যততত্র পোস্টার, বিলবোর্ড ও দেওয়াল লিখন শাস্তিযোগ্য অপরাধ

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ৩:০৪ অপরাহ্ণ
মো. রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী

মো. রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী:

দেশে নির্বাচন যখন অত্যাসন্ন হয় তখন বিড়ম্বনার আরেক নাম হয় যততত্র প্রচারণামূলক দেওয়াল লিখন, পোস্টার আর বিলবোর্ড। নগরী থেকে শুরু করে গ্রামে সর্বত্র চোখে পড়বে । বাসস্থান, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা, স্কুল-কলেজ, ব্যবসাকেন্দ্র, হাট-বাজার, মসজিদের দেয়াল থেকে শুরু করে বেড়া, গাছ, বিদ্যুতের খুটি, খাম্বা, সড়ক বিভাজক, ব্রীজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভার কিংবা সড়কের উপরিভাগ সব স্থানেই যতদূর দৃষ্টি যায় চোখে পড়বে দেওয়াল লিখন, পোষ্টার আর বিলবোর্ড। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যাক্তি করলেও সারা বছরজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার তাদের প্রচার প্রচারণার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে যত্রতত্র পোস্টার লাগানো, বিলবোর্ড সাঁটা আর দেওয়াল লিখনকে।

যদিও দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া এই কাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন লঙ্ঘন করে নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে দেয়াল লিখন এবং পোস্টার সাঁটালে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড ভোগ করতে হবে। এছাড়াও নির্বাচনী বিধিমালা মতে বিধিবহির্ভূত দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ। আজকে এসব বিষয়ে আলোকপাত করব।

দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ আইন অনুযায়ী , দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর পূর্বে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হতে অনুমতি নিতে হবে । স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলতে- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনসহ কোন আইনের অধীন কোন নির্দিষ্ট কার্যাদি সম্পাদনের জন্য প্রতিষ্ঠিত কোন কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান কে বোঝানো হয়েছে ।

সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাবার জন্য প্রশাসনিক আদেশ দ্বারা স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারবে এবং উক্ত নির্ধারিত স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগাতে হবে । নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে না। তবে আরও বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট ফি প্রদান করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে উল্লিখিত নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোন স্থানে নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে ।

আইনে বলা হয়েছে সময়সীমা অতিবাহিত হবার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে সময় সময় অননুমোদিত যে কোন দেওয়াল লিখন বা পোস্টার মুছে ফেলতে বা অপসারণ করতে পারবে ।

এসব কাজের সকল খরচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সুবিধাভোগীর থেকে নগদ আদায় করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সুবিধাভোগী কোন অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে না পারলে তা Public Demands Recovery Act, 1913 (Act IX of 1913) এর বিধান অনুযায়ী সরকারি দাবী হিসেবে আদায় করতে পারবে।

নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোন দেওয়াল লিখন বা পোস্টার মুছে ফেলা না হলে বা অপসারণ করা না হলে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে নগদ অর্থ আদায় করা না গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারবে। অনাদায়ে অনধিক ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে। উক্ত ব্যক্তির নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেওয়াল লিখন বা পোস্টার মুছে ফেলবার বা অপসারণের জন্য আদেশ প্রদান করতে পারে । আর সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীর তথা এমন কোন ব্যক্তি, যার প্রয়োজনে বা স্বার্থে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো হয় তার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে। অনাদায়ে অনধিক ৩০ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে। এছাড়াও ঐ ব্যক্তি বা সুবিধাভোগীকে তার নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেওয়াল লিখন বা পোস্টার মুছে ফেলবার বা অপসারণের জন্য আদেশ প্রদান করতে পারে।

দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী , কোন কোম্পানী তথাকোন প্রতিষ্ঠান, অংশীদারী কারবার, সমিতি, সংঘ, সংগঠন এবং সংস্থা এই আইনের অধীন কোন অপরাধ করলে বা এমন কোন অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকলে ঐ কোম্পানীর প্রত্যেক পরিচালক, ম্যানেজার, সচিব, অংশীদার, কর্মকর্তা এবং কর্মচারী ঐ অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে । যদি না তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে ঐ অপরাধ তার অজ্ঞাতে করা হয়েছে বা ঐ অপরাধ রোধ করার জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। আইনে কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি বিধান লঙ্ঘন করে দেয়াল লিখন বা পোস্টার সাঁটালে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন ৫ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

অপরাধের বিচার সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই আইন লঙ্ঘন করার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংঘটিত অপরাধের বিচার মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুযায়ী করতে হবে। সুবিধাভোগীর ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়া গেলে ফৌজদারি বিধি, ১৮৯৮ অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার হবে।

আরো বলা হয়েছে, যদি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্বাচনে, নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি-বিধান এবং এতদুদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারীকৃত নির্দেশনা থাকে, সেটা প্রযোজ্য হইবে । এছাড়াও অন্য কোন নির্বাচনে, সংশ্লিষ্ট নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে পূর্বানুমোদন গ্রহণ সাপেক্ষে, উক্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত স্থান ও শর্তে, নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাইবে । অর্থাৎ উক্ত সময়ে দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ প্রযোজ্য হবে না । তবে নির্বাচন সম্পন্ন হইবার ১৫(পনের) দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক অপসারণ বা মুছিয়া ফেলা না হইলে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ আইনের ৬ ধারায় বর্ণিত দণ্ড আরোপ করতে পারবে।

উল্লেখ্য, যততত্র দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো বিষয়ে আমাদের দেশে সর্বপ্রথম নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য অনুসরণীয় আচরণ বিধিমালায় নির্বাচন পূর্ব সময় যেকোনো ধরনের দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর ব্যাপারে বাধা-নিষেধ আরোপ করে এর লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধান করা হয়। এ আচরণ বিধিমালাটি ১৯৯৬ সালে প্রণীত হলেও পরবর্তীতে তা ২০০৮ সালে প্রণীত আচরণ বিধিমালা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

উক্ত বিধিমালা অনুযায়ী নির্বাচনপূর্ব সময়ের ব্যাপ্তি বিষয়ে বিভিন্ন নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে যেমন— জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কাল। আবার উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদের কোনো আসন শূন্য ঘোষণা হওয়ার পর থেকে উক্ত আসনের জন্য অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের জন্য ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কাল। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত সময়কাল।

জাতীয় সংসদ বা সংসদ উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনপূর্ব সময়ে বিধিমালা লঙ্ঘন করলে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা হলো— অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিধিমালা লঙ্ঘনে যে দণ্ডের উল্লেখ রয়েছে তা হলো, অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। এ কাজটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল দ্বারা সংগঠিত হলে যে দণ্ডের বিধান রয়েছে তা হলো, অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড।

আমাদের দেশে দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো বর্তমানে একটি মারাত্মক সামাজিক উপসর্গ। নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় এবং দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ হলেও তা সামগ্রিকভাবে দেশের জনসাধারণকে সমস্যাটি থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারছে না । পরিস্কার পরিচ্চন্ন নাগরিক জীবন যাপন করতে হলে আমদেরকে এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। যে যার পক্ষ থেকে আন্তরিক ভূমিকা রাখতে হবে। কর্তৃপক্ষে আইন প্রয়োগে দায়িত্বশীল এবং কঠোর হবে।

লেখক : শিক্ষানবীশ আইনজীবী, চট্টগ্রাম জজ কোর্ট; ইমেইল – ll.braihan@gmail.com