দেশে সাইবার অপরাধের শিকার ৭০ ভাগই আইনের সহায়তা নেন না

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৫ মার্চ, ২০১৯ ১২:০৮ অপরাহ্ণ
সাইবার অপরাধ

দেশে সাইবার অপরাধ বাড়ছে। প্রতি ২০ সেকেন্ডে একটি করে সাইবার অপরাধ ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ইউটিউব, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এসব অপরাধ হচ্ছে। এর শিকার ৫৩ ভাগই নারী। এছাড়া ১৯-৩৫ বছর বয়সের লোকজনই সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। স্বচ্ছ ধারণার অভাব, লোকলজ্জা আর ভয়-ভীতির কারণে সাইবার অপরাধের শিকার ৭০ ভাগ ব্যক্তিই আইনের সহায়তা নেন না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিশন, বিভাগ ও ইউনিট। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ব্যক্তি এই অপরাধের বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় সে বিষয়েই জানেন না। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না মনে করে অভিযোগ করেন না ২৫ শতাংশ ব্যক্তি।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্ক ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) এবং পুলিশের পাঁচটি ইউনিটে সাইবার অপরাধ নিয়ে প্রতিদিন শত শত অভিযোগ জমা পড়ছে। আর এ সংক্রান্ত মামলার তদন্তে ত্রুটি থাকায় মোট মামলার অধিকাংশই খারিজ হয়ে যাচ্ছে।

বিটিআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ছাড়িয়েছে গত বছরই। এর মধ্যে ৭০ ভাগই ঝুঁকিতে আছেন। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২০ ভাগ কোনও না কোনোভাবে সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। আর মাত্র ১০ ভাগ ব্যবহারকারী সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন।

দেশে বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। আর সাইবার অপরাধের ৭৫ ভাগ অভিযোগই ফেসবুক কেন্দ্রীক। ইন্টারনেটের মাধ্যমে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হওয়া ৪৯ শতাংশই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী।

শুধু ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছেই সাইবার অপরাধ নিয়ে বছরে অভিযোগ জমা পড়ে ২০ হাজারও বেশি। এর মধ্যে মহানগর পুলিশের ‘হ্যালো সিটি’ অ্যাপসের মাধ্যমেই অভিযোগ জমা পড়ে ৬ হাজারেও বেশি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্কেও বছরে ১০ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে অভিযোগকারীদের প্রায় সবাই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা না করেই প্রতিকার চান। সাইবার অপরাধের ঘটনায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়েছে এক হাজার ৫৭০ জন।

ঘটনা-১
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাশা (ছদ্মনাম)। স্কুল, ক্লাস পরীক্ষা, আড্ডা, ঘুরে বেড়ানো-এসব নিয়েই ছিল তার ব্যস্ততা। গত বছরের ডিসেম্বরে হঠাৎ আসা এক ফোন কলে ছন্দপতন হয় তার জীবনে। গোপন ছবি ফেসবুকে প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তখন সে বুঝে উঠতে পারে না কোনও গোপন ছবি, আর তা কে কীভাবে পেয়েছে। দিশেহারা হয়ে পড়ে সে। ফোন আসা বাড়তে থাকে। ম্যাসেঞ্জারে পাঠানো হয় ছবি। ছবিটি মিথ্যা নয়। ছবিটা আসলে রাশা তার বয়ফ্রেন্ডকে পাঠিয়েছিল।

রাশা মনে করে, তার ফেসবুক হ্যাক হয়েছে। আর সেখান থেকেই ছবিটি সংগ্রহ করেছে কেউ। ছবি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা চলতে থাকে। এমন বিপদের মধ্যেও বাবা-মা বা পরিবারের কোনও সদস্যকে ঘটনা জানাতে পারে না রাশা। বন্ধুদের বলতেও লজ্জা পায় এবং থানা-পুলিশের কাছে যেতেও ভয় পোয় সে।

টাকা দেওয়ার চাপ বাড়তে থাকার এক পর্যায়ে রাশা তার এক বন্ধুর খালার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তার পরামর্শে ধানমন্ডি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। অতঃপর যোগাযোগ হয় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল (সিসিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে। জিডি’র কপি নিয়ে হাজির হয় মিন্টো রোডে সিসিটিসি’র কার্যালয়ে। সেখানে ঘটনা শোনা এবং লিখেও নেওয়া হয়। তাকে বলা হয় আবার ফোন এলেই প্রতারককে ধরতে বের হবে সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের টিম। ফোন আসার পর রাশা টাকা পৌঁছে দেওয়ার স্থান ও সময় জানতে চায়। এরপর চলে অভিযান। টাকা দাবি করা ব্যক্তি আটক হয়।

এবার রাশার অবাক হওয়ার পালা। সে জানতে পারে তার ফেসবুক হ্যাক হয়নি। ঘটনার মূলে আছে তারই বন্ধু, যাকে সে ছবি পাঠিয়েছিল। অনলাইনে ছবি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা আদায় করতে চেয়েছিল বন্ধুটি। অথচ বিত্তশালী পরিবারের সন্তান রাশার এই বন্ধু।

রাশার এই ঘটনা মামলা পর্যন্ত যেতে পারতো। কিন্তু মামলায় অনীহা তার। শেষ পর্যন্ত রাশার বন্ধুর লিখিত বক্তব্য রেখেই সমস্যার ইতি টানতে হয় সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগকে।

ঘটনা-২
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলা মাত্র চারটা ছবি যে কতটা দুর্ভোগের কারণ হতে পারে তা জানা ছিল না নাজমার (ছদ্মনাম)। গত বছরের জুলাইয়ে কামালের (ছদ্মনাম) সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই প্রতারণার শিকার হতে থাকে নাজমা। ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমোতে ছবিগুলো পাঠায় কামাল। পরে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে। ৭০ হাজার টাকা হাতিয়েও সে। আরও নানাভাবে প্রতারণা চলে। এক পর্যায়ে নাজমা বুঝতে পারে কামালের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে পুলিশের শরণাপন্ন হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধুর সহায়তায় গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই কর্মকর্তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পুরো ঘটনা শোনার পর নাজমাকে সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করতে বলা হয়।

এরপর পুলিশের অভিযানে কামাল আটক হয়। তার পরিবারের সদস্যদের মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে ডেকে আনা হয়। যে ছবিগুলোকে প্রতারণার হাতিয়ার বানানো হয়েছিল সেগুলো উদ্ধার হয়। নাজমার কাছ থেকে প্রতারণা করে নেওয়া টাকাও ফিরিয়ে দেয় কামালের পরিবার। সন্তানের কৃতকর্মের জন্য নাজমা ও পুলিশের কাছে ক্ষমাও চায় কামালের বাবা-মা ও ভাইবোন। কিন্তু পুলিশ মামলার প্রস্তুতি নিতে বললে বেঁকে বসে নাজমা। বলে, প্রতিশ্রুতি যখন মিলেছে আর ভবিষ্যতে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি হবে না-এই মর্মে যখন লিখিত বক্তব্য দিয়েছে কামাল তখন আর মামলায় যাওয়ার ইচ্ছে নেই তার। জানাজানি হলে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আশঙ্কার কথা বলেন নাজমা।

রাশা ও নাজমার মতো অসংখ্য নারী প্রতিদিন সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের বেশিরভাগই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি হতে চান না। আবার জিডি করলেও মামলা করতে চান না তারা। সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা ইউনিট, বিভাগ ও কমিশন বলছে, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার পর যারাই সহায়তা চেয়েছে তারাই নিরাপদ হতে পেরেছে।

সিটিটিসির’র সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আলিমুজ্জামান বলেন, ‘প্রযুক্তি নির্ভর এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হলে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। সাইবার অপরাধের আলামত সংরক্ষণের ঘটনার শিকার ব্যক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।’ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্তরা জিডি বা মামলা না করেই প্রতিকার চান বলে জানান তিনি।