কর্তব্যবোধ ও রাজনীতি

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর, ২০১৮ ২:৫০ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট আর. এস. এম. দুর্বার

আর. এস. এম. দুর্বার : 

আমাদের বাড়িটি দিনাজপুর শহরস্থ বালুয়াডাঙ্গায়, কাঞ্চন ব্রীজ পেরিয়ে বিরল-বোচাগঞ্জ সহ বেশ কয়েকটি থানার দিনাজপুর শহরের প্রবেশ পথ। দিনাজপুরে স্কুল এবং কলেজে পড়া কালীন সময়ে দেখেছি গ্রাম থেকে কোন লোক কোন প্রয়োজনে শহরে এলে তারা আমাদের বাসায় আমার বাবার সাথে দেখা করতেন। বাবা সংসদ সদস্য ছিলেন এবং যাকে যে ভাবে পারতেন সহযোগীতা করার চেষ্টা করতেন। এমনটা অনেকবার হয়েছে, দিনাজপুরের কনকনে শীতে মধ্য রাতে গ্রাম থেকে রোগী এসেছে সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য। বাবার আদেশে কনকনে শীতে লেপের ভিতর থেকে বের হয়ে তাদের সংগে গিয়েছি। রোগী ভর্তি করিয়ে পরের দিন আবার যেতাম রোগীর খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য, একটি রোগী দেখতে গিয়ে দুই তিনটি রোগী দেখা হয়ে যেত। এই সুবাদে সেই সময় হাসপাতালের ষ্টাফরা বেশ পরিচিত হয়েছিলেন এবং তারা বেশ সহযোগীতা করতেন। এই কাজটি আমার মনে এক সুখানুভূতির জন্ম দিত, আমি আনন্দ পেতাম।

যদিও এখন আমি কোন রাজনৈতিক দলের সংগে জড়িত নই, পরিচয় একজন একনিষ্ঠ আইনজীবি, কিন্তু যে সময়টার কথা বলছি সে সময় একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র রাজনীতির সংগে জড়িত ছিলাম। কলেজ ক্যাম্পাসে, শহরে মিছিলে শ্লোগান ও বক্তব্য দিতাম। মনে একটি টগবগে উত্তেজনা কাজ করত। পড়ালেখার থেকে এগুলিই বেশী আনন্দ দিত, যেন একটি নেশা।

কলেজে সাধারণ ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা দেখছি, ১০/১২ জন একসঙ্গে চলাফেরা করছি, নিজের মধ্যে একটি নেতা নেতা ভাব, যেন এক নেতৃত্বের উন্মাদনা, এক ভাল লাগা। মানুষ সহজাতভাবেই নেতৃত্ব, খ্যাতি এবং ক্ষমতাকে উপভোগ করেন। সবাই তাকে চিনছে, মানছে, তার কাছে আসছে এটাতে সে আনন্দ পায়, এই সুখানুভূতিই রাজনৈতিক নেশা।

এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম তা মনের প্রেষণা বা নেশা থেকে উদ্ভুত রাজনীতি।

রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী যখন রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের একটি উৎস বা মাধ্যম হিসাবে দেখে, তখন রাজনীতি পেশায় পরিণত হয়। রাজনীতিবিদদের এই অবস্থানটিই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোতে দূর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মত ব্যাধির সৃষ্টি করে। যা রাষ্ট্রের উন্নয়নের ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ।

রাজনীতির আর একটি স্বরূপ যার উৎস জাতীয়, সামাজিক ও মানবিক কর্তব্যবোধ, যা উপমহাদেশে বৃটিশ আমলে বৈপ্লবিক নেতাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হত। একজন ব্যক্তি যদি মানসিক প্রশান্তি, প্রেষণা, রাজনৈতিক নেশা ও পেশা থেকে উর্ধ্বে উঠে, কর্তব্য বোধ থেকে রাজনীতি করে তবে তা হয় জ্ঞানগর্ভ, প্রজ্ঞাময় এবং রাষ্ট্রের ও সমাজের জন্য কল্যাণকর। কর্তব্যবোধের রাজনীতি হতে পারে, রাষ্ট্রের বা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য, হতে পারে বিরাজমান ইতিবাচক অবস্থান যেন কুচক্রি মহলের দ্বারা নিঃশেষ হয়ে না যায় তার জন্য, এমন একটি শাসন ব্যবস্থার জন্য যেখানে জনগন অন্নহীন ও বস্ত্রহীন থাকবে না এবং গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করবে। কর্তব্যবোধের রাজনীতিতে থাকবেনা ক্ষমতার ও পদের জন্য লড়াই এবং হীন স্বার্থপরতা। একজন রাজনীতিবিদের জন্য তার নিজের রাজনীতি তার জন্য একটি দায়িত্ব স্বরূপ। যেহেতু একজন নেতা একটি জনগোষ্ঠির নেতৃত্ব দেন, যেহেতু সেই জনগোষ্ঠির ভাল মন্দের দায়িত্ব তার উপর বর্তায়। নেতার একটি ভুল কাজ বা ভুল সিদ্ধান্ত জনগণের জন্য বিপদ ডেকে আনে।

কর্তব্যবোধের রাজনীতিবিদ কখনও একজন শাসক নন, তিনি একাধারে একজন সেবক ও একজন জ্ঞানী অভিভাবক।

নিজের আত্মতৃপ্তি ও খ্যাতির জন্য যে জন-কল্যাণ করা হয় তার প্রতিদান কোন রাজনীতিবিদই সৃষ্টিকর্তার কাছে থেকে পাবেন না। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, কোন ব্যক্তি যদি শুধুমাত্র নিজের বীরত্ব দেখানো ও খ্যাতির জন্য যুদ্ধে যান এবং শহীদ হন, তিনি শহিদের মর্যাদা পাবেন না। তিনি যদি আল্লাহকে খুশি করার জন্য, ন্যায় কে প্রতিষ্ঠা করার কর্তব্যবোধ থেকে যুদ্ধে শহিদ হন, তবেই তিনি শহীদের মর্যাদা পাবেন। তাহলে দেখতে হবে আমি রাজনীতি করেছি আত্মতৃপ্তির জন্য, নিজের খ্যাতি ও সম্মানিত হওয়ার জন্য, অর্থের জন্য নাকি কর্তব্যবোধের কারণে।

কর্তব্যবোধের রাজনীতিতেই থাকবে প্রকৃত রাজনীতির পরিপূর্ণতা। কর্তব্য বোধের রাজনীতিতে নেতা, পদ ও ক্ষমতা শূন্য থেকেও নিজেকে নিঃস্ব মনে করবেন না। রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থে সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে থাকবে সমন্নয়। জ্ঞানী প্রজ্ঞাবান নেতা তৈরী করবেন চরিত্রবান ও সৎ গুণ সম্পন্ন নতুন নেতৃত্ব, যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

পরিশেষে একটি সংস্থার পোষ্টারের সংগৃহীত একটি লিখা দ্বারা শেষ করছি। একটি পোষ্টারের এক পাশে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্নের মাঝখানে ছিন্নবস্ত্র পরিহিতা একটি বালিকা দারুন শীতে কাঁপছে। অন্য পাশে লেখা আছে, “পথের ধারে দেখলাম একটি ছোট মেয়ে শীতে কাঁপছে। পরনে ছিন্নবস্ত্র, পেটপুরে খাওয়ার নিশ্চয়তাও তার নেই। আমি ক্ষুব্ধচিত্তে সৃষ্টিকর্তাকে শুধালাম, কেন তুমি এটা হতে দিচ্ছো? কেন এদের জন্য কিছু করছ না? তখন তিনি কিছুই বললেন না। সেই রাতে অকস্মাৎ উত্তর এলো, নিশ্চয় আমি এদের জন্য কিছু করেছি। আমি তোমাকেই সৃষ্টি করেছি।”

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী