করোনায় আইনজীবীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাসপাতালের সাথে চুক্তি ও কিছু কথা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৩ জুন, ২০২০ ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ
ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা

ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা:

সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী প্রিয় রবিউল আলম বুদু স্যার করোনা আক্রান্ত, সুপ্রীম কোর্টের বর্তমান কার্যকারী পরিষদের সদস্য মরিয়ম আপা আক্রান্ত, ফাউজিয়া করিম ফিরোজ আপা আক্রান্ত! গতকাল সারা দিন মনটা খারাপ গেছে সুপ্রীম কোর্টের লাইব্রেরীয়ান আসাদ ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে। সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছি কারণ আসাদ ভাই ছিলেন সেই ব্যক্তি যার কাছে আমাদের প্রতিনিয়ত যাওয়া হত আইনজীবীদের কাছে মেসেজ দেওয়ার জন্য। আহা নিয়তি, আহা জীবন! এক সেকেন্ডের নাই ভরসা, বন্ধ হইবে রঙ তামাশা, চক্ষু মুদিলে, হায়রে দম ফুরাইলে।

জানতে পেরেছি কোর্ট বারের লাইব্রেরিয়ান আমাদের আসাদ ভাই ৩ দিন চেষ্টা করেও কোভিড-১৯ টেস্ট করাতে পারেন নাই। সর্বশেষ চেষ্টায় আগামীকাল আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে তার টেস্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই টেস্ট করার আর প্রয়োজন হবে না। গানটা কানে বাজতেছে, এক সেকেন্ডের নাই ভরসা, বন্ধ হইবে রঙ তামাশা, চক্ষু মুদিলে, হায়রে দম ফুরাইলে। আসাদ ভাইয়ের রং তামাশা না হয় বন্ধ হইছে অকালে, কিন্তুু এর পর কে আমি আপনি? স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি আজ কোথায়?

কদিন আগে ঢাকা বারে আন্দোলন করতে দেখলাম কয়েকজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে। আমি ভাবতেছিলাম আমরা কি আমাদের ভালো বুঝি?! যারা আক্রান্ত হয়েছেন করোনা ব্যাধিতে তারা এবং তাদের পরিবারের মানুষগুলো জানেন কতটুকু অসহায় হয়ে পড়েন তারা। আমাদের অতি নিকটের ভাই ঢাকা জজ কোর্টের প্রিয় মুখ অ্যাডভোকেট মাসরাত ভাই তার মা এবং ভাইকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন। তার ফেসবুকের স্ট্যাটাস দেখলে বুঝা যায় কি অসহায় হলে ওনার মত একজন সাহসী মানুষ ভেঙে পড়েন। অনেক ঘোরা ঘুরির পরে আল্লাহর অশেষ রহমতে আজগর আলী হাসপাতালে তিনি ওনার পরিবারের সদস্যদের ভর্তি করাতে পেরেছেন। চিকিৎসা চলছে। আজ আইনজীবী বা কোর্টের বেতনভুক্ত কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য আলাদা হাসপাতালের ব্যবস্থা থাকলে মনে হয় এই বিপদের সময়ে কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হত।

আমাদের যেটা বুঝতে হবে সবাই মিলে আমরা ইচ্ছা করে সখের বশে কোর্ট বন্ধ চাইনা। সবাই নিশ্চয় স্বীকার করবেন কোর্ট বন্ধ থাকলে কোন আইনজীবীর ভাল লাগার কথা না কিন্তু ভাই সকল একটু আসে পাশে তাকা, ভালো করে দেখেন, মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে। ভার্চুয়াল কোর্টের অনেক সমস্যা কিন্তু তার সমাধান স্বাভাবিক কোর্ট খোলা নয়। আমাদের আন্দোলন হাওয়া উচিৎ বিদ্যমান ভার্চুয়াল কোর্টের সমস্যা সমাধানে সরব হাওয়া। আইনজীবী নেতৃবৃন্দকে সমস্যা সমাধানে সহায়তা করা। যেহেতু ভার্চুয়াল কোর্টের কার্যাবলীতে অনেক কাজের জন্য কোর্টে আসতে হয় সেজন্যে আইনজীবী এবং কোর্টের কর্মচারীদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করা। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলা সমাধানে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

তবে সব কিছুর আগে আমার মতে আমাদের সকলের আওয়াজ তোলা উচিত আইনজীবীদের জন্যে আলাদা হাসপাতালের ব্যবস্থা করার জন্যে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই এখন সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন। আমাদের নিজেদেরকে অবশ্যই সাবধান হতে হবে, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে কিন্তুু সেই সাথে নিজেদের সুরক্ষার জন্যে মনে হয় একটি হাসপাতালের দাবিতে সরব হতে হবে এবং সেটি বাস্তবায়ন হওয়ার আগে আপাতত বারের নেতৃবৃন্দকে বলতে হবে আইনজীবীদের সুরক্ষার জন্য অতিসত্তর সুপ্রীম কোর্ট বার যেন কোন হাসপাতালের সাথে সাময়িক চুক্তিবদ্ধ হয়। যেহেতু আইনজীবী এবং তার পরিবারের ব্যাক্তিরা অনেক সংখ্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন তাই মনে হয় আইনজীবী নেতৃবৃন্দের উচিৎ হবে কোনো হাসপাতালের সাথে চুক্তিবদ্ধ হাওয়া যেনো অন্তত আক্রান্ত হাওয়ার পর আইনজীবীদের, আদালতের কর্মচারীদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে না হয়।

সুপ্রীম কোর্টের বর্তমান সম্পাদক আমাদের সিনিয়র বড়ো ভাই কাজল ভাই আমাদের লাইব্রেরীয়ান আসাদ ভাই মারা যাওয়ায় এবং বারের অন্যান্য সম্মানিত সদস্যদের করোনা আক্রান্ত হাওয়ার খবরে সুপ্রীম কোর্ট বারের কার্যাবলী এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন। সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমান নেত্রীবৃন্দ অনেক আইনজীবীবান্ধব, সাহসী এবং অতি দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার মত ডাইনামিক। তাই আমরা আশা করি তিনি এবং আমাদের বর্তমান সভাপতি আমিন উদ্দিন স্যার করোনা আক্রান্ত আইনজীবীদের সুরক্ষার জন্য সরকারী বা বেসরকারী হাসপাতালের সাথে অতিসত্তর চুক্তিবদ্ধ  হবেন যেন বারের কোন সদস্য বা কর্মকর্তা-কর্মচারী আক্রান্ত হলে জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। আপনারা উদ্যোগ নিলে সেটার দেখা দেখি অন্যান্য বারও উৎসাহিত হবে সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে। বিপদের সময় বারের থেকে এই সিদ্ধান্ত নিলে সকল আইনজীবীরা বর্তমানের বারের নেতৃবৃন্দের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে বলে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে মনে করি। কষ্ট করে শেষ পর্যন্ত লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্ট, লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশন।