সিরাজ প্রামাণিক
সিরাজ প্রামাণিক

করোনায় ত্রান চোর রুখতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের অভিনব উদ্যোগ বনাম বাস্তবতা!

সিরাজ প্রামাণিক:

মানব জাতির চরম দুঃসময় চলছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানবতার অবক্ষয়। করেনায় ত্রানের মালামাল চুরির হিড়িক পড়েছে। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠছে। মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বিচারব্যবস্থা। করোনার ভয়াল থাবায় সেটাও বন্ধ রয়েছে। কিন্তু বন্ধ নেই বিচার বিভাগের চোখ আর হৃদয়। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর, বাস্তবতা আর পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘরে বসেই কাজ করছেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ। এরই মধ্যে রয়েছে কিছু চমৎপ্রদ খবর।

দীর্ঘ চার বছর ধরে ভুয়া নামে দরিদ্রদের চাল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গোস্বামী দুর্গাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দবির উদ্দিন বিশ্বাস। এ সংবাদ পত্রিকায় চাওর হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ১৯ এপ্রিল) দুপুরে কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সেলিনা খাতুন এ নির্দেশ দেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ (১) সি ধারা মোতাবেক এ নির্দেশ দেন বিচারক। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে আগামী ২ জুনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১৩ এপ্রিল ত্রাণ নেয়ার সময় ছবি না তোলায় দুস্থদের মারধর করেন দৌলতপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন বিশ্বাস। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একই ধারার বলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এমএম মোর্শেদ। একই সঙ্গে চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন বিশ্বাসের ঘটনাটি তদন্ত করে আগামী ৩১ মে’র মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এদিকে চট্রগ্রামের‘সাতকানিয়ায় শিশুকে বলাৎকার, আপস করতে বলল পুলিশ!’ শিরোনামে একুশে পত্রিকায় খবর পড়ে সাতকানিয়ার থানার ওসিকে শিশু বলাৎকারে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম)।

নাটোরের একজন কৃষক শহিদুল ইসলাম ৩৩৩-এ ফোন করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ লালপুর উপজেলার অর্জুনপুর-বরমহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার গত রোববার (১২ এপ্রিল) ডেকে আনেন কৃষককে। এরপর ৩৩৩ নম্বরে ফোন করায় এলাকার সম্মান গেছে জানিয়ে কৃষক শহিদুলকে ব্যাপক মারধর করেন চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার। মারধরে রক্তাক্ত হয়ে পড়েন কৃষক। বিষয়টি ফেসবুকে জানতে পারেন নাটোরের একজন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি বিষয়টি নাটোরের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে (সিজেএম) অবহিত করেন। সিজেএমের নির্দেশনা মোতাবেক আদালতে গিয়ে লালপুর থানার ওসিকে ফোনে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নির্দেশনা দেন, চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী কৃষকের মামলা নিতে।

এবার রয়েছে বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক একটি গোপন এবং সফল অভিযানের গল্প। পটুয়াখালীতে এ চরম দুঃসময়ে পায়রা নামক একটা বড় নদী পাড় হতে ১০ টাকার স্থলে নেয়া হচ্ছিল ৫০ টাকা। আর রাত যত গভীর হয় সেই ভাড়া বেড়ে দাড়ায় ১০০/২০০/৩০০ টাকা পর্যন্ত। এইরকম জোড়পূর্বক ভাড়া আদায়ে যদি কোন যাত্রী প্রতিবাদ করে তাকে রীতিরকম লাঞ্চনার শিকার হতে হয়। সরেজমিন এখানকার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনার সত্যতা পেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থায় এ অঞ্চলের মানুষ স্বস্তি পেয়েছে।

পাঠক এ গল্পটি দিয়েই আমার লেখা শেষ করতে চাই। খলিফা হারুন-অর রশিদের আমল। একজন বৃদ্ধা মহিলাকে আসামী হিসেবে নতুন বিচারকের দরবারে হাজির করলেন। তার অপরাধ ছিল তিনি শহরের এক রেস্তারাঁ থেকে কিছু রুটি আর মধু চুরি করেছে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে আসামী জানালেন এক সপ্তাহ যাবত এতিম দু’নাতি সহ তিনি অনাহারে ছিলেন। নাতিদের ক্ষুধারত চেহারা ও কান্না সহ্য করতে না পেরে এ চুরির ঘটনা ঘটেছে। বিচারক এবার পুরো দরবারে চোখ বুলালেন। বললেন কাল যেন নগর, খাদ্য, শরিয়া, পুলিশ প্রধান ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গের উপস্থিতিতে এ রায় দেয়া হবে। পরদিন সকালে সবাই হাজির হলেন। বিচারক ও যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে রায় ঘোষণা করলেন-“বৃদ্ধা মহিলার চুরির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৫০টি চাবুক, ৫০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা আর অনাদায়ে এক বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হলো। তবে অকপটে সত্য বলার কারণে হাত কাটা মাফ করা হলো।

এবার বিচারক প্রহরীকে চাবুক আনার নির্দেশ দিয়ে নিচে নেমে ঐ বৃদ্ধা মহিলার পাশে এসে দাঁড়ালেন । বিচারক বললেন যে নগরে একজন ক্ষুধার্ত বৃদ্ধ মহিলা না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করতে বাধ্য হয় সেখানে তো সবচেয়ে বড় অপরাধী সে দেশের খলিফা। আর আমি এসেছি খলিফার প্রতিনিধি হয়ে। আমি যেহেতু তাঁর অধীনে চাকরি করি তাই ৫০টি চাবুকের ২০টি আমার হাতে মারা হউক আর এটাই হলো বিচারকের আদেশ। আদেশ যেন পালন করা হয় এবং বিচারক হিসাবে আমার উপর চাবুক মারতে যেন কোনো রকম করুণা বা দয়া দেখানো না হয়।

বিচারক হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুই হাতে পর পর ২০টি চাবুক মারা হলো। চাবুকের আঘাতের ফলে হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পরছে। এরপর বিচারক বললেন “যে শহরে নগর প্রধান, খাদ্য গুদাম প্রধান ও অন্যান্য সমাজ হিতৈষীরা একজন অভাবগ্রস্থ মহিলার ভরন-পোষণ করতে পারেন না। সেই নগরে তারাও অপরাধী। তাই বাকি ৩০টি চাবুক সমান ভাবে তাদেরকে মারা হোক।”

এরপর বিচারক নিজ পকেট থেকে বের করা রুমালের উপর ৫০টি রৌপ্য মুদ্রা রাখলেন। তারপর বিচারপতি উপস্থিত সবাইকে বললেন “যে সমাজ একজন বৃদ্ধমহিলাকে চোর বানায়, যে সমাজে এতিম শিশুরা উপবাস থাকে সে সমাজের সবাই অপরাধী। তাই উপস্থিত সবাইকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা করা হলো।”

এবার মোট ৫০০ দিনার রৌপ্য মুদ্রাথেকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানাবাবদ রেখে বাকি ৪০০টি রৌপ্য মুদ্রা থেকে ২০টি চুরি যাওয়া দোকানের মালিককে দেওয়া হলো। বাকি ৩৮০টি রৌপ্য মুদ্রা বৃদ্ধা মহিলাকে দিয়ে বললেন “এগুলো আপনার ভরণপোষণের জন্য। আর আগামী মাসে আপনি খলিফা হারুন-অর রশিদের দরবারে আসবেন। খলিফা আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।

এবার খলিফার দরবারে হাজির ওই বৃদ্ধা। বিচারক চেয়াার থেকে নেমে এসে বললেন আপনাকে ও আপনার এতিম দু’নাতিকে উপোস রাখার জন্য সেদিন বিচারক হিসেবে ক্ষমা চেয়েছিলাম । আজ দরবারে ডেকে এনেছি প্রজা অধিকার সমুন্নত করতে না পারা অধম এই খলীফাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য। আপনি দয়া করে আমাকে ক্ষমা করুন।

পাঠক নিশ্চয়ই আপনারা সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর নাম শুনেছেন। যিনি দিল্লিতে বসে ভারতীয় উপমহাদেশে খিলজি শাসন পরিচালনা করেছেন। এজলাস ত্যাগের আগে সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজী কাজীকে বলেছিলেন, “আজ আপনি যদি আমার প্রতি কোনো প্রকার দুর্বলতা দেখাতেন তবে এই চাবুক নিয়েই এসেছিলাম যে, এটা দিয়েই আপনাকে শাস্তি দিতাম।” আর অপরদিকে, কাজীও তাঁর এজলাসে গোপনে রক্ষিত চাবুক দেখিয়ে সুলতানকে বলেছিলেন, “আপনি যদি আজ এজলাসে না এসে কোনো তালবাহানার আশ্রয় নিতেন তবে আমিই সরাসরি রাজদরবারে গিয়েই আপনাকে এ চাবুক দিয়ে আঘাত করতামই।”

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইন বিশ্লেষক, আইন গ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’।
Email:seraj.pramanik@gmail.com