একজন ঢাকার মেয়র আর আমাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০২০ ১২:৩৭ অপরাহ্ণ
ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা

ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা:

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (দক্ষিণ) মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন আমাদের আইনজীবীদের গর্ব ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস স্যার। অনেক অনেক অভিনন্দন।

পত্র পত্রিকার সূত্রে জেনেছি তিনিই নাকি প্রথম আইনজীবী যিনি দক্ষিণ ঢাকার মেয়র হলেন। ব্যাপারটা অনেক গর্বের, আইনজীবী হিসেবে অনেক আত্মতৃপ্তির। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি অনেক প্রানবন্ত ও কৌশলী; নেতা হিসেবে দৃঢ় ও জনবান্ধব; এবং ব্যাক্তি হিসেবে তিনি সুদর্শন, সুপরামর্শ দাতা, সজ্জন ব্যক্তিত্ব। উপরের শব্দ চয়ন নিয়ে কারো মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, অতিরঞ্জিত নাতো? আমি বলবো একদমই না।

আমার ছোট্ট পেশাগত জীবনে ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যারকে আইনজীবী, নেতা, ব্যক্তি- এই তিনভাবেই জানার সুযোগ পেয়েছি যা সম্পর্কে এখানে লিখবো। আর সবশেষে একজন মেয়র হিসেবে আমরা কেমন ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যারকে দেখতে চাই সেই প্রসঙ্গে দুই চারটি কথা বলে আমার লেখা শেষ করে দিবো।

প্রথমে আসি আইনজীবী হিসেবে উনাকে দেখা এবং জানার ব্যাপারটা। আমাদের চেম্বারের এক মামলায় ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যার ছিলেন আমাদের বিরোধী পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী। মামলার বিষয়বস্তুর কথা পাবলিকলি বলা যায় না, কিন্তু এতটুকু বলা যায় যে ব্যাপারটি একটি পেট্রোল/সিএনজি/এলপিজি গ্যাস স্টেশন বসানো সম্পর্কিত। সেখানে আমার এখনও মনে আছে উনি আসলেন এবং ওনার বক্তব্য পেশ করলেন মাত্র ৫ মিনিটের মত! এর মাঝে এত সাবলীলভাবে পুরো মামলাটির সারাংশ বললেন সেটা অনেক ফলো করার মত আমাদের জুনিয়র আইনজীবীদের জন্যে। আর শেষে আইনের এমন একটা প্যাচ দিলেন যে শেষমেষ আমরা হেরে গিয়েছিলাম ওই মামলায় ওনার ওই একটা চমৎকার আইনের ব্যাখার কারণে। সেই জন্যই আমি উপরে লিখেছি আইনজীবী হিসেবে উনি প্রানবন্ত এবং কৌশলী। একজন নবীন আইনজীবির কাছে উনার কোর্ট রুম পারফরম্যান্স অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক।

এরপর আসি নেতা হিসেবে আমার দেখা একজন দৃঢ় ও জনবান্ধব ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। ব্যারিস্টার তাপস বর্তমানে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি আইনজীবী মহলে অনেকটা অভিভাবকের মত দায়িত্ত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের অনেক অনুষ্ঠান হয় সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির অডিটোরিয়ামে। সেখানে উপস্থিত থেকে উনার বক্তব্য দূর থেকে শুনেছি। উনার বক্তব্যে আইনজীবীদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার, দায়িত্ত্ব, কর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে উনাকে শুনেছি স্পষ্ট ভাষায় এবং দৃঢ়ভাবে বলতে। গত বার সুপ্রীম কোর্টের নির্বাচনে প্রায় সারা রাত উনাকে উপস্থিত থাকতে দেখেছি তার নেতা কর্মীদের অনুপ্রাণিত করার জন্য। এরপর কোর্টে ওনার চেম্বারে প্রায় সারাক্ষণ ভিড় লেগে থাকে সাধারণ আইনজীবী এবং মক্কেলের। সুপ্রীম কোর্টের এনেক্স বার ভবনের ৩০২২ নম্বরে বসেন ব্যারিস্টার তাপস। আমি মাঝে কিছুদিন উনার পাশের রুম ৩০২০ সে বসতাম। সে সূত্রে আমি একটি কথাও বাড়িয়ে বলছি না। ব্যারিস্টার তাপস নিঃসন্দেহে একজন দৃঢ় ও জনবান্ধব ব্যক্তিত্ব।

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকালে সহধর্মিণী সহ ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস

ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যারের তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একটা পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব আছে। উনি হাজারো নেতা কর্মীর ভিড়ে চেষ্টা করেন প্রায় সবার নাম মনে রাখতে। নাম না জানলেও অনেক সময় চেহারা মনে থাকলে দেখা হলে উনি ভালো মন্দ খোঁজ নিতে ভুলেন না। ব্যারিস্টার তাপস স্যারের সাথে আমার দেখা হয় উনার সুপ্রীম কোর্টের রুমে। বারের অনেক সিনিয়র ভাইদের সাথে আমি ছিলাম।উনার সাথে কথা শেষ করে চলে যাচ্ছিলাম, এমন সময় উনি খোজ খবর নিলেন। নিয়মিত কোর্টে দেখা যায় তাই উৎসাহিত করলেন এবং কিছু বলার আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। আমি তখন বলে ছিলাম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি মামলায় আমার হাতে খড়ি আছে কারণ আমি ড. কামাল হোসেন স্যারের অধীনে কাজ করেছি (অনেকেই হয়ত জানেন না আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ওয়াল্ড ব্যাংকের অধীনে International Centre for Settlement of Investment Disputes-ICSID নামে একটি সংস্থা আছে, যেখানে ব্যারিস্টার তাপস স্যার বাংলাদেশ থেকে মনোনীত আইনজীবী)। তো তখন উনি আমাকে ওনার চেম্বারে একদিন এসে উনার সাথে দেখা করতে বলেন এবং এই বিষয়ে উনার সাথে বিস্তারিত আলোচনা হয় পরবর্তীতে। এরপর থেকে কোনো অনুষ্ঠানে দেখা হলে উনি ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করেন। খোঁজ খবর নেন। ব্যাপারটা ভালো লাগার মতো।

পরিশেষে শেষ করবো, মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যারের কাছে আমাদের আশাবাদ ব্যক্ত করার মাধ্যমে। তিনি প্রথম মেয়র যিনি পেশায় একজন আইনজীবী। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি আইন পেশার মত চ্যালেঞ্জিং পেশা থেকে উঠে আসা এবং ঢাকা ১০ আসনের (সাবেক) নির্বাচিত প্রতিনিধি হাওয়ার সুবাদে ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যার একজন যোগ্য মেয়র হবার সব গুণাবলী এবং যোগ্যতা রাখেন। সামনে হাজারো সমস্যা। বর্তমান করোনা সমস্যার সাথে যোগ হতে পারে ডেঙ্গু সমস্যা। উনি এমন এক সময় দায়িত্ত্বভার গ্রহণ করলেন যখন করোনাতে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। নিয়মিতভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনের মামলা মোকদ্দমা করার কিছু অভিজ্ঞতা থাকার কারণে জানি এই প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষেত্র কত বিস্তৃত এবং জটিল। তাছাড়া আছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব, যানজট দূর করার দায়িত্ব, রাস্তা ঘাটের কাঠামো উন্নয়ন, শহরের সৌন্দর্য বর্ধন, আগামী প্রজন্মের জন্য সিটি করপোরেশনের সার্ভিস প্লাটফর্ম গুলোকে ডিজিটাল করা, এক কথায় আগামী দিনের আন্তর্জাতিক ঢাকা বিনির্মাণের কাজ।

চ্যালেঞ্জ ছিল, থাকবে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সন্তান হিসেবে, আইনজীবী হিসেবে, ঢাকা ১০ আসনের সাবেক এমপি হিসেবে, সর্বোপরি একজন দক্ষ যোগ্য মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যারের কাছে সাধারণ ঢাকাবাসির দাবী অনেক। কারণ আমরা আমাদের আশেপাশের পাতি নেতা থেকে শুরু করে বড়ো নেতাদের দুর্নীতির গল্প শুনতে শুনতে এখন রীতিমত বিরক্ত। আমরা চাই আমাদের নেতা সকল দুর্নীতি, ভয় ভীতির উর্ধ্বে উঠে মানুষের জন্য কাজ করবেন। সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলে তাদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের চেষ্টা করবেন। আমরা আশা করি তিনি সর্বদা খেয়াল রাখবেন তার আশে পাশের কতিপয় মানুষ তার সুনাম নষ্ট করছে কিনা – নেতা হিসেবে এটা জানা তার দায়িত্বের ভেতর পড়ে। মেয়র আনিসুল হক ছিলেন, ঢাকাবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত। তার অকাল চলে যাওয়ার পরে আজও ঢাকাবাসী উনাকে জনবান্ধব মেয়র হিসেবে মনে রেখেছে। আমরা চাই ব্যারিস্টার শেখ তাপস স্যার মানুষের জন্য কাজ করবেন এবং সাধারণ ঢাকাবাসীর কাছে একজন নেতা হিসেবে নয়, আমাদের মতই একজন হবেন। আমাদের দুঃখে ব্যথিত হবেন, বিপদে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। অনেক খারাপের ভিড়ে আপনি আমাদের আশা ভরসার প্রতীক হবেন, আমাদের প্রাণের ঢাকা শহরকে বসবাসযোগ্য একটি আধুনিক সুন্দর নগরীতে পরিণত করবেন। এইবলে আবারও ঢাকা দক্ষিণের নতুন মেয়রকে অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করছি এই লেখা। ধন্যবাদ সকলকে মনোযোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত লেখাটি পড়ার জন্যে।

লেখক- অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং প্রেসিডেন্ট, লিগ্যাল ভয়েস ফাউণ্ডেশন।
Gazi.Reza@hotmail.com