বিচারপতি সিনহার ‘খোয়াবভঙ্গ’

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ৫:১৩ অপরাহ্ণ
অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

মো. জাকির হোসেন:

পৃথিবীর বুকে সংক্ষিপ্ত জীবনে মানুষ কতই না ‘খোয়াব’ দেখে। কিছু ‘খোয়াব’ পূরণ হয়, আবার অনেক ‘খোয়াব’ পূরণ হওয়ার নয়। ‘খোয়াব’ভঙ্গের দাগা পেয়ে কেউ সংসার বিরাগী হয়, কেউ নেশা-ভাং করে। অনেকে আবার গল্প-কবিতা-উপন্যাস লিখে ফেলে। বিচারপতি সিনহা স্বপ্নভঙ্গের দাগা খেয়ে স্মৃতিচারণমূলক আত্মজীবনী—‘A BROKEN DREAM: Status of Rule of Law, Human Rights and Democracy’ লিখে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন। অতীতে বাংলা সিনেমা মুক্তির আগে প্রচারণা হিসাবে যেমন আসিতেছে, আসিতেছে সাড়া পড়ে যেতো, তেমনি বিচারপতি সিনহার বইটি প্রকাশের কয়েক মাস আগে থেকেই এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে এ বইয়ে অনেকের চৌদ্দগোষ্ঠী ‍ধুয়ে দেওয়া হবে–এমনটি অনুমান করা হচ্ছিল। বইটি পড়ার পর আমার ধারণা জন্মেছে যে, বিশেষ করে বইয়ের তাত্ত্বিক অধ্যায়গুলো কয়েক দশক ধরে গবেষণায় অত্যন্ত পারদর্শী কোনও গবেষকের লেখা। এখানে যে শত শত রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে, তা সংগ্রহ ও পড়তেই একাধিক বছর প্রয়োজন। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রে দৌড়ের ওপর থাকা বিচারপতি সিনহা কখন এত বই সংগ্রহ করলেন, কখন এগুলো পড়লেন আর এত অল্প সময়ের মধ্যে ৫২৩ পৃষ্ঠার বই-ই বা কীভাবে লিখলেন?

আমার অনুমান অনুযায়ী বইটি যদি যৌথ প্রযোজনায় হয়ে থাকে, তবে যে ‘খোয়াব’ভঙ্গের জন্য বিচারপতি সিনহা বেদনাহত হয়েছেন, বইয়ের পাতায় পাতায় বিদ্বেষ উগরে দিয়েছেন; সে ‘খোয়াবের’ মালিকানা তার একার নয়। সেক্ষেত্রে ‘খোয়াবের’ বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিচারপতি সিনহার ‘খোয়াবনামা’ বিদ্বেষপ্রসূত হওয়ায় প্রধান বিচারপতি হিসাবে তিনি যে শপথ নিয়েছিলেন, তা যেমন ভঙ্গ হয়েছে, তেমনি তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও খোয়াবের বস্তনিষ্ঠতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কয়েকটি পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরছি:

এক.

বইয়ের ৪৭৯ পৃষ্ঠায় সিনহা লিখেছেন, বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেছেন বিচারপতিগণ ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে স্বাক্ষর করেননি। এতে তিনি দুঃখ পেয়েছেন, কারণ এর দ্বারা বিচারপতিদের খাটো করা হয়েছে। অথচ তিনি নিজেই চারজন বিচারপতির নাম উল্লেখ করে স্বীকার করেছেন, তারা সিনহার মতের সঙ্গে দ্বিমতপোষণ করায় তিনি তাদের মত পাল্টাতে বুঝিয়েছেন, অতীতে তাদের জন্য কী কী উপকার করেছেন, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের পূর্বের মত পাল্টে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে স্বাক্ষর করতে প্রভাবিত করেছেন (পৃষ্ঠা ৪৩৯-৪৪০)।

সোজা কথায় বললে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে বিচারপতি সিনহা তার ব্যক্তিগত মত কয়েকজন বিচারপতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। অন্যথায় রায় ভিন্ন হতে পারতো। বিচারপতিরা মনে-প্রাণে স্বাক্ষর করেননি–এ কথা বলায় বিচারপতিদের খাটো করা হয়েছে বলে তিনি ব্যথিত হয়েছেন। অথচ তার সঙ্গে বসে বিচারিক কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করায় বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় আপিল বিভাগের সব বিচারককে তিনি অত্যন্ত অবমামনাকর ভাষায় আক্রমণ করেছেন।

তিনি তাদের স্টুজেস (দালাল বা হাতের পুতুল), বিশ্বাসঘাতক, ষড়যন্ত্রী, বিচারিক নিয়মকানুন ভঙ্গকারী আখ্যায়িত করেছেন। এমনও বলেছেন যে, বিচারপতিরা সস্তায় বিক্রি হয়ে গিয়েছেন (পৃষ্ঠা ৪৮৬-৪৮৮)।

তিনি সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করেছেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে। বিচারপতি সিনহা তাকে বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাকের কার্বনকপি ও ফ্যানাটিক হিসেবেও অখ্যায়িত করেছেন (পৃষ্ঠা ৪৯৯-৫০০)।

দুই.

বিচারপতি সিনহা তার বইয়ে দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে গেলে তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি ও কিছু বিচারকের দুর্নীতির কথা তার (সিনহার) সঙ্গে আলোচনা করতেন। তিনি আরও দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতি তাকে বলেছেন, অনেক অনৈতিক, বেআইনি ও নীতিগর্হিত ফাইল তিনি অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন এমন ফাইল যেন তার কাছে পাঠানো না হয় (পৃষ্ঠা ৪৩২)।

তার বক্তব্য অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ। এটি খুবই সুখের কথা। ড. কামাল হোসেনদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের একটি দাবি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা। আর আওয়ামী লীগ সরকার তো ইতোমধ্যে তা অনুশীলন করে চলেছে। রাষ্ট্রপতি সিনহার দুর্নীতির বিষয় আপিল বিভাগের অন্য বিচারকদের জানানোয় ক্ষিপ্ত হয়ে বিচারপতি সিনহা রাষ্ট্রপতিকে আক্রমণ করে লিখেছেন, রাষ্ট্রপতি মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ ও ক্ষমতালোভী (পৃষ্ঠা ৪৩২)।

আরেক জায়গায় সিনহা রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী কিংবা ডিজিএফআই-এর হাতের পুতুল, শপথ ভঙ্গকারী, নিজের অভিমতের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অক্ষম, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজ উদ্দিনের চেয়েও খারাপ, রাষ্ট্রপতির পদ ও সংবিধানের প্রতি অবিশ্বস্তের মতো নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন (পৃষ্ঠা ৪৮৭-৪৮৯)।

রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে সিনহার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কোনটিকে আমরা সত্য বলে ধরে নেবো? তদুপরি সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে এমন অশালীন মন্তব্য স্বাধীন বিচার বিভাগের স্বপ্নদ্রষ্টার অচরণের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।

তিন.

সিনহা তার বইয়ের ৪৩৭ নং পৃষ্ঠায় দাবি করেছেন ১ জুলাই ২০১৭ তারিখে তাকে বঙ্গভবনে ডেকে নিয়ে সরকারের পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য চাপ দিলে তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগে বারণ করায় তিনি পদত্যাগ করেননি। সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নেতাদের অসৌজন্যমূলক ও আক্রমণাত্মক ভাষায় বিচলিত হয়ে সিনহা দ্বিতীয়বার পদত্যাগ করার ইচ্ছাপোষণ করে অ্যাটর্নি জেনারেলকে ফোন করে এ বিষযে প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে বলেন বলে দাবি করেছেন।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী ফোন করে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন জানালে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। কিন্তু বইয়ের অনেক জায়গায় তিনি দাবি করেছেন, সরকার তাকে পদত্যাগে বাধ্য করতে ডিজেএফআইকে দিয়ে অপমান করেছে। এমনকি এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকেও দায়ী করেছেন। প্রশ্ন হলো, যিনি পদত্যাগ করার জন্য নিজেই প্রস্তুত ছিলেন, সেই তিনি ডিজিএফআই অপমানিত হওয়ার আগেই সরকারের মনোভাব বুঝে কেন পদত্যাগ করলেন না?

চার.

সিনহা লিখেছেন তিনি প্রধান বিচারপতি হয়ে নিম্ন আদালতে ও সুপ্রিম কোর্টে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তিনি আরও লিখেছেন যথাসময়ে আদালত শুরু করতে ও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আদালতের অধিবেশন চালিয়ে যেতে তিনি বিচারকদের বাধ্য করেছেন। তার মানে, আদালত ও বিচারকদের ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল (পৃষ্ঠা ৫০৮)।

অথচ বইয়ের ৪৩৫ পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, নিম্ন আদালত সম্পূর্ণভাবে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তিনি সঠিকভাবে কাজ করতে পারেননি। সিনহার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কোনটি সত্য?

পাঁচ.

বিচারপতি সিনহা তার বইয়ে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম রেখেছেন–চরিত্রহনন। এ অধ্যায়ে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপিসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া তার বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক ও অসৌজন্যমূলক ভাষা ব্যবহার ও চরিত্রহনন করায় তিনি আহত ও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ তিনি নিজেই তার বইয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আপিল বিভাগের বিচারপতি, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, আইনমন্ত্রী ও আইন সচিবের বিরুদ্ধে নির্দয় চরিত্রহননকারী মন্তব্য ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি কাউকে দালাল, সরকারের এজেন্ট, হাতের পুতুল, সস্তায় বিক্রি হওয়া, শপথ ভঙ্গকারী, এমনকি আপিল বিভাগের বিচারপতিদের আইন না জানা ও না মানার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। তিনি চলে যাওয়ার পর সুপ্রিমকোর্ট আইন মন্ত্রণালয়ের একটি ডিপার্টমেন্টে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন (পৃষ্ঠা ৫১৮)। এটি উচ্চ আদালত ও এর শতাধিক বিচারপতির প্রতি চরম অবমাননা।

বিচারপতি সিনহা তার বইয়ের ৪৯২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন—I realized that all the judges were against me. ৪৮৫ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা তার বাসায় এসে তাকে আদালতে না যেতে পরামর্শ দেন। কেননা হাইকোর্টের বিচারপতিরাও রেওয়াজ অনুযায়ী তার সঙ্গে দেখা করবেন না। স্বাধীন বিচার বিভাগের স্বপ্নদ্রষ্টা দাবিদার বিচারপতি সিনহা কি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন, সব বিচারপতি কেন তার বিরুদ্ধে গেলেন? সরকার যদি সব বিচারপতিকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে তিনি এতদিন ধরে কী করেছেন? আর সহজেই যারা প্রভাবিত হয়ে যান, এমন বিচারপতিদের নিয়ে তিনি কীভাবে স্বাধীন বিচার বিভাগের লড়াই করতেন? বিচারপতি সিনহা কখনও অনুধাবন করার চেষ্টা করেননি যে, বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হলে, সহযোদ্ধা বিচারকদের ভালোবাসা পেতে হলে, তাদের নিয়ে একসঙ্গে লড়তে হলে বিচার বিভাগের প্রধানের একটি ক্লিন ও নিরপেক্ষ ইমেজ থাকতে হয়। বিচারপতি সিনহার কি সেটা ছিল?

দুঃখজনক হলেও উত্তরটি ইতিবাচক নয়। বিচারপতি সিনহা নিরপেক্ষ হওয়ার পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে তার পক্ষের লোকদের দিয়ে একটি বলয় গড়ে তুলেছিলেন, যা অন্য বিচারকরা ভালোভাবে নেননি। শুধু এ সরকারের আমলেই নয়, অনেক আগে থেকেই তার গায়ে দুর্নীতিবাজের তকমা লেগেছিল। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের একটা স্টাইল ছিল দুর্নীতিবাজদের বঙ্গভবনে ডেকে চায়ের দাওয়াত দিয়ে চাকরি থেকে বিদায় করা। মাত্র দু’জন বিচারক এমন চায়ের দাওয়াত পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে তিনিও একজন। কথিত আছে ড. কামাল হোসেনের জোর লবিং ও একটি দেশের মধ্যস্থতায় তিনি সে দফায় ছাড়া পান। আদালত পাড়ায় তার দুর্নীতির কথা সবার মুখে মুখে প্রচলিত।

জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সদস্য হিসেবে আমি বেশ কয়েক বছর দায়িত্বপালন করেছি। আমার দায়িত্বপালনকালীন সময়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলাম, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও সবশেষে বিচারপতি সিনহাকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে পেয়েছি। মানুষ হিসেবে বিচারপতিদের মধ্যে কত বিশাল পার্থক্য হয়, তা খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বিচারপতি সিনহা কমিশনের চেয়ারম্যান হওয়ার পরদিনই আদালত পাড়ায় আমার বন্ধু-বান্ধবরা নানা বিষয়ে আমাকে সাবধান করে দেন। সাবধান বাণীর সত্যতা মেলে কয়েক দিনের মাথায়। কাঠপেন্সিলে লিখে কিছু রোল নম্বর দিয়ে বিচারপতি সিনহা আমাকে বলেন, এদের বিচারক বানাতে হবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে দ্বিমত করি। তিনি রাগান্বিত হলেও যুক্তি দিয়ে আমার মত পাল্টাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আমার ওপর ক্ষুব্ধ হন। কমিশনের বিচারক নিয়োগে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য দুইজন পরীক্ষকের লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে একজন পরীক্ষক দ্বারা উত্তরপত্র মূল্যায়নের প্রস্তাব আনলে আমি দৃঢ়ভাবে এর বিরোধিতা করি ও যুক্তি উপস্থাপন করি। কমিশনের অন্য সদস্যরা আমার যুক্তির পক্ষে অবস্থান নিলে বিচারপতি সিনহার পছন্দ মতো একজন পরীক্ষককে দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যয়নের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। মাঝে-মধ্যেই লক্ষ করতাম, কমিশনের মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে কোনও কোনও পরীক্ষার্থী প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই বিচারপতি সিনহা বলে উঠতেন–তোমাকে আর কেউ প্রশ্ন করবে না আমি প্রশ্ন করবো।পারলে ভালো নম্বর দেবো। দেখা যেতো, দুই-একটা সহজ প্রশ্ন করে নিজেই পরীক্ষর্থীর প্রশংসা শুরু করতেন এবং তাকে ভালো নম্বর দেওয়ার প্রস্তাব করতেন। বিচারপতি সিনহার অসৎ উদ্দেশ্য অনুমান করে নিষেধ অমান্য করে আমি পরীক্ষর্থীকে প্রশ্ন শুরু করতাম, এরপর অন্য সদস্যরাও প্রশ্ন করতেন। এতে তিনি আমার ওপর বেজায় ক্ষিপ্ত হতেন। আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি চক্রান্ত শুরু করেন। চট্টগ্রাম থেকে বিমানে আসা-যাওয়া করি, এ অজুহাতে আমার সিটিং অ্যালাউন্স বন্ধ করে দেওয়া হয়। কমিশনের সদস্যদের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হতো, কিন্তু আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গেলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ কমিশনের সভা নয়, এ অজুহাতে আমাকে কোনও টিএ-ডিএ দেওয়া হতো না। বিচারপতি সিনহার অন্যায় আব্দার মেনে না নেওয়ায় ও প্রতিবাদ করায় কমিশনের সদস্য হওয়ার পরও সিনহা মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে আমাকে বসতে দেননি। তিনি পরপর দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষককে আমার পরিবর্তে মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে বসার আমন্ত্রণ জানালেও তারা সঙ্গত কারণেই আমার পরিবর্তে বোর্ডে বসতে রাজি হননি। ফলে ওই বছর মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে আইনের কোনও শিক্ষক ছিলেন না।

প্রসঙ্গত, কমিশনের প্রশ্ন প্রণয়ন, পরিমার্জন, ছাপানো, পরীক্ষার হলে দায়িত্বপালন, উত্তরপত্র পরীক্ষণ, টেবুলেশন—কোনও কিছুর সঙ্গেই সিনহা আমাকে যুক্ত করেননি। পরিস্থিতি চরমে উঠলে আমি সিদ্ধান্ত নেই, এমন স্বৈরাচারী, দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যানের সঙ্গে আর কাজ করবো না। তাই তার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ও আমার আর্থিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে ২০১২ সনের ১৫ জুলাই সিনহাকে দুটি পত্র দেই ও কমিশনের সদস্যদের এর কপি দেই। এরপর কমিশন ছেড়ে চলে আসার আগে এক সভায় প্রকাশ্যে আমি সিনহার অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করি। আমার প্রতি অন্যায় আচরণ, সিনহাকে পত্র দেওয়া ও তাকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে বাংলাদেশ আইন কমিশনের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ আলম ও মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান জানতেন। কেউ আমার এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে চাইলে তাদের দু’জনসহ কমিশনের সদস্য বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ, বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মজিদ, আইন সচিব শেখ আবু সালেহ মোহাম্মদ জহিরুল হকের কাছে যাচাই করতে পারেন।

বিচার বিভাগকে ঘিরে বিচারপতি সিনহার ‘খোয়াব’ভঙ্গ যদি হয়েই থাকে, তার দায় তিনি এককভাবে সরকারের ওপর যেভাবে চাপানোর চেষ্টা করেছেন, তা সত্য নয়। বরং সিনহার ব্যক্তিগত চরিত্র, তার ক্লিন ইমেজ না থাকা, সরকারের অন্য দুটো বিভাগকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, সহযোদ্ধা বিচারকদের তার প্রতি আস্থাহীনতা, অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, শুধু নিজে ভালো অন্য সবাই খারাপ এমন মনোভাব এবং কিছু বিচারককে নিয়ে কোটারি তৈরি করাও অনেকাংশেই এ জন্য দায়ী।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: zhossain@justice.com

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন