বিচার বিভাগে ‘আমার লোক’ নিয়োগ কাম্য নয়


প্রকাশিত :২০.১১.২০১৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ

mahmudula-aminসাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদূল আমীন চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৭ সালে সিলেটের গোলাপগঞ্জের রনকেলী গ্রামে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে বিচারক জীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে হাইকোর্টে এবং ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগে যোগদানের পরে ২০০১ সালের ১ মার্চে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০০২ সালের ১৮ জুন তিনি অবসরে যান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান।

কীভাবে বিচারক হলেন?

বাহাত্তরের মূল সংবিধানে বিধান ছিল জেলা বার থেকে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নিয়োগ করা যাবে। আমি তখন সিলেট বারে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বের হলো। আমি আবেদন করলাম। কিন্তু এ প্রক্রিয়া কর্মরত বিচারকেরা সুনজরে দেখেননি। তাঁরা কান ভারী করলেন। সারা দেশ থেকে প্রায় ৬০ জন মৌখিক পরীক্ষা দিলাম। টিকেছিলাম ৮ জন। আমি ছিলাম দুই নম্বরে। শেষ পর্যন্ত দুজন নেওয়া হলো—আমাকে ও বগুড়ার একজনকে। এরপর আর কাউকে নেওয়া হয়নি।

অধস্তন আদালতের কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা? হঠাৎ বদলি হয়েছিলেন?

কোনো হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি। প্রথম কর্মস্থল টাঙ্গাইলে দু বছর আট মাস থেকে বদলি হয়েছিলাম। তবে এরশাদ সাহেবের সময়ে আমি ঢাকার জেলা জজ ছিলাম। নিউমাকের্টের পেছনে কাঁচাবাজার নিয়ে একটা মামলা ছিল। সেখানে আমি একটা স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছিলাম। এতে সামরিক কর্তৃপক্ষ বিরক্ত হয়ে আমাকে ফরিদপুরে বদলি করেছিল। তখন আমি ঢাকায় কেবল দশ মাস।

তাহলে সরকারের মনঃপূত না হলে বিচারকদের বদলি একটা পুরোনো কৌশল? এখন প্রতি কার্যদিবসে সরকার ৫ জন বিচারককে বদলির প্রস্তাব দেয়। সুপ্রিম কোর্ট ৪টিতেই একমত হন। অথচ কানাডীয় সুপ্রিম কোর্টের বরাতে আপনারই রায় ছিল ৩ বছর মেয়াদে একটি কর্মস্থলে থাকা বিচারকের স্বাধীনতার অংশ।

আমি প্রধান বিচারপতি হয়ে বলেছিলাম নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে কোনো বদলি হবে না। সরকার প্রস্তাব দিলেই সুপ্রিম কোর্ট যে তাতে একমত হবেন তা তো নয়। বদলি বিষয়ে সরকারকে একটা নীতিমালা করে দিতে হবে। ব্যতিক্রমী কোনো কারণ না দেখাতে পারলে মেয়াদের আগে বদলি করা চলবে না। ক শ্রেণির জেলা বা কর্মস্থলে তিন বছর। আবার পটুয়াখালী ও বরগুনার মতো খ শ্রেণির কর্মস্থল হবে দুই বছরের। আমার সময়ে খুবই কম বদলির ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান রেজিস্ট্রার জেনারেল আমার সময়ে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কোনো একটি প্রস্তাব সরকার থেকে আসার সময় সংশ্লিষ্ট বিচারক এর আগে কোথায় কত দিন ছিলেন তার উল্লেখ থাকত।

এখন এতটা বিস্তারিত তথ্য লেখা হয় না বলে জানা যায় না। বরং অন্তত কিছু বদলির জন্য ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখানো হয়ে থাকে।

‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে কোনো বিচারককে বদলি করা যায় না। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেলায় তা খাটে। কোনো বিচারক কোনো ইংজানশন বা কাউকে জামিন দিলে স্থানীয় প্রশাসন নারাজ হয়। সুতরাং প্রশাসনিক কারণে বিচারক বদলি অচল। কোনো বিচারক কাউকে জামিন দিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। কারণ জামিন প্রদানে তাঁর এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে জামিন বলে আর কোনো পদার্থ নেই। এখন একমাত্র আছে রিমান্ড। আমরা যখন প্র্যাকটিস শুরু করেছিলাম তখন রীতি ছিল ছোট ছোট মোকাদ্দমায় জামিন দেওয়া যাবে, ডাকাতিতে দেওয়া যাবে না। যদিও ডাকাতির মোকদ্দমায় জেলা জজ জামিন দিতেন। কিন্তু খুনের মোকদ্দমায় জেলা জজরাও জামিন দিতে চাইতেন না। তখন একটা সিস্টেম ছিল।

প্রধান বিচারপতি হওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা কি বলবেন?

প্রধান বিচারপতি হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এবং আমরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করি। আলোচনার শেষ দিকে এসে তিনি বললেন, আপনি তো প্রধান বিচারপতি হবেন। ১২ জন বিচারপতি নিয়োগের দরকার পড়বে। বললাম, আমি প্রধান বিচারপতি হব কি না তা তো এখনো জানি না। তবে যদি হইও ১২ জনকে একত্রে নিতে পারব না। তিনি বললেন, কেন? বললাম, যদি ১২ জনকে নিই তাহলে দেখা যাবে মামলার নিষ্পত্তির হার কমে গেছে। কারণ এই ১২ জনের সঙ্গে আরও ১২ জন সিনিয়র তাঁদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়বেন। ফলে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের মামলা নিষ্পত্তির গতি কমে যায়। তখন শেখ হাসিনা বললেন, আচ্ছা তাহলে আপনার ইচ্ছামতো নেবেন। তবে আমার একটা ফরমায়েশ আছে। এ কথা শুনে আমি একটু ভয় পেয়েছিলাম। বললেন, আপনি যাকে সুপারিশ করবেন তাতেই আমার সম্মতি থাকবে। অরাজনৈতিক বা সার্ভিস জজ হলে আপত্তি নেই। আবার আইনজীবীরা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুরাগী হতে পারেন। রাজনীতি করতে পারেন। তবে শর্ত একটাই, আপনি সন্তুষ্ট হবেন যে তিনি সৎ কি না। আমার এই একটাই শর্ত।

তাহলে শেখ হাসিনার তখনকার দৃষ্টিভঙ্গি যে যথাযথ ও উদারনৈতিক ছিল তাতে আমরা ভরসা পেতে পারি?

সেটা ঠিক। আমি নয়জন বিচারপতির নাম দিয়েছিলাম, সবার ব্যাপারেই তিনি সম্মতি দিয়েছেন।

কী প্রক্রিয়ায় বাছাই করেছিলেন? কাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন?

সত্যি বলতে কি, পরামর্শ করিনি। কাদের সঙ্গে পরামর্শ করব? পরামর্শ করতে গেলেই তো সমস্যা বাধে। তখন মাহমুদ ইসলাম ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তাঁকে জিজ্ঞেস করে দুজনকে নিয়েছিলাম। বাকিদের আমি বাছাই করেছিলাম। আমি যত দিন প্রধান বিচারপতি থেকেছি কোনো হস্তক্ষেপের আভাসও পাইনি। পরে বিএনপির সময়ও আমি কিছুদিন ছিলাম। তারাও কোনো রকম হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেনি। আওয়ামী লীগের সময় একজন বিচারককে বদলির প্রস্তাব পেয়েছিলাম। জানতে চাইলাম তাঁর মেয়াদ পুরো হয়নি, কেন তবু প্রস্তাব করা হলো। বল হলো প্রশাসনিক কারণে। অনেক সময় অসৎ কর্মকর্তাদের বিষয়ে লিখিতভাবে না বলতে পেরে এ পরিভাষার ব্যবহার ঘটে। আমি রেজিস্ট্রারকে বললাম, আচ্ছা ফাইলটা আমাকে দিন, আমার কাছে রেখে দিই। আমি সেই নথিতে লিখেছিলাম, প্রশাসনিক কারণে কোনো বিচারককে বদলি করা যায় না। ঠিক একই বিষয় পরবর্তী সরকারের আইনমন্ত্রীর সময় ঘটেছিল। আমি ঠিক একই কথা লিখেছিলাম। এ দুটি আকস্মিক বদলির প্রস্তাব এসেছিল। আমি দুটিই নাকচ করেছি। সুতরং সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সংবিধান সংশোধন ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের তদারকিতে অধস্তন আদালত চলতে পারে। ঢাকায় যাঁরা প্রেষণে ছিলেন, তাঁদের অনেককে আমি ঢাকার বাইরে পাঠিয়েছিলাম। নিয়ম করে দিয়েছিলাম ঢাকায় এক মেয়াদ থাকলে পরে আর দু্ই মেয়াদে ঢাকায় বদলি হয়ে আসতে পারবে না। সম্ভবত এই রীতিটা আমি লিখে দিয়েছিলাম। বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে সম্প্রতি এসব বিষয়ে আমি স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। প্রধান বিচারপতি অনেক কিছুই করতে চান। কিন্তু তার সীমাবদ্ধতা আপনাদের বুঝতে হবে।

মাসদার হোসেন মামলার তিন বিচারপতির মধ্যে আপনিই বেঁচে আছেন। বিচার বিভাগ পৃথক্করণকে কীভাবে দেখছেন?

বিষয় শুধু বিচার বিভাগ পৃথক্করণ নয়, পৃথক করতে হবে সমগ্র জাস্টিস ডেলিভারি সিস্টেম। এর অর্থ হলো অপরাধ অনুসন্ধানের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা পুলিশকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনতে হবে। পুলিশকে দিয়ে বহু ধরনের দুষ্কর্ম করানো হয়। অনুসন্ধানে নিয়োজিত পুলিশ থাকবে স্বাধীন। এই পুলিশ হয় বিচার বিভাগ বা একটি পৃথক পুলিশ মন্ত্রণালয় বা পৃথক পুলিশ অধিদপ্তর তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে। তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে থাকবে। কারণ পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেই তারা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরশাদ আমলে একটা পুলিশ কমিশন হয়েছিল। তার চেয়ারম্যান বিচারপতি আমিনুর রহমান খান আমাকে বলেছিলেন, তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকতে চান না। সঠিক তদন্ত চাইলে তাদের পৃথক করে নিতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বর্ণিত বর্তমান দ্বৈত শাসনে সরকারের কাছে বদলি প্রস্তাবের যে অধিকার রয়েছে, সেটাই একটা হস্তক্ষেপ কি না?

এটা অবশ্যই হস্তক্ষেপ।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যে মৌলিক কাঠামো, তার সঙ্গে আপনাদের রায়ের ১২ দফা নির্দেশনা সে কারণে সাংঘর্ষিক। বর্তমান ১১৬ অনুচ্ছেদ, যা সরকারকে প্রস্তাব দেওয়ার অধিকার দেয়, সেটা মৌলিক কাঠামোবিরোধী। আপনি একমত?

হ্যাঁ, আমি একমত। মাসদার মামলার শুনানিতে আমাদের সামনে এই যুক্তি কেউ নিবেদন করেননি।

তার মানে একটা বিরাট সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে?

হ্যাঁ, একটা বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। এমনকি এই বিষয়ে যে রিভিউ আবেদন করা হয়েছিল, তখনো আইনজীবীরা এই যুক্তি তুলে ধরেননি। কিন্তু চাইলে সেই সুযোগটা এখনো করে নেওয়া যায়। আমার মনে হয় নতুন করে ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে রিটের শুনানির চেয়ে মাসদার হোসেন মামলার চলমান শুনানিতেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করে নেওয়া সম্ভব। এই মামলাটি বিচারাধীন থাকায় বিচার বিভাগ অনেক কিছু পেয়েছে এবং পাচ্ছে। নাগরিকেরা কিংবা মাসদার হোসেন নিজেও ওই যুক্তিতে এখন দরখাস্ত নিয়ে যেতে পারেন।

রিমান্ড প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের যে সর্বশেষ গাইডলাইন এসেছে তা পুলিশ ও বিচারকদের জন্য আলাদাভাবে এসেছে। এখন বিচারকেরা তা লঙ্ঘন করলে তার প্রতিকার সরকার নয়, আমরা হাইকোর্টের কাছে আশা করব।

যে বিচারক তা অনুসরণ করবেন না তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রস্তাবটা দেবে কে? সরকার নিশ্চয়ই রিমান্ড দেওয়ার জন্য কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ চাইবে না। তখন কী হবে?

এটা অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টকে নিতে হবে। দু-একটি ক্ষেত্রে আমি শুনেছি জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করার নির্দেশনা মানা হয়নি। রিমান্ডে নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো থার্ড ডিগ্রি মেথড অবলম্বন করা। রিমান্ডের কোনো আদেশ দিতে হলে কী কারণে রিমান্ড তার ব্যাখ্যা থাকতে হবে।

মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে মূল বাধা কী?

মাসদার হোসেন মামলার রায় নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। যাঁদের এটা কার্যকর করার কথা ছিল, তাঁরা কিন্তু আমাদেরই লোক। আইনমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রণালয় তো আমাদের। কোনো আইনজীবী যখন বারে থাকেন, তখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় সোচ্চার থাকেন। আর আইনমন্ত্রী হওয়ামাত্রই তিনি যেন নিজেকে বিচার বিভাগের শত্রুতে পরিণত করেন। কেন এটা ঘটছে?

প্রধান বিচারপতি দ্বৈত শাসনের কথা বলে ১১৬ অনুচ্ছেদ বাহাত্তরে সংবিধানে ফিরিয়ে আনার কথা বলায় আইনমন্ত্রী বাহাত্তরের সংবিধানে থাকা অভিশংসনের প্রথা প্রবর্তনের কথা স্মরণে এনেছেন।

আমি বলব আইনমন্ত্রীর ওই প্রতিক্রিয়া মোটেই স্বাস্থ্যকর প্রতিক্রিয়া নয়। খবরের কাগজে যা বেরিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে সরকার ও বিচার বিভাগ মুখোমুখি। এটা মোটেই অভিপ্রেত নয়। প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন তারপর আইনমন্ত্রী নীরবতা পালন করলেই ভালো করতেন। এখন লোকে বলে, এই দুজনের মধ্যে একটা মারামারি চলছে। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন সংস্কারের বিষয়ে প্রকাশ্যে না বলে প্রধান বিচারপতি নীরবেও সরকারকে জানাতে পারেন।

হ্যাঁ, সে কথা আমিও শুনেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমিও বলব, সবকিছু খোলাখুলি বলা যায় না। অনেক কিছু করতে হয় পর্দার অন্তরালে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এমন কি কিছু ঘটেছে, যা পর্দার আড়ালে রাখা সম্ভব হয়নি, প্রকাশ্যে বলতে হয়েছে। বিচার বিভাগের কেউ কেউ যে সব মঙ্গলজনক কাজ করেছেন তা মোটেই বলা যায় না। অনেক কিছু খারাপ কাজ হয়েছে। যেমন অধাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রধান উপদেষ্টা হওয়া। সেই সময় তাঁর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের শুনানি মাঝপথে প্রধান বিচারপতি থামিয়ে দিয়েছিলেন। আরেকজন সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্য আদালতে দেওয়া ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলার মূল রায় পরবর্তীকালে যেভাবে পরিবর্তন করেছেন, তা একটা দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ।

এর প্রতিকার কী? প্রধান বিচারপতির নিয়োগের প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আশা করছেন?

আমি এসব নিয়ে বলতে চাই না। তবে এটুকু বলব প্রধান বিচারপতি নিয়োগে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ কাম্য নয়। এটা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে বলব, আপনাকে নিচ থেকে আবার সেভাবেই ওপরে আনতে হবে। কমিটি করে যদি উপযুক্ত ব্যক্তিকে গোড়াতে নিয়োগ দিতে না পারি, তাহলে জ্যেষ্ঠতা বা অন্য কোনো মানদণ্ড, কোনোটিই সুফল দেবে না। আমি যদি গোড়াতেই আমার লোক নিয়োগ দিই, আর তিনি যদি ওপরে যান তাহলে তিনি তো আমার লোকই থেকে গেলেন। কিন্তু সেটা তো ঠিক হবে না। এমন ব্যক্তিকে বাছাই করতে হবে, যার দশ বছরের প্র্যাকটিস অর্থপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বলেই গণ্য হতে পারে। সে জন্য একটা লিখিত নীতিমালা হওয়া দরকার।

দশ বিচারকের মামলায় যে নীতিমালা সুপ্রিম কোর্ট করে দিয়েছেন, সেটা খোদ সুপ্রিম কোর্ট অনুসরণ করছেন কি না, সে বিষয়ে নির্লিপ্ততা দেখা যায়।

সর্বত্র এখন ‘আমার লোক’ নিয়োগের মনোভাব ভর করেছে। আমি যোগ্য লোক খুঁজব, নাকি আমার লোক নিয়োগ দেব, এটাই একটা জটিলতা হয়ে গেছে। জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে এই অবস্থা থেকে আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। হাইকোর্টে এমন আইনজীবী রয়েছেন, যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা হয়তো খুব ভালো নয়। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে চৌকস। তাঁকে নিয়োগ দিতে আপত্তি কোথায়? আমি সিলেটের একজন দেওয়ানি ও আরেকজন ফৌজদারি বিষয়ে আইনজীবীকে জানতাম। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুবই খারাপ ছিল। কিন্তু মেধাবী আইনজীবী। অর্থাৎ বারে যোগ দিয়ে তিনি মেহনত করেছেন।

এক-এগারোতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন করা হয়েছিল। অথচ বর্তমান সরকার সেটা বাতিল করল।

এখন একটা কমিটি করতে হবে। এর নেতৃত্বে থাকবেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর সঙ্গে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সব থেকে জ্যেষ্ঠদের মধ্য থেকে দুজন করে বিচারপতি। থাকবেন অ্যাটর্নি জেনারেল, বারের সভাপতিকেও রাখা যায়। এ রকম সাতজনকে দিয়ে কমিটি করে দিলে তাঁরা ভালো বিচারক বের করতে পারবেন। আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতি এবং তারপরের দুজন কর্মে প্রবীণ বিচারপতি এবং সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল থাকবেন। এভাবে কমিটি করলে ভালো লোক আসবে। ‘আমার লোক’ আসবে না। যাঁরা বলেন ‘আমার লোক’ তাঁদের দলেও ভালো লোক আছে। বিচার বিভাগে ‘আমার লোক’ আনা উচিত নয়। বিচার বিভাগ থেকে বেনিফিট সবাই নিয়ে থাকেন। যাঁরা জনজীবনে সক্রিয় থাকেন তাঁদের নিতেই হয়।

ছাত্রজীবনে শেক্সপিয়ারের একটা নাটক দেখেছিলাম, রাজা ও পাদরি দেশ চালাতেন। কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল পাদরি রাজার করা আইন বাতিল করা শুরু করলেন। রাজা তখন তাঁর সেনাপতির সঙ্গে পরামর্শ করলেন। রাজা বললেন, আমি পাদরিকে বরখাস্ত করি। আর সেখানে তোমাকে বসাই। তাহলে আমরা দুজনে মিলে একমত হয়ে দেশ শাসন করব। কোনো ঝামেলা হবে না। এরপর দুজন মিলে পাদরিকে খুন করলেন। কিছুদিন রাজকার্যে কোনো বিঘ্ন ঘটল না। কিন্তু কিছুদিন পরে দেখা গেল সাবেক সেনাপতি রাজার সব কথা শুনছেন না। রাজা তাঁকে নিরালায় ডেকে ধমকালেন। বললেন, তুমি তো আমার কথা শুনছ না। তখন তিনি বললেন, দেখুন আমি সব স্বীকার করি। কিন্তু আমি আমার ইউনিফর্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। আমি যে পাদরির বেশভূষা নিয়েছি, তার সঙ্গে বেইমানি করতে পারি না।

সমাজে এই মূল্যবোধ কি এখন আছে?

আপাতত তা থাকতে না পারে। কিন্তু আমাদের তো হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।

ষোড়শ সংশোধনী সম্পর্কে আপনার কী মন্তব্য?

বিচারপতি অপসারণ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছেই থাকা উচিত।

কিন্তু এই কাউন্সিল জিয়ার সামরিক ফরমানে সংবিধানে ঢোকার পর গত ৩৯ বছরে তারা কী করেছে?

এই কাউন্সিল স্বপ্রণোদিতভাবে কিছু করে না। সরকার থেকে তার কাছে অভিযোগ তদন্তের অনুরোধ আসতে হবে।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে আপনি দেশের প্রধান বিচারপতি হয়ে আপনার একজন সহকর্মীর বিষয়ে তদন্ত করবেন কি করবেন না, সে জন্য কার্যত প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী। আপনি কীভাবে তা সমর্থন করছেন?

না, আমি সেটা সমর্থন করি না। আমি যদি কোনো অভিযোগ পাই, তাহলে প্রাথমিক তদন্ত করব। তারপর যদি সত্যতা পাই, ভিত্তিহীন মনে না হয়, তখন আমি সেটা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেব।

তাহলে তো কথা সেটাই দাঁড়াল, প্রধানমন্ত্রী না চাইলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে না।

আমি অবশ্য এটা সংশোধনের সুপারিশ করব। একটা সংশোধনী এভাবে আনা যায় যে যখন কোনো প্রধান বিচারপতি কোনো অভিযোগ রাষ্ট্রপতির কাছে রেফার করবেন, তখন রাষ্ট্রপতি সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবেন। এ নথি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবে না। আমি আপিল বিভাগে থাকতে দুটি অভিযোগ সরকার থেকে এসেছিল। কিন্তু আমরা কিছু করতে পারিনি। কারণ একজন নোটিশ পেয়ে পদত্যাগ করেন, আরেকজন অবসরে যান। আমি মনে করি, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অকার্যকর ছিল না।

আপনার মন্তব্য কিছুটা স্ববিরোধী হয়ে উঠেছে। আপনি স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী না চাইলে কাউন্সিল তদন্ত করতে পারে না। ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় পিআর রিভিউ কমিটি আছে। আপনারা তাও গঠন করেননি। প্রধান বিচারপতিরা রাষ্ট্রপতির কাছে কখনোই কারও বিষয়ে তদন্ত করার অনুমতি চাননি।

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে প্রধান বিচারপতিরা তাঁদের সহকর্মীদের বিষয়ে তদন্ত করতে স্বপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ নেননি।

এটা কি তাহলে বলা যায় না যে আমাদের প্রধান বিচারপতিরা এই বিষয়ে একধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছাপ রেখে গেছেন? এবং আরেকটি প্রমাণ হলো ১৯৭৭ সাল থেকে সংবিধান কাউন্সিলকে বিধিমালা তৈরির দায়িত্ব দিয়ে রাখলেও আপনারা তা পালন করেননি?

একে ব্যর্থতা বলা যায় না। তার কারণ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক কোনো মন্দ কাজ করতে পারেন, সেটা তো ভাবাই যায়নি। এটা কেউ কোনো দিন চিন্তাও করেননি। অবশ্য সেই সময় আমরা অতিক্রম করেছি। এখন আবার জজ সাহেবরা যা-ই করেন, সে বিষয়ে নানা ব্যাখ্যা ভেসে বেড়ায়। আমি মনে করি, কিছুটা সংশোধনী এনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রাখাটাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মঙ্গলজনক হবে। আর ব্যর্থতার যে কথা বলছেন তার কিছুটা মানব। বিধিটা করা উচিত ছিল। অবশ্য এটাও লক্ষ রাখবেন অধিকাংশ প্রধান বিচারপতি তিন থেকে ছয় মাস বা এক-দেড় বছর সময়ের বেশি স্বপদে বহাল থাকেননি। আপনি হয়তো বলবেন আমি তো দেড় বছর ছিলাম। শুরুটা করে দিয়ে আসলে আমার উত্তরসূরিরা শেষ করতে পারতেন, এই ব্যর্থতার দায় আমি স্বীকার করি।

আপনি ১১৬ অনুচ্ছেদ বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে বলছেন। কিন্তু ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘সুপ্রিম কোর্ট’ রয়েছে। আবার ১০৯ অনুচ্ছেদে ‘তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ’ হাইকোর্ট বিভাগকে দেওয়া আছে।

ইদানীং দেখি এ ধরনের কথা উঠেছে। এখন তো বিচারকদের বদলি-পদোন্নতি ইত্যাদি জিএ কমিটিতে উঠছে। কিন্তু আগে তো এসব ছিল না? প্রধান বিচারপতিই করতেন।

আপনার সুবিধা-অসুবিধা বা ন্যায়পরায়ণতার প্রশ্ন আলাদা বিষয়। প্রধান বিচারপতির একক সিদ্ধান্ত সংবিধানসম্মত কি না?

আমার যুক্তি হলো আমি ঐতিহ্য অনুসরণ করেছি, আক্ষরিক অর্থে সংবিধান নয়। সংবিধানের বিষয় কখনো স্ট্যাটিক থাকে না। এটা সময়ের ধারায় বদলে যায়।

জেলা জজদের পদ দীর্ঘ সময় ধরে শূন্য থাকছে?

আমি যখন চাকরিতে ঢুকেছি, তখন কিন্তু শূন্য পদের বিপরীতে জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজের প্যানেল হয়ে থাকত। এখন এ রকমের প্যানেল চালু করা উচিত। এখন একটা সমস্যা আছে, প্রধান বিচারপতি যদি অভিজ্ঞতা ও পরিপক্বতা না আসার কারণে কারও পদোন্নতি আটকে দেন, তাহলে সরকার বলবে আমরা জনগণের দুঃখ-দুর্দশা কমাতে আদালতের সংখ্যা বাড়াতে চেয়েছি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তা হতে দেয়নি। তদুপরি প্রধান বিচারপতি এখানে একটা নিয়ন্ত্রণ আনতে পারেন।

পদোন্নতির একটা বিস্তারিত নীতিমালা থাকা দরকার। কারণ এখন ভালোভাবে কেউ মুনসেফ না হতেই সাবজজ বা সিনিয়র সহকারী জজ হয়ে যাচ্ছেন। এটা আমাদের কাম্য নয়। এ জন্য আমি প্রতিটি ধাপে পদোন্নতির জন্য পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করার পক্ষপাতী। তাহলে আমরা অনেক উন্নত লোক পাব। আরেকটি বিষয় হলো বিচারকদের কোনো অবস্থাতেই প্রেষণে পাঠানো যাবে না। সরকারের কোনো বিভাগ যদি মনে করে তার আইন কর্মকর্তা দরকার, তাহলে তারা বার থেকে নিয়োগ দেবে।

২০০৯ থেকে দুর্নীতির দায়ে ২২ বিচারকের চাকরিচ্যুতি ও আরও ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ চলমান থাকা সম্পর্কে আপনার কী মন্তব্য?

অনেক জায়গাতেই দুটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং যেকোনো মূল্যে টাকাপয়সা কামানো। এই বিচারকেরা তো বাইরের পৃথিবী থেকে আসেননি, তাঁরা এই দেশেরই মানুষ। তাঁরা হয়তো দেখেছেন, দুর্নীতি কোন স্তরে নেই। এ কথা বলে একবার সামরিক আমলে আমার চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

ডিসির অফিসে দুর্নীতি হয়। সব অফিসে দুর্নীতি হয়। সেখানে সব হালাল আর রাস্তার অন্য ধারে জেলা জজের অফিস। সেখানে ঘুষ হারাম। সেটা হয় কি? অন্যান্য সব বিভাগ করে তাহলে আমরা করলে কী সমস্যা—এই একটা মানসিকতা দাঁড়িয়ে গেছে। এক তরুণ সহকারী জজ চাকরিতে ঢুকেই বলেছিলেন, ঢাকায় বাড়ি-গাড়ি করব। আমি তখন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ। তাকে ডেকে তিরস্কার করেছিলাম। কিন্তু পরে সে ঠিকই এক দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারক হয়েছিল। আমি মনে করি না যে নিয়োগে সমস্যা আছে। এটা দেশের সামগ্রিক অবস্থার একটা প্রতিফলন। এখান থেকে বের হওয়া বড় কঠিন। আমার মনে হয় এ অবস্থা থেকে বের হতে আমাদের একটা দীর্ঘ সময় পাড়ি দিতে হবে।

মামলার জট, বিচারকদের কর্মক্ষমতা ও বিচার বিভাগের সংস্কারকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আমাদের প্রধান বিচারপতি সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষা এবং বিচার বিভাগের ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনে যে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন, সেটা অব্যাহত থাকাই আমাদের সবার কাম্য। তাঁর প্রচেষ্টাকে আমি সাধুবাদ জানাই। আর প্রতিবছর অন্তত একবার প্রধান বিচারপতি, উভয় বিভাগের বিচারপতি, অধস্তন আদালতের বিচারক, আইনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট আইনজীবী এবং দরকার মনে করলে অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের দিয়ে একটি মহাসম্মেলন ডাকতে পারেন। এই সম্মেলনে বিচার বিভাগের সুবিধা-অসুবিধা, কর্মক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে একটি আলোচনা হতে পারে। যেখানে অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে অনেকেরই মতামত আসতে পারে, যা বিচার বিভাগের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে।

দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন মূল্যায়ন করুন।


একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরিহার্য। স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য এই বিচার বিভাগ খুবই জরুরি। যেসব দেশে স্বৈরশাসন আছে, সেই সব দেশেও বিচারব্যবস্থা আছে। কিন্তু তা স্বৈরশাসকের স্বার্থরক্ষার জন্যই। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকবে শুধু জনগণের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্যই।

সূত্র: প্রথম আলো

 
সম্পাদনা- ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon