সকল অপরাধের অভিযোগ কি নালিশযোগ্য?

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০১৯ ২:০৫ অপরাহ্ণ

রাজীব কুমার দেব:

আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় আইনি কাঠামো বিবেচনায় একটি মামলার ফাউন্ডেশন তার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়। কার্যবিধির বিধান মতে যে কোন অপরাধের অভিযোগ অভিযোগকারীর নালিশ বা সংবাদদাতার এজাহারের ভিত্তিতে ফৌজদারি রেকর্ডে আসে। কিন্তু অভিযোগকারী সকল অভিযোগ কি নালিশমূলে আনতে পারেন?

কার্যবিধির ১৯৫ ও ৪৭৬ ধারার শর্তমতে আদালত নিজেই অভিযোগকারী হওয়ার বিধান ব্যতীত অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা কে হবেন সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে হবে যেকোন ব্যক্তি অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা হতে পারেন। অপরদিকে কার্যবিধিই নির্ধারণ করে দিয়েছে কোন অপরাধের অভিযোগ এজাহার এবং নালিশী দরখাস্তের মাধ্যমে শুরু হবে। তবে বিশেষ কোন আইন বা এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত স্যুমোটো যদি অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা বা লিগ্যাল ফোরাম নির্দিষ্ট করে দেন তাহলে কার্যবিধির বিধান প্রযোজ্য হবেনা।

কিন্তু আমাদের দেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় এমন কিছু অপরাধের অস্তিত্ব পাওয়া যায় যেগুলোতে অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলেও অপরাধের গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা কে হবেন এবং মামলাটি নালিশী নাকি এজাহার হবে তা অনুমান করে নিতে হয়। তবে এই অনুমান নির্ভর করবে কোন বিধিবদ্ধ বিধানের উপর নয় বরং সংশ্লিষ্ট আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং অপরাধের গতি-প্রকৃতি, প্রকৃত সত্যতা বের করে আনার কৌশল এবং অপরাধের বিচারে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের উপর।

উল্লেখ্য, সাংবিধানিক কৌশলের বিষয় ও বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে উক্তরুপ বিষয় নিষ্পত্তি করতে হবে৷উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৮৬০ সালের দন্ডবিধির ৩৩২, ৩৩৩, ৩৫৩, ৩৯৯, ৪০২ ধারার অপরাধসমূহ, ১৯৪৬ সালের বিদেশী নাগরিক সম্পর্কিত আইনের অপরাধসমূহ, ২০০২ সালের দ্রুত বিচার আইনের অপরাধসমূহ, ২০১২ সালের সন্ত্রাস বিরোধী আইনের অপরাধ সমূহ, ২০১২ সালের মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের অপরাধসমূহ, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অপরাধসমূহ, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অপরাধসমূহ ইত্যাদি।

এধরণের অপরাধসমূহের প্রকৃতি ও গতি এমন যা যথাযথ আইনি ভাষায় ও তথ্য প্রদান পূর্বক মামলার ফাউন্ডেশন অর্থাৎ এজাহার প্রস্তুতির দাবি রাখে। আবার উক্ত এজাহার প্রস্তুতি এমন একজন ব্যক্তির উপর নির্ভর করে যিনি উক্ত শ্রেণীর অপরাধসমূহের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন এবং যিনি উক্ত অপরাধ দমনকারী বা নিয়ন্ত্রণকারি কর্তৃপক্ষের সদস্য। উক্ত অপরাধের গতি-প্রকৃতি এমন যা তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্যতা উদঘাটনের দাবি রাখে। আর এসকল অপরাধে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার এবং জব্দতালিকা প্রস্তুতকরণ, প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত করা, অভিযুক্ত গ্রেফতার, তথ্য সংগ্রহ,আইনি কৌশল অবলম্বনে সাক্ষী সনাক্ত ও তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা ইত্যাদির জন্য তদন্ত ছাড়া অপরাধের প্রকৃত রহস্য বের করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে উক্ত অপরাধের বিচারিক পর্যায়ে সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করণ, যথাযথ প্রক্রিয়ায় উদ্ধারকৃত ও সংরক্ষিত আলামত উপস্থাপন, পিসিপিআর সম্বলিত অভিযুক্তের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পূর্ব রেকর্ড উপস্থাপন, আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন দাবি রাখে। এমতাবস্থায় বর্ণিত কারণে উক্ত শ্রেণীর অপরাধসমূহের সংবাদদাতা হতে হবে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য বা সরকারী কর্মচারী এবং এজাহার দায়েরের মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম শুরু হতে হবে। তবে দন্ডবিধির আরো কিছু অপরাধ আছে যেগুলোতে যে কেউ সংবাদদাতা হতে পারলেও এসব মামলা এজাহার দায়েরের মাধ্যমে শুরু হতে হবে। যেমন – ৩০২, ৩৯৫, ৩৯৬ ধারার অপরাধসমূহ।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে– উক্ত অপরাধে সাধারণ মানুষ অভিযোগকারী বা সংবাদদাতা হলে এবং উক্ত মামলা নালিশী দরখাস্ত আকারে দায়ের করলে কি এমন সমস্যা হবে? এক্ষেত্রে আইনের ব্ল্যাক লেটারস (Black letters) অনুসরণ না করে বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে পাঁচটি বিষয় উঠে আসবে। যেমন-

  • প্রথমত: এজাহারকারী একজন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য বা সরকারী কর্মচারী হিসেবে অপরাধ প্রমাণে যতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবেন তদবিপরীতে বৈরি সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একজন সাধারণ মানুষের দ্বারা উক্ত অপরাধ প্রমাণিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে;
  • দ্বিতীয়ত: সংঘটিত অপরাধে একজন সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিতি যেকোন পর্যায়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে যা মামলা প্রমাণে বাধাগ্রস্ত হবে;
  • তৃতীয়ত: এই ধরণের অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তের পূর্ব রেকর্ড থাকতে পারে যার তথ্য একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়;
  • চতুর্থত: এইধরণের অপরাধে সংঘটিত ঘটনার সময় বিধি মোতাবেক আলামত তল্লাশী, অভিযুক্তের দেহ তল্লাশী, জব্দতালিকা প্রস্তুতকরণ ইত্যাদি করার ক্ষমতা সাধারণের না থাকায় ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণে বাধা হয়ে দাঁড়াবে;
  • পঞ্চমত: এই ধরণের অপরাধে সাক্ষীদের গ্রহণযোগ্যতা বা জব্দকৃত আলামত নিয়ে যেকোন সময় প্রশ্ন আসবে যা মামলার মেরিটকে আঘাত করবে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে কোন সাধারণ নাগরিক উক্ত অপরাধসমূহের নালিশি দরখাস্ত যদি আনয়ন করেই ফেলেন তাহলে আমলী আদালত কি করবেন। কেননা কোন নালিশ আনয়ন করলেই কার্যবিধির বিধান মতে আমলী আদালতকে তো একটি সিদ্ধান্ত দিতেই হবে – হয়তো তদন্ত অথবা আমল গ্রহণ অথবা খারিজ অথবা এফআইআর রেকর্ড করার নির্দেশ। তবে কার্যবিধিতে নির্ধারিত কোন পথই অবলম্বন না করে নালিশী দরখাস্ত বিষয়ে “তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ” এর জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। উক্তক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেলে একজন পুলিশ সদস্যএজাহারকারী হিসেবে প্রেরিত রেকর্ড ও প্রাথমিক তদন্তের আলোকে এজাহার প্রস্তুতপূর্বক এফআইআর রেকর্ড করতে পারেন।

উল্লেখ্য “তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ” এর আদেশ আমলী আদালতের একটি প্রশাসনিক আদেশ। কার্যবিধিতে এর অস্তিত্ব না থাকায় অনেকের মত আমারও এই আদেশের লিগ্যাল এনটিটি (Legal Entity) নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কিন্তু বাস্তবে ফৌজদারি অনুশীলনে দেখা যায় আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট আইনে বর্ণিত গতিপথ যদি পর্যাপ্ত না হয় অর্থাৎ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট আইনে বর্ণিত পথ যদি কোন আইনি পথের ব্যবস্থা করতে না পারে তদজন্য কোন ব্যবস্থা প্রতিকারবিহীন অবস্থায় থাকতে পারবে না আর সে কারণেই আইনের গতিপথ নির্ধারণের জন্য আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় এমন একটি ব্যবস্থা নিতে হবে যা সংশ্লিষ্ট আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তদবিবেচনায় “তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণ” “Exercise of Strategical Criminal Administration of Justice”এর প্রত্যেক্ষ ফসল যা সংশ্লিষ্ট আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করে।

আবার সাধারণ আইনে বিদেশিরা এজাহার বা নালিশী দরখাস্ত আনয়নে আইনগত বাধা নেই কিন্তু যে বিদেশির মামলা আনয়নে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত হয়ে পড়ে তখন কৌশলগতভাবে (strategically) তাকে মামলা আনয়নে বারিত করে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করা অধিক নিরাপদ হতে পারে।
পরিশেষে শতাধিক বর্ষের পুরাতন পদ্ধতিগত আইন দিয়ে ডিজিটালাইজড অপরাধকে বিচাররের সম্মুখীন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও জটিল। তবে আইনের কৌশলগত প্রয়োগ কিছুটা হলেও ব্যপ্তয় না ঘটিয়ে ফলপ্রসূ প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারে।

লেখক: জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চকরিয়া চৌকি আদালত, কক্সবাজার।