-পরা, লেখাপড়া, চিকিৎসা। এজন্য একটা বাজেট দরকার। এবারের বাজেটে এসব শিশুদের জন্য ঐভাবে বরাদ্দ রাখা হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এদের সমস্যা সবাই বোঝে। এদের সমস্যার গভিরতা বুঝতে হবে। ভাত কাপড়ের অভাবেই তারা কাজে এসেছে। এটা বুঝতে পেরেই এদের তারা কাজে লাগাচ্ছে। এখানে সুবিধা হচ্ছে এদের শ্রমটা সস্তা। অনেক শিশুশ্রমিক দেখা যায়। মোটামুটি একটা সার্ভে করা আছে। আবার করতে হবে। মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কত। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কতজন আছে। এগুলো হিসেব করে এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য বাজেট দরকার।’

বাংলাদেশে শিশুশ্রমের জন্ম কোথা থেকে তার হদিশ না থাকলেও দেশের পরতে পরতে এই অভিশাপ ছড়িয়ে আছে, তা কারোই অজানা নয়। চোখের সামনে ঘটা জাতীয় নিদারুণ ক্ষতি সবার সামনে ঘটলেও বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান অনেকেই। দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরিতে এসব শিশুর জন্য বাজেট ও পুনর্বাসন জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: ঢাকাটাইমস