ছয় বছর বয়সে ঘরহারা হয়েও রূপান্তরকামী আজ বিচারক

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১:৪৯ অপরাহ্ণ
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাশ করে এ বছর নভেম্বরে রাজ্যপালের হাত থেকে স্বর্ণপদক নেওয়ার সময় সুমনা প্রামাণিক

‘অন্যরকম’ পুত্রকে রাখতে চাননি বাবা-মা তাই মাত্র ছয় বছর বয়সে ঠাঁই হয় অনাথ আশ্রমে। কিন্তু থেমে যাননি, সুমন থেকে সুমনা হয়ে গেলেও বদলায়নি লক্ষ্য। মেধা ও মনের জোর দিয়ে লড়ে গেছেন সমাজ ও জীবনের সঙ্গে। অনাথ আশ্রমের আবাসিক থেকে লোক আদালতের বিচারক নির্বাচিত হয়ে ছিনিয়ে এনেছেন সামাজিক স্বীকৃতি। খবর ‘এই সময়’ এর

আজ শনিবার (৮ ডিসেম্বর) শুরু হওয়া জাতীয় লোক আদালতে তাঁকে বিচারকের আসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ। কর্তাদের বক্তব্য, সমাজকে একটা ইতিবাচক বার্তা দিতেই এমন সিদ্ধান্ত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনাথ আশ্রমের আবাসিক থেকে লোক আদালতের বিচারকের পদে বসার লড়াইটা সহজ ছিল না সুমনা প্রামাণিকের। তবে রোখ আর মনের জোরে শেষ পর্যন্ত সামাজিক স্বীকৃতি ছিনিয়ে এনেছেন বছর তেইশের সুমনা।

কৃষ্ণনগরে ভাড়া বাড়িতে একাই থাকেন সুমনা। প্রাইভেট টিউশন করে দিন চলে তাঁর। ছোট্ট সুমন ঠিক অন্য ছেলেদের মতো ছিল না। পুতুল খেলা, গামছা জড়িয়ে লম্বা চুল তৈরি থেকে শুরু করে তার হাবভাব পুরোপুরি মেয়েদের মতো। ‘অন্যরকম’ পুত্রকে রাখতে চাননি বাবা-মা। ছ’বছরে ঠাঁই করিমপুর অনাথ আশ্রমে। সেখানেও অন্য ছেলেরা নানা ভাবে উত্ত্যক্ত করত তাকে। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে অনাথ আশ্রমে পড়াশোনা করে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। মাধ্যমিক পড়ার সময়েই সুমন বুঝতে পারে, সে আসলে নারী। পরে গণিতে অনার্স নিয়ে বগুলা শ্রীকৃষ্ণ কলেজের স্নাতক। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাশ করে এ বছর নভেম্বরে রাজ্যপালের হাত থেকে নেন স্বর্ণপদক। তার পরেও অবশ্য লড়াই থামেনি। প্রাইভেট টিউশন করেই অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ২০১৫-য় লিঙ্গ বদলে পুরুষ থেকে নারী, সুমন থেকে সুমনা হয়ে ওঠেন।

তাঁর কথায়, ‘ভাড়া খুঁজতে গিয়ে ঘর পাই না। রাস্তায়, গলির মোড়ে আমায় দেখে টিটকিরি দেয় মানুষ। জীবন সহজ নয়। এর মধ্যে আমাকে বিচারক নির্বাচিত করা হবে, তা ভাবতে পারিনি। তবে লড়াই করে একটা জায়গা পেলে তো ভালো লাগে। লড়াই থেকে কখনও সরে যাইনি।’

গত বছর ইসলামপুর মহকুমা লোক আদালতে বিচারকের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল রূপান্তরকামী জয়িতা মণ্ডলকে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক বিপ্লব রায় বলেন, ‘বৈষম্য দূর করতেই কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

জেলা বিচারক রাই চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘রূপান্তরকামীরা যে সমাজেরই একজন, সেটা সকলের বোঝা দরকার।’

আর সুমনা বলছেন, ‘রূপান্তরকামীদের জন্য কিছু করে যেতে চাই। সেটাই এখন লক্ষ্য।’