বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে রোহিঙ্গা, অনুসন্ধানে দুদক

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৯ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
দুদক’ লোগো

পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গাদের বিদেশ যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাদের নানা অনৈতিক কাজের কারণে প্রবাসে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এবার বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

পাসপোর্ট করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সনদ প্রয়োজন। পাসপোর্টের আবেদন করার পর পুলিশ সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর ঠিকানা ও তথ্য যাচাই–বাছাই করে। রোহিঙ্গারা কীভাবে এসব গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংগ্রহ করছে, পুলিশি যাচাই–বাছাইয়ের পরও পাসপোর্ট পাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কারা কারা জড়িত, সেটা খতিয়ে দেখবে দুদক।

সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী ১৩ জন রোহিঙ্গা ফেরত আসার পর বিষয়টি দুদকের নজরে আসে। এ বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে উপপরিচালক সৈয়দ আহমদকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।

গত ৭ জানুয়ারি সৌদি সরকার সে দেশ থেকে ১৩ জন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। ওই ১৩ ব্যক্তি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, তারা মিয়ানমারের নাগরিক। বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিল।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপর একটি দায়িত্বশীল সূত্র গণমাধ্যমে বলেছে, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী ওই রোহিঙ্গা নাগরিকেরা শুধু কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম নয়, দেশের উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি জেলার স্থায়ী বাসিন্দা পরিচয়েও পাসপোর্ট করেছে। পাসপোর্ট করতে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রয়োজন এবং অনুমোদনের আগে পুলিশ পাসপোর্ট পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে থাকে। কাদের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেলেন, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে আরও যাঁরা জড়িত তাঁদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী ১৩ জন রোহিঙ্গা ফেরত আসার খবর পেয়ে দুদক অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নেয়। দুদক সূত্র বলছে, অনুসন্ধানে নেমে এরই মধ‌্যে পাসপোর্ট অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছে দুদক। এসব চিঠিতে ফেরত আসা ১৩ রোহিঙ্গার নাম উল্লেখ করে তথ্য চাওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ১৩ রোহিঙ্গার জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত যাবতীয় নথি চাওয়া হয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরে দেওয়া চিঠিতে যাবতীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। ওই সব নথিপত্র পর্যালোচনা করে বোঝা যাবে, কারা তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। পাসপোর্ট থেকে পাওয়া নথি পর্যালোচনা করে তাদের শনাক্তকারী ব্যক্তি, যাচাই–বাছাই করা পুলিশ কর্মকর্তার তথ্য পাওয়া যাবে।

দুদকের সূত্রটি বলছে, ১৩ রোহিঙ্গার তথ্য পাওয়ার পর যাঁরা এ কাজে জড়িত, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে। পরে পাসপোর্ট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনতে অনুসন্ধানের পরিধি আরও বাড়ানো হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিনই পাসপোর্ট করতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের ধরা পড়ার খবর গণমাধ্যমে আসছে। কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদেশ যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্যও আসছে।

গত ৩১ মার্চ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার পথে তিন রোহিঙ্গা নারীসহ চারজনকে আটক করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। ৩ এপ্রিল কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে স্থানীয় এক নারীর সহায়তায় পাসপোর্ট করার সময় আটক করা হয় চার রোহিঙ্গা নারীকে। ৫ এপ্রিল সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে গেলে আটক করা হয় দুই রোহিঙ্গাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। যেসব ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা ধরা পড়ছে, সেগুলো সামনে আসছে। এ ধরনের ঘটনা আরও বেশি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা।

গত বছরের মাঝামাঝি সময় সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বিদেশে চলে গেছে। সেখানে রোহিঙ্গারা নানা ধরনের অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের কাজের পরিবেশ নষ্ট করছে।

ওই বছরই মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, বিশেষ ক্ষেত্রে ঠিকানা যাচাই ছাড়াই পাসপোর্ট দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, রোহিঙ্গারা সে সুযোগ নিচ্ছে। অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় আসা বেশির ভাগই বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারের ঠিকানা ব্যবহার করছে। তারা নিজেদের কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, রামু, মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা বলে দাবি করছে।

পুলিশ ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করিয়ে দিতে দেশব্যাপী একটি চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রে পাসপোর্ট অফিসের কিছু কর্মচারী-কর্মকর্তা, দালাল ও পুলিশের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁরা জনপ্রতি ৩০-৩৫ হাজার টাকা নিয়ে রোহিঙ্গাদের হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ধরিয়ে দিচ্ছেন।

দুদক বলছে, প্রাথমিকভাবে ১৩ জন রোহিঙ্গার বিষয়ে তারা অনুসন্ধান করবে। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বড় পরিসরে অনুসন্ধানে নামতে পারে তারা।