ড. কামাল-শাহদিন মালিক স্যারদের অপর্চুনিস্টিক ইন্টারপ্রিটেশন

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর, ২০১৮ ৩:৪২ অপরাহ্ণ

জসিম আলী চৌধুরী:

শুধু নির্বাচনের জন্য সংসদ ভাঙতে পারে না। ড. কামাল আর ড. শাহদিন মালিক স্যাররা অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)(খ) এর যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন সেটি একটি সুবিধাবাদী এবং ১২৩(৩)(ক) সহ সম্পূর্ণ ১২৩ এর চেতনার পরিপন্থী ব্যাখ্যা। ১২৩(৩)এর (ক)-কে বাদ দিয়ে (খ)-কে পড়া যাবে না। (খ)-কে বাদ দিয়ে (ক)-কে পড়া যাবে না। এটি সংবিধানের ‘প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা’ (contextual interpretation) নীতির পরিপন্থী।

মূল সংবিধানের ১২৩ এর পুরো চেতনাটাই হচ্ছে সংসদ ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বহীনভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র একদিনও নয়। ১২৩(৩) পুরো পড়লে দেখা যাবে (খ) অংশে সংসদের মেয়াদপূর্তি ছাড়া অন্য কোন কারণে – যেমন অনাস্থা ভোটে সরকার পতন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনধারী অন্য কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মেয়াদপূর্তির আগে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হলে অথবা কোন জরুরী অবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হলে- সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, শুধু নির্বাচন করার জন্য কৃত্রিম জরুরী অবস্থা কল্পনা করে নিয়ে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া যাবে কি? তাহলে ১২৩(৩)(ক) অনুচ্ছেদ, যেখানে মেয়াদপূর্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের ভেতর নির্বাচনের কথা আছে, সেটি থাকার আদৌ কোন দরকার ছিলো কি?

সংবিধানের একটি অংশ অন্য অংশের স্পষ্ট ও প্রকাশিত লক্ষ্য/উদ্দেশ্য (মেয়াদপূর্তি জনিত কারণে তিন মাস আগে নির্বাচন) ধ্বংস লক্ষ্যে ব্যাখা করা যায় কি? সংবিধানের purposive এবং contextual interpretation রীতির বিপরীতে ড কামাল-শাহদীন মালিক স্যারদের এ ধরনের ব্যাখাকে কেবল opportunistic interpretation বলা যেতে পারে।

উনাদের এই অপর্চুনিস্টিক টেন্ডেন্সি-টা প্রকাশ পেয়েছে এর আগেও। ২০০৬ সাল থেকে আজ অবধি প্রায় এক যুগ ধরে প্রথম আলো, টিআইবি, সুজন ঘরানার এ বুদ্ধিজীবীদের আমরা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের পক্ষে ছাড়া বিপক্ষে দেখিনি। এখন দেখছি হরিষে বিষাদ!

সারা বিশ্বের কোথাও সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচন হয় না বললে উনারা বলছেন, আমাদের দেশে শুরু থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচন সংসদ ভেঙ্গে করা হয়েছে! এটিও আসলে ইতিহাসের একটি opportunistic interpretation. কারণ ১৯৭১ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনের জন্য গণপরিষদ ভাঙতে হয়নি। গণপরিষদ ভাঙতে হয়েছে পরিষদের মূল কাজ (সংবিধান প্রণয়ন) সমাপ্ত হওয়ায়। নতুন সংবিধান অনুসারে গণপরিষদকে সংসদ ভেবে নেয়ার কোন সুযোগ ছিল না। ১৯৭৯ এর দ্বিতীয় থেকে ১৯৯৬ এর সপ্তম সংসদ নির্বাচনের আগে কোন সংসদই রাজনৈতিক আন্দোলন বা পরিস্থিতির মুখে তার মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। ফলে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা না করার প্রশ্নও আসেনি। ২০০১ সালের অষ্টম এবং ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের সময় মেয়াদপূর্তিতে সংসদ ভেঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিধান ছিলো। তাই নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল ছিলো না। অথচ এগুলোকেই ড. কামাল স্যাররা “ইতিহাস” হিসেবে চালাচ্ছেন!

প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমানে মূল সংবিধানের বিধান পুনর্জীবিত থাকা অবস্থায় এ রকম কৃত্রিম তত্ত্বাবধায়ক সরকারময় অবস্থার সৃষ্টি করার “opportunity” কোথায়? বাজারে একটা কথা খুব ভালোভাবে চালু আছে। মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ১/১১ এর সময় আমাদের রক্তে লেখা সংবিধানের “প্রণেতা” বলেছিলেন, সংবিধান একটা কাগজ মাত্র। ছিড়ে নতুন করে লেখা যায়! উনার এবং নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন বেতনভুক্ত আইনজীবী ড. শাহদিন মালিকের তখনকার অবস্থান ছিলো, ১/১১ এর সরকারের মেয়াদ বা নির্বাচন দেয়ার সময়সীমা তিন মাস না – এটি আসলে “সংস্কার” শেষ না হওয়া পর্যন্ত! বুঝুন তবে opportunistic interpretation এর ঠেলা।

লেখক- সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।