ঢাকা , ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং , ৬ই আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » দৈনন্দিন জীবনে আইন » পশু জবাই করতে হবে আইন মেনে

পশু জবাই করতে হবে আইন মেনে

মো: রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী:

নানা আয়োজন এবং প্রয়োজনে সুস্বাদু খাবার হিসেবে গোশত সংগ্রহ করতে বছরজুড়ে পশু জবাই হয়ে থাকে। ৯৩% মুসলমানের এদেশে গোশত ছাড়া কোন অনুষ্টান কল্পনাও করা যায় না। এছাড়াও পবিত্র ঈদুল আজহার দিন আমাদের দেশে কোরবানীর পশু হিসাবে লাখ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, উট প্রভৃতি জবাই করা হয়। এসব পশু জবাইয়ের প্রক্রিয়া  নিয়ন্ত্রণ -মানসম্মত মাংসপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে ২০১১ সালে প্রণীত হয় ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন’।এ আইনের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বাস্থ্য, পশুস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষা করা । আইনে বলা হয়েছে, জবাইখানার বাইরে পশু জবাই করা যাবে না, জবাইয়ের পরিবেশ হতে হবে মানসম্মত, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে, পশুজবাই কর্মীদের সংক্রামক রোগ থাকা যাবে না, আইন লঙ্ঘনকারী/অপরাধী অনূর্ধ্ব এক বছর বিনা শ্রম কারাদণ্ড অথবা ন্যূনতম ৫ হাজার এবং অনূর্ধ্ব ২৫ হাজার টাকা আর্থিক দণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন ইত্যাদি। তারপরেও খাদ্যের সামগ্রিক মান নিয়ন্ত্রণসহ জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আমাদের চিরাচরিত দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার অচলায়তনটি পিছু ছাড়ছে না। যেখানে-সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশু জবাই হচ্ছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে খাবার সরবরাহ ও পরিবেশনার কারনে নিরাপদ স্বাস্থ্য ও জীবন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না ।পশুর গোশতের মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স, জলাতঙ্ক, যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়ায়। এসব বিষয়ে সরকার পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন করলেও আইনটির বাস্তবায়ন কার্যত প্রায় শূন্যের কোঠায়। মূলত জনসচেতনার অভাব এবং আইন বাস্তবায়নে যাঁদের দেখভালের কথা তাদের অবহেলার কারনে আইনটি আটকে আছে কাগজে-কলমে। আজ আলোচনা করব আইনটি সম্পর্কে

আইনে ‘জবাই’ বলতে মানুষের ভক্ষণের উদ্দেশ্যে জবাই উপযুক্ত পশুকে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পরিষ্কার ধারালো ছুরি বা চাকু দিয়ে কেটে রক্ত বের বা নিঃসরণ করার পদ্ধতিকে বোঝানো হয়েছে।‘‘জবাই উপযুক্ত পশু’’ বলতে ভেটেরিনারি কর্মকর্তা বা, ক্ষেত্রমত, ভেটেরিনারিয়ান কর্তৃক ঘোষিত জবাইয়ের উপযুক্ত যে কোন সুস্থ পশু বোঝাবে এবং ‘‘ভেটেরিনারি কর্মকর্তা’’ বলতে অর্থ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীন কর্মরত কোন কর্মকর্তা বোঝাবে।

জবাইখানার বাইরে পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য সব পশু জবাই করতে হবে কেবল পশুর নির্দিষ্ট জবাইখানায় অর্থাৎ জবাইপূর্ব পশু পরীক্ষা, পশু জবাই এবং জবাই পরবর্তী কারকাস পরীক্ষার জন্য সরকার কর্তৃক অনুমোদিত কোনো ভবন বা স্থানে।

তবে বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা উৎসবে জবাইখানার বাইরে পশু জবাই করা যাবে। যেমন ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর বা অন্য কোনো ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠানে। সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা ঘোষিত অন্যকোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক চাহিদার ভিত্তিতে পারিবারিক ভোজনের উদ্দেশ্যে জবাইখানার বাইরে পশু জবাই করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে এ রকম স্থানে ও উপায়ে পশু জবাই করতে হবে যেখানে পানি ও পানির উৎস, বায়ু বা পরিবেশের অন্যকোনো উপাদান দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা এবং একইসঙ্গে বর্জ্য অপসারণ বা ফেলতে হবে নির্ধারিত উপায় এবং স্থানে।

বাণিজ্যিকভাবে পশুর মাংস বিক্রি করার উদ্দেশ্যে জবাইখানা, মাংস বিক্রি স্থাপনা এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন এবং এ জন্য সরকারের কাছ থেকে বিশেষ লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিধিবদ্ধ সংস্থা লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে জবাইখানা বা মাংস বিক্রয় স্থাপনা এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন করতে পারবে না।জবাইখানা, মাংস বিক্রয় স্থাপনা এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন করিবার জন্য কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা মহাপরিচালক বা তদকর্তৃক ক্ষমতা প্রদত্ত ভেটেরিনারী কর্মকর্তার নিকট বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও ফরমে আবেদন করিতে পারিবেন।ইস্যুকৃত লাইসেন্সের মেয়াদ হইবে লাইসেন্স ইস্যুর তারিখ হইতে ১(এক) বৎসর ।যদি লাইসেন্সধারী লাইসেন্সে উল্লিখিত কোন শর্ত ভঙ্গ করলে বা এই আইনের অধীন কোন অপরাধের জন্য দন্ডিত হলে মহাপরিচালক বা তাহার নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন ভেটেরিনারি কর্মকর্তা উক্ত লাইসেন্স স্থগিত বা রহিত করতে পারিবে।

উক্ত আইন অনুযায়ী, পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মী সংক্রামক অথবা ছোঁয়াচে রোগমুক্ত কিনা, তা উপযুক্ত চিকিৎসক কর্তৃক প্রত্যায়িত হতে হবে এবং উপযুক্ত চিকিৎসক কর্তৃক প্রদত্ত সনদপত্র জবাইখানা, মাংস বিক্রয় স্থাপনা, মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মালিক, ব্যবস্থাপক বা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংরক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনে ভেটেরিনারি কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারিয়ানকে প্রদর্শন করতে বাধ্য থাকবেন।‘‘উপযুক্ত চিকিৎসক’’ বলতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্ব স্ব অধিক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা বা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, মেডিকেল অফিসার এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন মেডিকেল অফিসার।

আইনের বিশেষ বিধি অনুসারে জবাইখানার পরিবেশ ও মান  নির্ধারণ এবং পশু,  মাংস ও মাংসজাত পণ্য পরিবহন ও বিপনন সরকার নির্ধারিত বিধি মোতাবেক করতে বলা হয়েছে। যদি প্রতীয়মান হয় যে, পশু, মাংস বা মাংসজাত পণ্য পরিবহনের সময় বিধি লঙ্ঘন করা হইয়াছে, তবে তিনি বিধি অনুযায়ী উক্ত পশু, মাংস ও মাংসজাত পণ্য বাজেয়াপ্ত, অপসারণ বা ধ্বংস করিতে অথবা অন্য কোন পদ্ধতিতে উহা নিষ্পত্তি বা বিলি বন্দোবস্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে মহাপরিচালক অথবা তদকর্তৃক ক্ষমতা প্রদত্ত ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ।

পশু বা মাংস বা মাংসজাত দ্রব্যাদি আটক ও অপসারণ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, মহাপরিচালক বা তাহার নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন ভেটেরিনারি কর্মকর্তা বা, ক্ষেত্রমত, ভেটেরিনারিয়ান তাহাদের স্ব স্ব অধিক্ষেত্রে সময় সময়, তদবিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা সহকারে জবাইখানা, মাংস বিক্রয় স্থাপনা ও পরিবেশন স্থাপনা, মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, অন্য কোন স্থান বা যানবাহনে প্রবেশ করতে পারিবেন।যদি কোনো ভেটেরিনারি কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারিয়ান তার আওতাধীন এলাকা পরিদর্শনকালে এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, এই আইন বা বিধি ভঙ্গ করে পশু জবাই, জবাইকৃত পশু অথবা পশুর মাংস পরিবহন অথবা মাংস বা মাংসজাত পণ্য বিক্রয় করা বা পরিবেশন করা হয়েছে, তাহলে তিনি ওই পশু অথবা মাংস বা মাংসজাত পণ্য অথবা যানবাহন আটক করতে পারিবেন অথবা আটক করার নির্দেশ দিতে বা বিধি অনুযায়ী অপসারণ করিতে বা করানোর নির্দেশ প্রদান করতে পারিবেন। এই আইন অথবা বিধির সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, এরকম কার্যক্রম ও অবস্থা পরিলক্ষিত হলে এই আইন বা বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

অপরাধ ও বিচার হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এ আইন বা তার অধীন প্রণীত বিধির কোনো বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহলে ওই লঙ্ঘন ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হবে, যার বিচার মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুসারে করা হবে। যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনে প্রণীত বিধির কোনো বিধান লঙ্ঘন করেন বা তদনুযায়ী দায়িত্ব সম্পাদনে অথবা আদেশ অথবা নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে অনূর্ধ্ব ১ (এক) বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড অথবা অনূ্যন ৫ (পাঁচ) হাজার এবং অনূর্ধ্ব ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন। দ্বিতীয়ত ২৪(২) উপধারা অনুযায়ী,  যদি একই ব্যক্তি পুনরায় এ আইন বা বিধির কোনো বিধান লঙ্ঘন করেন বা তদনুযায়ী দায়িত্ব সম্পাদনে বা আদেশ বা নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি অনুরূপ লঙ্ঘন বা ব্যর্থতার দায়ে অনূর্ধ্ব-২ (দুই) বছরের বিনাশ্রম কারাদ- বা অনূ্যন ১০ (দশ) হাজার ও অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ের বিরুদ্ধে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল করা যাবে। সেই রায়েও সংক্ষুব্ধ হলে দায়রা জজের কাজে আপিল করার সুযোগ আছে।

নানা পুষ্টি ফসফরাস, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি, জিঙ্ক, আয়রন ও প্রোটিন রয়েছে পশুর গোশতে। সরকার আইন করলেও অনেকে এ আইন সম্পর্কে অবগত নন কিংবা জানলেও মেনে চলেন না। যার কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত হয় অন্যান্য জীবিত পশু-পাখি এবং মানুষ তথা প্রাণিজগৎ। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। স্থ্যসম্মতভাবে পশু জবাই কিংবা মাংসের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই আইন মেনে চলতে হবে এবং আইন কার্যকরে ভূমিকা রাখতে হবে । তবেই সুস্থ পরিবেশে মানসম্মত খাবার গ্রহণ এবং রোগমুক্ত সুন্দর জীবনযাপন করা সম্ভব হবে।

লেখক: শিক্ষানবিশ আইনজীবী, চট্টগ্রাম জজ কোর্ট;  ই-মেইল ll.braihan@gmail.com