‘সংবিধান সংশোধন সাংবিধানিক উপায়েই হতে হবে’

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর, ২০১৮ ৪:০৭ অপরাহ্ণ

প্রতিবছরের মতো এবারও উদযাপন হচ্ছে সংবিধান দিবস। স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণের দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪ নভেম্বর এ দিবস উদযাপন করা হয়। দিবসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে কথা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের সঙ্গে।

সংবিধান দিবস বলতে কী বোঝায়? এ দিবসের গুরুত্ব কতটুকু? বিশ্বের কোন কোন দেশ সংবিধান দিবস উদযাপন করে আসছে?

তুরিন আফরোজ: দেশের জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তি সংবিধান। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর আমরা আমাদের সংবিধান রচনা ও বিধিবদ্ধ করে সমবেতভাবে গ্রহণ করেছিলাম। ফলে এই দিনটি আমাদের সংবিধান দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে সংবিধান রচনা ও বিধিবদ্ধ করে সমবেতভাবে গ্রহণ করার দিনটিই আমাদের ‘সংবিধান দিবস’। আমাদের জন্য এই দিনটি বিশেষ গুরুত্ববাহী। তাই প্রতিবছর ৪ নভেম্বর ‘সংবিধান দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়। পৃথিবীর বেশিরভাগ উন্নত দেশই সংবিধান দিবস উদযাপন করে। এসব দেশের মধ্যে ভারতে ২৬ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ সেপ্টেম্বর, কানাডায় ১ জুলাই, রাশিয়ায় ১২ ডিসেম্বর সংবিধান দিবস। এই দিনগুলোতে এসব দেশের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির গৌরব রক্ষায় সংবিধান দিবসের অবদান কতটুকু?

তুরিন আফরোজ: আমাদের জীবনে সংবিধান দিবস মহান তাৎপর্য বহন করে। এ দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার ফলে আমরা আমাদের সংবিধান পেয়েছি। স্বাধীনতা অর্জন ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাতি হিসেবে আমাদের একটি ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমাদের সংবিধান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর কয়েক লাখ নির্যাতিত নারীর তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। তাই জাতি হিসেবে সংবিধান রক্ষা করা এবং তার সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।

সংবিধান সমুন্নত রাখতে আমাদের তিনটি (নির্বাহী, বিচার, আইন) বিভাগের কোনটির গুরুত্ব কতটুকু?

তুরিন আফরোজ: রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ। নির্বাহী, বিচার ও আইন—যে কোনো আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য এ তিনটি বিভাগেরই গুরুত্ব সমান। আইন বিভাগ যেমন আইন প্রণয়ন করে, তেমনি নির্বাহী বিভাগ প্রণীত আইনের সঠিক প্রয়োগ করে আর বিচার বিভাগ এই আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেন অসাংবিধানিক কিছু না ঘটে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং আইনের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। তাই আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি বিভাগের কোনোটিই কারো উপরস্থ বা অধীন নয়। তিনটি বিভাগের কোনোটিই কম গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং সব বিভাগই সমান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমাদের স্মরণ রাখতে হবে তাহলো আমাদের সংবিধানের মূল চেতনা হচ্ছে সুপ্রিমেসি অব কনস্টিটিউশন বা সাংবিধানিক প্রাধান্য। বিশেষ কোনো একটি বিভাগের প্রাধান্য নয়।

সুশীল বা নাগরিক সমাজের একটি পক্ষ ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে যাবার দাবি অনেক দিন ধরে করে আসছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়া কি আদৌ সম্ভব ? বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

তুরিন আফরোজ: ১৯৭২ সালের সংবিধান হলো জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি। ১৯৭২ সংবিধানকে অস্বীকার করার মানেই হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আদিরূপকে অস্বীকার করা। মুখ থেকে মুখোশকে আলাদা করলে যেমন মুখটিকে চেনা দুষ্কর হয়ে পড়ে ঠিক তেমনি ১৯৭২ সালের সংবিধানকে অবহেলা করলে আমরা আমাদের প্রকৃত বাংলাদেশকেই হারিয়ে ফেলব। কিন্তু ইতিহাসের পরম্পরায় আমরা অনেক কিছুই হারিয়েছি। যুগ বদলেছে, বদলেছে সময় আর সেই সঙ্গে বদলেছে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা। বর্তমানে অনেকেই আমাদের ১৯৭২-এর সংবিধানের অবিকৃত অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা বলেন। এই দাবিটিও অনেক দিনের। তবে আজকের বাস্তবতায় ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে আমাদের কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার মানে হলো আমরা ’৭২ সালের সংবিধানে ফিরতে চাই এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি ’৭২-এর সংবিধান পরিপূর্ণ প্রতিস্থাপন সময়ের বাস্তবতায় সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এক্ষেত্রে আমাদের সামনে ’৭২-এর সংবিধানের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস নিতে হবে।

সুপ্রিমেসি অফ কনস্টিটিউশন বা সাংবিধানিক প্রাধান্য রক্ষায় কি কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন ?

তুরিন আফরোজ: আমরা জানি আমাদের সংবিধানের মূল চেতনা হলো, সুপ্রিমেসি অব কনস্টিটিউশন বা সাংবিধানিক প্রাধান্য। সুপ্রিমেসি অব কনস্টিটিউশন বা সাংবিধানিক প্রাধান্য রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করা উচিত তাহলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সহায়তা করা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ যথা সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগকে স্বাধীনভাবে সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে কাজ করতে দেওয়া। মনে রাখতে হবে, কেউ কারো উপরস্থ বা অধীন নয়। তিনটি বিভাগের কোনোটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তিনটি সমান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তাহলো স্বাধীনতা এবং দায়বদ্ধতা এক নয়। প্রত্যেকটি বিভাগকে কোথাও না কোথাও কারো না কারো কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। আসলে সংবিধান অনুযায়ী কেউই দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। সর্বোপরি জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সংবিধান গৃহীত হবার পর থেকে দেশ কখনো সাংবিধানিক সঙ্কটে উপনীত হয়েছিলো কি?

তুরিন আফরোজ: সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর থেকে দেশ অনেকবার সাংবিধানিক সংকটে উপনীত হয়েছে। আমাদের প্রথম সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। এই সংকট আরো ঘনীভূত হয় ১৯৭৫ সাল ৮ নভেম্বর। তৎকালীন বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন এবং জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। যেখানে বিচারপতিরা সংবিধান ও আইনের রক্ষক, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন বলে শপথ গ্রহণ করেন, সেখানে দেশ প্রথম সাংবিধানিক সংকটে উপনীত হয়েছিল একজন বিচারপতি দ্বারা। আমরা এও দেখেছি কীভাবে সামরিক শাসকরা দেশকে সাংবিধানিক সংকটের দিকে ধাবিত করেছেন। দিনের পর দিন দেশে সামরিক শাসন জারি করে রাখা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের নামে জাতির সঙ্গে করা হয় প্রহসন। সর্বশেষ ২০০৭ সালে দেশকে আরো একবার সাংবিধানিক সংকটে উপনীত হতে দেখেছি। যেখানে একটি অনির্বাচিত সরকার দেশের সাংবিধানিক আইনকে উপেক্ষা করে দেড় বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে।

সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে আর আদৌ কোনো সংশোধনীর প্রয়োজন আছে কিনা?

তুরিন আফরোজ: সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হয় সময়ের বাস্তবতা। আর যে কোনো সংশোধনীকেই হতে হয় সংবিধানসম্মত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সামরিক সরকারগুলো সংবিধানকে তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার জোরে সংবিধানের যেসব সংশোধনী করেছে সেগুলোকে পরবর্তীকালে আদালত অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছেন। তাই সংবিধানের আদৌ কোনো সংশোধনীর প্রয়োজন আছে কিনা তা ভবিষ্যতের বাস্তবতাই বলে দেবে। তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সব সংশোধনীকেই হতে হবে সাংবিধানিক উপায়ে সংসদের মাধ্যমে। সংবিধান সংশোধনীর ক্ষমতা জনপ্রতিনিধিদের অর্থাৎ সংসদ সদস্যদেরই; আর কারো নয়।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহজাহান মোল্লা/বাংলানিউজ