ছয় বছরে পুলিশের ৪৩ শতাংশ সদস্যের সাজা


প্রকাশিত :২৭.১১.২০১৬, ১২:০১ অপরাহ্ণ

police_banglaসারাদেশে পুলিশ বাহিনীতে এখন কাজ করছেন প্রায় এক লাখ ৭৭ হাজার সদস্য। কর্তব্যে অবহেলা, মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অপরাধে সম্পৃক্ততা বা পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ে গত ছয় বছরে এদের মধ্যে সাজা পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৪২৬ জন পুলিশ সদস্য। অর্থাৎ শতকরা হিসাবে প্রতি ১০০ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে সাজা পেয়েছেন ৪৩ জনই।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যমতে, গত ছয় বছরে সাজা পাওয়া পুলিশের মধ্যে লঘুদণ্ড পেয়েছেন ৭১ হাজার ৭৭০ জন। গুরুদণ্ড পেয়েছেন চার হাজার ৩৩ জন। বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে ৬২৩ জনকে। ৭৬ পুলিশ সদস্য আবার সরাসরি ফৌজদারি অপরাধেরও আসামি। আদালতে তাদের বিচার চলছে। যারা গুরুদণ্ড পেয়েছেন তাদের মধ্যে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ৫৫১ জনকে।

পুলিশ লঘুদণ্ডের মধ্যে আছে, তিরস্কার। আর গুরুদণ্ডের মধ্যে পড়ে বেতন কাটা, তাৎক্ষণিক বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর বা চাকরিচ্যুতি।

পুলিশ বলছে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলেই শাস্তি দেয়া হয়। ছয় বছরের হিসাব কষলে সংখ্যাটি বড় দেখালেও পুলিশের একটি বড় অংশ অপরাধে জড়িত এ কথা বলা যাবে না।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার উপ-মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাজা পেয়েছে লঘুদণ্ড। এগুলো হয়েছে কর্তব্য অবহেলার কারণে। তাই পুলিশকে অপরাধ প্রবণ বলার সুযোগ নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ এখন বাহিনীতে শৃঙ্খলার বিষয়ে বেশ কঠোর। এ কারণে আগের তুলনায় শাস্তির পরিমাণ বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এই দায় তার ব্যক্তিগত। আমরা সে দায় নেবো না।’

তবে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক (প্রশাসন) নূর খান বলেছেন, যে বাহিনীর ৪৩ শতাংশ সদস্য কোনো না কোনো সাজাপ্রাপ্ত সেই বাহিনীকে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে।

কিছু ঘটনা

গত ১৮ নভেম্বর রাজধানীতে এক ডিম বিক্রেতার কাছ থেকে ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন পুলিশ কনস্টেবল লতিফুজ্জামান। একই দিন আটক হন তার সহযোগী কনস্টেবল রাজিব খন্দকার। এরই মধ্যে তাদেরকে দুই দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

এই দুই পুলিশ সদস্য ধরা পড়েছেন হাতেনাতে। তবে অপরাধপ্রবণ পুলিশের দ্বারা সাধারণ মানুষ প্রায়ই নিগৃহীত হলেও তারা বেশিরভাগই পার পেয়ে যান বলে অভিযোগ আছে। রাজধানীতে তল্লাশির নামে বিশেষ করে রাতে পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে টাকা আদায়, আটক বা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আছে ভুরি ভুরি।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক গণমাধ্যমকে জানান, দুই পুলিশ সদস্যই ছিনতাইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কথা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে ব্যবসায়ী রেজাউল করিম নয়শ গ্রাম স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠে বনানী থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম ও তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে। পরে ওই ব্যবসায়ীর চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে এসআইসহ দুই জনকে আটক করে গণধোলাই দেয়। পরে পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের ও পুলিশের সোর্স আবদুর রাজ্জাক সহ দুই জনের বিরুদ্ধে স্বর্ণ পাচারের মামলা হয়।

চলতি বছরের গত ৩১ জানুয়ারি আশা ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ফারহানা আক্তারকে তল্লাশির নামে ইয়াবা থাকার কথা বলে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উফে পুলিশ কর্মকর্তা রতন কুমারের বিরুদ্ধে।

পুলিশ অবশ্য বলছে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তদন্ত হয়। আর অভিযোগ প্রমাণ হলে সাজা দেয়া হয়।

তবে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই লঘু শাস্তি পেয়ে পার পেয়ে যান বলে অভিযোগ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে মারধর, ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক মাসুদ শিকদারকে প্রত্যাহার করা হলেও এখন তিনি বহাল তবিয়তেই চাকরি করছেন।

গুরুতর অভিযোগ পাওয়ার পরও মাসুদ শিকদার কীভাবে পার পেয়ে গেলেন- জানতে চাইলে এ ব্যাপারে কিছুই বলতে রাজি হননি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার। তিনি বলেন, ‘এত কিছু থাকতে কবে কে কার সঙ্গে কী করেছে তাই নিয়ে আপনার লিখতে হবে কেন? পৃথিবীতে কি আর লেখার মতো কিছু নেই?’

‘মাসুদ শিকদার এখন চাকরি করছেন। তিনি কোথায় আছেন তা আমার জানা নেই। তবে তিনি তার কর্মের শাস্তি পেয়েছেন এবং পুলিশের কোথাও না কোথাও চাকরি করছেন’-বলেন ডিএমপির কর্মকর্তা।

কোন বছরে কত সাজা

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের আট মাসে পুলিশে কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক পদমর্যদার কর্মকর্তাদের মধ্যে সাজা পেয়েছেন প্রায় নয় হাজার ২২৩ জন। অর্থাৎ মাসে এক হাজারেও বেশি।

এই সময় কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক পর্যন্ত লঘুদণ্ডদেয়া হয়েছে আট হাজার ৭৩৬ জনকে, গুরুদণ্ড পেয়েছেন ৩৬৩ জন। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ৫৬ জনকে, বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে পাঁচজনকে। মোট সাজা পেয়েছেন ৯ হাজার ১৬০ জন।

পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে লঘুদণ্ড দেওয়া হয় ৫৯ জনকে, গুরুদণ্ড পেয়েছেন দুইজন। মোট শাস্তি পেয়েছেন ৬১ জন।

সহকারী পুলিশ সুপার থেকে তদুর্ধ্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে লঘুদণ্ড ও গুরুদণ্ড পেয়েছেন একজন করে কর্মকর্তা। মোট শাস্তি পেয়েছেন দুইজন।

২০১৫ সালে মোট শাস্তি পেয়েছেন ১১ হাজার ১০০ জন। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক পদমর্যদার ১০ হাজার ৪৩২ জনকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গুরুদণ্ড পেয়েছেন ৫৯২ জন, চাকরিচ্যুত করা হয় ৭২ জনকে। এই সময়ে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে চারজনকে।

ওই বছর পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৫৫ জনকে, গুরুদণ্ড তিনজনকে, বাধ্যতামূক অবসর দেওয়া হয়েছে একজনকে। মোট শাস্তি পেয়েছেন ৫৯ জন।

এএসপি পদে লঘুদণ্ড পাঁচজন, গুরুদণ্ড একজন, চাকরিচ্যুত দুইজন। মোট শাস্তি পেয়েছেন আটজন।

২০১৪ সালে মোট শাস্তি পেয়েছেন ১৫ হাজার ২৪২ জনকে। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৪০০ জনকে। গুরুদণ্ড পেয়েছেন ৭৬২ জন। চাকরিচ্যুত করা হয় ৭৩ জনকে আর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় সাতজনকে।

এই বছরে পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যদার কর্মকর্তাদের মধ্যে লঘুদণ্ড পেয়েছেন ৪৫ জন, গুরুদণ্ড পেয়েছেন পাঁচজন। মোট শাস্তি পেয়েছেন ৫০ জন।

এএসপি পদে লঘুদণ্ড পেয়েছেন তিনজন, গুরুদণ্ড একজন, চাকরিচ্যুত একজন। মোট শাস্তি পেয়েছেন পাঁচজন।

২০১৩ সালে মোট শাস্তি পেয়েছেন ১৪ হাজার সাতজন। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক পদমর্যদার কর্মকর্তাদের মধ্যে লঘুদণ্ড পেয়েছেন ১৩ হাজার ১৭৪ জন, আর গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৭৫৭ জনকে। এই সময় চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ৭৫ জনকে, বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন একজন।

এই বছর পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে ৩৫ জনকে লঘুদণ্ড আর তিন জনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। মোট শাস্তি পেয়েছেন ৩৮ জন।

এএসপি পদে লঘুদণ্ড আটজন, গুরুদণ্ড একজন, চাকরিচ্যুত চারজন। বাধ্যতামূলক অবসর দুইজন। মোট শাস্তি পেয়েছেন ১৫ জন।

২০১২ সালে শাস্তি পেয়েছেন মোট ১২ হাজার ৮৭৯ জন। এদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক পর্যন্ত লঘুদণ্ড পেয়েছেন ১১ হাজার ৭৭০ জন, গুরুদণ্ড পেয়েছেন ৯২১ জন। আর চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ১৭৪ জনকে, বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন আরও ১৪ জন।

এই বছর পরিদর্শকদের মধ্যে ৩৩ জন লঘুদণ্ড এবং দুইজন গুরুদণ্ড পেয়েছেন।

এএসপি পদে লঘুদণ্ড সাতজন, গুরুদণ্ড চারজন, চাকরিচ্যুত চারজন। মোট শাস্তি পেয়েছেন ১৫ জন।

২০১১ সালে শাস্তি পেয়েছেন ১৩ হাজার ৭১১ জন। এদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৯৭২ জনকে, গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৬১২ জনকে। এর বাইরে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ৯০ জনকে আর বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে ৩৭ জনকে।

পুলিশ পরিদর্শকদের মধ্যে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ২৬ জনকে, গুরুদণ্ড পেয়েছেন দুইজন, বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে একজনকে। মোট শাস্তি পেয়েছেন ২৯ জন।

এই বছর পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার থেকে তার চেয়ে ঊর্ধ্ব কর্মকর্তাদের নয়জনকে লঘুদণ্ড আর একজনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। চাকরিচ্যুত করা হয় ১০ কর্মকর্তাকে। সূত্র: ঢাকাটাইমস

 
সম্পাদনা- ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon