আইন পেশার অতীত ও বর্তমান

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:৫৫ অপরাহ্ণ

ড. শেখ আকরাম আলী: 

আইন পেশা প্রাচীন পেশাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে এ পেশার ইতিহাস পুরনো। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, আমাদের এই ভূখণ্ডে প্রাচীনকালে আইন পেশার প্রচলন থাকলেও তা আধুনিককালের মতো

সুসংগঠিত ছিল না। মুসলিম শাসনামলে বাংলায় আইনচর্চা মহৎ পেশা হিসেবে স্বীকৃত ছিল। মুসলিম যুগে বিচারক (কাজী) এবং আইনজীবী (মুফতি), উভয়ই ইসলামি শরিয়াহ আইনের বিশেষজ্ঞ ছিলেন। মুফতিরা আদালতে আইনজীবীর ভূমিকা পালন করতেন এবং একই ভূমিকা পালন করতেন হিন্দু পণ্ডিতরাও। এ সময়ে আইনজীবীরা উকিল হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

আধুনিক ধারার আইন পেশার শুরু তদানিন্তন বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে। গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস কোম্পানির বিচার কাজের সুবিধার্থে ১৭৯৩ সালে আইনের মাধ্যমে ইংরেজ আদলে আইন পেশার সূচনা করেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশেষ করে মুসলিমদের এই পেশা থেকে সুকৌশলে দূরে রাখা হয়। ইংরেজদের আইনে অভিজ্ঞদেরই আইন পেশায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়। তবে ইংরেজ আইনজীবীরা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে স্থানীয়দেরও নিম্ন আদালতে বিচারকাজে আইনজীবী হিসেবে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়া হয়। কালক্রমে আইন পেশা একটি মহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের বেশির ভাগই ছিলেন পেশায় আইনজীবী। এমনকি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে আইন পেশার সদস্যদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে আইন পেশার সদস্যরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় আইনজীবীরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আইন পেশার প্রভাব লক্ষণীয়। একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী আইনজীবী সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং হতে পারেন নতুন সমাজ নির্মাণের কারিগর। এ জন্য আইনজীবীকে সমাজ নির্মাণের কারিগর (Social Engineer) হিসেবে অভিহিত করা হয়। সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে এবং জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে আইন পেশার ভূমিকা ইতিহাস পাঠে জানা যায়। আসলে সমাজসেবার মহান ব্রতই আইন পেশার মূলমন্ত্র। আইনজীবীরা সমাজের মধ্যেই আরেকটি সমাজ (Community within a community)। ‘আইন পেশা একটি স্বতন্ত্র জীবনধারা’ (Way of life)। সর্বক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই আইনজীবীদের মূল উদ্দেশ্য।

আইনজীবীর জীবন কঠিন সংগ্রামের জীবন। তাকে জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করতে হয়। সংগ্রামের ওপরই তার সফলতা নির্ভর করে। সামাজিক স্বীকৃতির সঙ্গে তিনি অর্জন করেন সম্মান, যশ, অর্থবিত্ত এবং ক্ষমতা-প্রতিপত্তি। সমাজে দ্বিতীয় কোনো পেশা নেই যার মাধ্যমে সম্মান, সম্পদ ও ক্ষমতা একই সাথে লাভ করা যায়। একজন সফল ব্যবসায়ী অর্থসম্পদের মালিক হতে পারেন, রাজনীতিবিদ ক্ষমতা ভোগ করতে পারেন এবং সমাজসেবক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হতে পারেন, কিন্তু একজন আইনজীবী এর সবই অর্জন করতে সক্ষম। এ দিক থেকে আইন পেশা স্বতন্ত্র মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অনেক সমাজবিজ্ঞানী আইন পেশাকে সর্বশ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আইনজীবী একজন পেশাদার ব্যক্তি। স্বভাবতই তাকে পেশার উৎকর্ষ সাধনে সব সময় সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে হয়। আইন পেশা জীবনভিত্তিক। এই মহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশার সদস্য হতে হলে একজন আইনজীবীকে অবশ্যই বিশেষ গুণাবলির অধিকারী হতে হয়। সর্বাবস্থায় তাকে মক্কেলের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। আইনজীবীর পেশাদারিত্ব নির্ভর করে তার জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও চরিত্রের ওপর। একজন পেশাদার আইনজীবীর জন্য সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। আইন, আইন পেশা এবং উন্নয়ন পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পেশাদার আইনজীবীর নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসহ জাতীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের আইন শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে হবে জাতির চাহিদা ও পেশার দাবি পূরণ করা। প্রচলিত আইন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি দায়িত্বশীল, যোগ্য এবং পেশাদার আইনজীবী তৈরি করতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে কি না এর পর্যালোচনা প্রয়োজন এবং যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টিতে এটা কতটা সহায়ক ভূমিকা রাখছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে।

আইন একটি ব্যাপক ধারণাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। আদালত থেকে শুরু করে প্রাসঙ্গিক গবেষণা, শিক্ষকতা, ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্পকারখানা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেখানেই আইন ভূমিকা রাখছে, তার সবই এর অন্তর্ভুক্ত। সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত কলাকৌশল শিক্ষা দেয়া আইনি শিক্ষায় নিয়োজিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান আইন পেশার সদস্যদের জন্য অপরিহার্য। আইন এমনি একটি বিজ্ঞান, যার জ্ঞান আইন পেশায় যোগদানের জন্য অত্যাবশ্যক। সব আইনি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হতে হবে আদর্শ ও পেশাদার আইনজীবী তৈরি। আমেরিকার হার্ভার্ড ল স্কুল দু’টি বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দেয়। প্রথমত, ছাত্রদের আইন পেশার উপযোগী করে গড়ে তোলা এবং দ্বিতীয়ত, আইন ও সরকার সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্ভাবন ও উন্নয়ন।

সমাজ থেকে দারিদ্র্য, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি উচ্ছেদসহ আইনের শাসনের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেতনা সৃষ্টি করার সহায়ক শিক্ষা আইন পেশার জন্য অপরিহার্য। আইনি শিক্ষার উদ্দেশ্যই হতে হবে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের চেতনা সৃষ্টি। ভবিষ্যৎ আইনজীবীকে গড়ে তুলতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্য ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ভবিষ্যৎ আইনজীবীকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। ভবিষ্যৎ আইনজীবীর মধ্যে প্রথম দিন থেকেই আইনজীবীসুলভ মানসিকতা তৈরি করতে যত্নবান হতে হয় এবং আইনের মৌলিক বিষয়, নীতি ও কৌশল শিক্ষা দিতে হয়, যা একজন আইনজীবীর প্রধান হাতিয়ার। ভবিষ্যৎ আইনজীবী আইন ও বিচারব্যবস্থাপনা সম্পর্কে যেন বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনের ধারা-উপধারা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান দেয়ার চেয়ে আইনের মৌলিক নীতিগুলোর জ্ঞান থাকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

প্রফেসর গাওয়ার আইনের পাশাপাশি অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং সম্ভব হলে মনোবিজ্ঞান শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একটি দেশের জটিল সামাজিক কাঠামো, মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে হলে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোর প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যৎ আইনজীবীকে নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সৎ চরিত্র ও দৃঢ় মনোবলের অধিকারী করে গড়ে তুলতে পারলে সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। আইনজীবী জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও ধীশক্তি ব্যবহার করে সমাজ থেকে বিশৃঙ্খলা ও অপসংস্কৃতি দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

গণমানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হলে আইনজীবীকে তার পেশার মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার্থে সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি মেনে চলতে হয়। বিচারককে যেমন সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি মেনে চলতে হয়, তেমনি আইনজীবীরও মানসম্মত আচরণবিধি মানা জরুরি। তাকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হয় এবং আচরণবিধি পালনে যত্নবান হতে হয়। অন্যথায় পেশার অমর্যাদা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাকে সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে মামলার সাথে জড়িত প্রতিটি কাজ যত্নসহকারে সম্পন্ন করতে হয়। আদালতে মামলা পরিচালনায় সব সময় ধীরস্থির থাকতে হয় এবং সময়ানুবর্তিতার প্রতি খেয়াল, সর্বাবস্থায় সিনিয়র আইনজীবীর প্রতি সম্মান এবং সাক্ষীর প্রতি যথাযথ সম্মান দেখিয়েই মামলা পরিচালনা করতে হয়। অবিরাম দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা আইনজীবীর নৈতিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

একজন আইনজীবীকে সব সময় মক্কেলের স্বার্থ, ন্যায়বিচার এবং পেশার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সাহসের পরিচয় দিতে হয়। সব বিষয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। তাকে সব সময় নিজের আত্মীয়স্বজন এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে স্বার্থের ঊর্র্ধ্বে সত্য ও ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দিতে হয়। মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি মক্কেলের অনেক ব্যক্তিগত ও গোপনীয় বিষয় জানতে পারেন। কিন্তু এসব বিষয় মক্কেলের এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থের বাইরে ভিন্ন কোনো প্রয়োজনে বা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায় না। এমনকি, মক্কেলের গোপনীয় এবং ব্যক্তিগত বিষয় জনস্বার্থ বা ন্যায়বিচারের প্রয়োজন ছাড়া কোনো অবস্থাতেই প্রকাশ করাও যায় না। আইনজীবীকে কাজ করতে হয় দেশ ও সমাজের স্বার্থেই। বৃহত্তর সমাজই তার শ্রেষ্ঠ মক্কেল এবং এই মক্কেলের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে প্রাধান্য দিতে সক্ষম হলেই নিজেকে সার্থক পেশাদার আইনজীবী হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। এমন আইনজীবী দেশ ও সমাজের জন্য- বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের জন্য বড়ই প্রয়োজন।

বর্তমানে আইনজীবী সম্প্রদায় এক মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এর নাম অতিরিক্ত রাজনীতি চর্চা। রাজনীতি করা অন্যায় নয়; বরং দেশ ও সমাজ সেবার অন্যতম প্রধান পথ। ব্যক্তি হিসেবে আইনজীবী রাজনীতি করতেই পারেন- এটা তার নাগরিক অধিকার। এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন না। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে আইনজীবী সম্প্রদায়কে নিয়ে। দেশ ও পেশার স্বার্থে নিরপেক্ষ থাকা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আইনজীবী সমাজ দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ছে এবং জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। অথচ ঐক্যবদ্ধ থাকাই যেকোনো পেশার মূল বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনজীবী সম্প্রদায় অন্যান্য পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মতো দলীয় রাজনীতির বশংবদে পরিণত হচ্ছে। অতিমাত্রায় সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী কখনো দলের স্বার্থের বাইরে ভূমিকা রাখতে পারেন না। জাতির বিবেক বলে পরিচিত আইনজীবী সম্প্রদায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। নিরপেক্ষ আইনজীবীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে উচ্চ আদালতের জন্য নিরপেক্ষ বিচারক পাওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে পারে না। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে এবং এই পেশার মর্যাদা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। তা হলেই ফিরে আসবে আইন পেশার ঐতিহ্য। দেশ ও জাতি নিঃসন্দেহে এতে উপকৃত হবে।

লেখক : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের শিক্ষক