গাইবান্ধায় সাঁওতালদের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হচ্ছে


প্রকাশিত :১২.১১.২০১৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

new-profile-pic

. বদরুল হাসান কচি

সাঁওতাল-অধ্যুষিত গ্রাম দুটির নাম মাদারপুর ও জয়পুর। গত রোববারের বিকেল, সন্ধ্যা ও রাত ছিল এ দুটি গ্রামের মানুষের জন্য বিভীষিকাময়। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি-অভিজ্ঞতা তাড়িয়ে ফিরছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারসংলগ্ন গ্রাম দুটির মানুষকে।

সেদিন জমির আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ একজন ওই রাতেই মারা যান। পরদিন রাতে ধানখেত থেকে আরেক সাঁওতালের লাশ উদ্ধার করা হয়। গ্রামবাসীর ধারণা, তিনি ওই সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে খেতে পড়ে ছিলেন। পরে মারা যান। আহত হন ১৮ জন।

সাঁওতাল পরিবারগুলোর ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। কারা আগুন দিল, কীভাবে লুটপাট চালানো হলো, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিও হয়নি। উল্টো মামলা দেয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে; আতংকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ঘর পোড়া সাঁওতালরা এখন খোলা আকাশের নিচে দিনরাত পার করছে। শীতে শিশুরা কষ্ট পাচ্ছে; সামনে বার্ষিক পরীক্ষা কিন্তু বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না প্রাথমিকে পড়া সাঁওতালদের সন্তানরা। এটা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন! যদি আমাদের সংবিধানে একটু চোখ বুলিয়ে আসা যায় তবে বিষয়টি অনুধাবন সহজ হয়- “আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;”

সংবিধানের প্রস্তাবনায় বাংলাদেশের জনগণকে নিয়ে এমন অঙ্গীকার থাকলেও রাষ্ট্র সাঁওতালদের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। কেবল তাই নয়, সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে অনুচ্ছেদ-২৩ক এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’।

রাষ্ট্রের নিরব ভূমিকায় প্রতিবাদ জানিয়ে, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও নাগরিক সমাজের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয় শুক্তবার। প্রধান বক্তা বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমরা যদি নিজেদের মানুষ হিসেবে মনে করি, তাহলে আরও যেসব মানুষের অধিকার হরণ হচ্ছে, তাহলে এটার বিরুদ্ধে দাঁড়াব। আমরা জোর গলায় বলতে চাই, এই মানুষেরা ঠিক যে অবস্থায় ছিল, সেই জায়গায় তাদের ফিরিয়ে আনা হোক। তাদের ত্রাণের আওতায় না এনে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। যাতে তারা যেভাবে জীবন চালাচ্ছিল, অন্তত সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারে।’

সংবাদ সম্মেলন থেকে আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং দাবী করেন, এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত; মিল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির তদন্ত; নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিজ ভূমিতে বসবাসের নিশ্চয়তা; ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের নামে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক।

এগুলো কোন অযৌক্তিক দাবী নয়; এটা সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার দাবী। প্রকৃতিতে প্রত্যেকটি প্রাণীরই কোন না কোন গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে; তেমনি রাষ্ট্রের মূল জনগোষ্ঠীর সাথে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্ব রয়েছে, এগুলোকে উচ্ছেদ করে ধ্বংস করতে গেলে নিজেদেরও ক্ষতি আছে, সেটি হয়তো দৃশ্যত বুঝা যাচ্ছে না। গাইবান্ধার সাঁওতালদের পাশে রাষ্ট্র থাকুক এই প্রত্যাশা।

লেখকঃ আইনজীবী ও সম্পাদক, ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডট কম।

 



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon