বিচারপতি অপসারণে সাংবিধানিক শূন্যতা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভেদ


প্রকাশিত :২৫.১০.২০১৬, ১:৫০ অপরাহ্ণ

252975_1-550x376‘হাইকোর্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করায় এখন বিচারপতি অপসারণের বিষয়ে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে’ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের এ মন্তব্যে দেশের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল নিজ কার্যালয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই আইন কর্মকর্তার বক্তব্যকে কেউ বলছেন ‘সঠিক’ আবার কেউ বলছেন ‘সঠিক নয়’। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ অ্যাটর্নী জেনারেলের বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিলেও অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ, ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ মনে করেন ষোড়শ সংশোধন নিয়ে হাইকোর্টের রায় সংবিধান পরিপন্থী নয়।

তাদের বক্তব্য হলো ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পর দেশে কোনো সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়নি। বরং উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফেরাতে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল পাস ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর কালোছায়ার নামান্তর। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড, শাহদীন মালিক মনে করেন হাইকোর্টের রায়ে যে সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনে উদ্যোগ নেয়া সরকারের দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আমি ওই মামলার এমিকাস কিউরি ছিলাম। আমার বক্তব্য আমি আদালতেই তুলে ধরেছি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। একটি রিট আবেদনে চলতি বছরের ৫ মে হাইকোর্ট সংবিধানের ওই সংশোধন অবৈধ ঘোষণা করে। তিন বিচারপতির ওই বেঞ্চের রায়টি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে হয়েছিল। গত ১১ অগাস্ট দুই বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর তৃতীয় বিচারকের রায়ও প্রকাশ পায়।

‘সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে’ দাবি করে অ্যার্টনী জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, হাইকোর্ট বিভাগের দু’জন বিচারপতি রায় দিয়েছেন ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে; একজন বলেছেন বৈধ। এর বিরুদ্ধে আমরা অবশ্যই আপিল বিভাগে আপিল করব। আমরা সর্বোচ্চ আদালতে হাইকোর্টের রায়কে বাতিল অথবা পরিবর্তন করার চেষ্টা করব। এক মাসের মধ্যেই আমরা হয়তো (আপিল) দাখিল করতে পারব। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর ৯৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অনুন্য দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত প্রেসিডেন্টের আদেশ ছাড়া কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না।’ সংবিধানের ৯৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দফা (২) এর অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। রায় ঘোষণার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, সংসদের সিদ্ধান্তকে অবৈধের এই রায় আপিল বিভাগে টিকবে না। রাষ্ট্রপক্ষ এখন আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা আইনি পথেই যাব। আমরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করব না। উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণে আইনি শূন্যতা বিরাজ করছে কিনা জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, আইনি শূন্যতা তো রয়েছে। ষোড়শ সংশোধনের মাধ্যমে শুধুমাত্র ৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া হয়েছে। এখানে আমি মনে করে বিচারপতিদের আরো সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করবে এরপর আপিল বিভাগ রায় দিবেন। এরপর ষোড়শ সংশোধনী কার্যকারিতার জন্য সরকারকে আরো দুইটি কাজ করতে হবে। কোন বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম অথবা অদক্ষতা বিষয়ে অভিযোগ আসলে ওই বিচারপতি অপসারণে তদন্ত কিভাবে হবে এটা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিচারপতিরে বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে কি পদ্ধতিতে বিচারপতি অপসারণ বিষয় সংসদে পাস হবে এই বিষয়ে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে হবে।

ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের বক্তব্যের বিরোধিতা করে একই প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারিক কোন সংকট নেই। ষোড়শ সংশোধনকে হাইকোর্ট অবৈধ ও সংবিধানপরিপন্থী ঘোষণা পর আগের অবস্থা বহাল রয়েছে। তথা আগের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রয়েছে। আমাদের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোন সংসদ সদস্য যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছে সেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবে না। যদি ভোট প্রদান করে তাহলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল বলে গণ্য হবে। ফলে সংসদ সদস্যরা নিজের মতামত ইচছা মত দিতে পারেন না। ফলে সরকার দলীয় মতে বিচারপতিদের অপসারণ হবে এবং এক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে এটা করা হবে। এই কারণে হাইকোর্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেছেন। বাতিল করার ফলে আগের অবস্থা বহাল আছে। যে পর্যন্ত আপিল বিভাগ এই বিষয়ে ভিন্নমত না দেয়। তাই আমি মনে করি দেশে কোন ধরনের বিচারিক সংকট নেই। ষোড়শ সংশোধনী মাধ্যমে সরকারকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিচারপতিরা ব্যস্ত থাকবে। স্বাভাবিকভাবে বিচারপতিরা বিচারকার্য চালাতে পারবে না। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, আইনে শূন্যতা পূরণ করা দায়িত্ব তো সংসদের ও সরকারে।

এটা বিচার বিভাগের দায়িত্ব নয়। হাইকোর্ট যোড়শ সংশোধনী বাতিল করার পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল নয়। সুপ্রিম এই শূন্যতা পূরণে সরকার ও সংসদের উদ্যোগ নেয়া বাঞ্ছনীয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, এই রকমভাবে আদালত অবমাননা বিষয়টি হাইকোর্ট বাতিল করেছে পরবর্তীতে সংসদ আর কোন আইন করেনি। এই ক্ষেত্রে সরকার ও সংসদের উচিত এ ব্যাপারে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া। রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, বিচারিক কোন শূন্যতা নেই। এখন বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তিনি আরো বলেন, ষোড়শ সংশোধনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের এক ধরনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। যার মাধ্যমে ন্যায় বিচার বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, হাইকোর্টের ওই রায়ে সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়নি; বরং বিচারপতিদের ওপর ক্ষমতাসীনদের অযাচিত হস্তক্ষেপের পথ বন্ধ হয়েছে। বিচার বিভাগ ও বিচারপতিদের ওপর হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকালে বিচার ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি বিচারক নিয়োগ দলীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাইকোর্টের ওই রায়ের মাধ্যমে সে শঙ্কা মুক্ত হওয়া গেছে। সূত্র: ইনকিলাব

 

 

সম্পাদনা- ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon