আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গৃহ ও দেহ তল্লাশির ক্ষেত্রে আইনের বিধি বিধান


প্রকাশিত :০১.১২.২০১৬, ৫:০৩ অপরাহ্ণ

adv-soyeb-rahmanসোয়েব রহমান

দেশে বর্তমানে অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নাশকতা ঠেকাতে তথা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে পুলিশি তল্লাশি ও গ্রেফতারের অভিযান বেড়েই চলছে। ঠিক তেমনি বেড়েছে পুলিশি হয়রানি ও জনমনে আতঙ্ক। কিন্তু সাধারণ নাগরিকগণ বিষয়টি জানে না যে, পুলিশ ইচ্ছে করলেই যে কেউকে যখন তখন তল্লাশি বা গ্রেফতার করতে পারেন না। পুলিশি তল্লাশি বা আটক তথা অহেতুক হয়রানি থেকে মুক্ত থাকার জন্য নাগরিকদের কিছু পূর্ব প্রস্তুতিও রাখতে হবে। যেমন নিজের পেশাগত পরিচয়পত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা। এছাড়া চেনাজানা দায়িত্বশীল ব্যক্তির নাম, ফোন নাম্বার ও ঠিকানা সঙ্গে রাখা যেতে পারে। বেআইনি কোনো কর্মকাণ্ড জড়িত না হওয়া এবং বেআইনি কোনো বস্তু বা মালামাল না রাখা। দেশের বিদ্যমান আইন-কানুন মেনে চলা।

বর্তমান প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী পুলিশ কোন নাগরিকের গৃহ তল্লাশি করতে পারে দুইভাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে:

প্রথমত: আদালত হতে ইস্যুকৃত তল্লাশি পরোয়ানা (Search warrant) বলে।[ফৌ.কা. ধারা-৯৬, ৯৮, ৯৯ক, ১০০; ]

দ্বিতীয়ত: থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা কোন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক আইনসঙ্গতভাবে কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার অথবা মামলা সংক্রান্তে কোন মালামাল উদ্ধারকল্পে।[ফৌ.কা. ধারা-৪৭ এবং ১৬৫ দ্রষ্টব্য।]

দায়িত্বপ্রাপ্ত এই দুই ধরনের কর্মকর্তা নিজে সরাসরি উপস্থিত থেকেও এই গৃহতল্লাশি করতে পারেন। কিংবা লিখিতভাবে অপর কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে তা করার অনুরোধ জানালে, অনুরূদ্ধ সেই কর্মকর্তাটিও তাদের পক্ষে এই গৃহতল্লাশি পরিচালনা করতে পারেন।[ফৌ.কা. ধারা-১৬৬ দ্রষ্টব্য।]

উল্লেখ্য যে, কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে গৃহতল্লাশির ক্ষেত্রে ধারা-৪৭ প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে তল্লাশি অফিসারকে কোন নির্দিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হওয়ার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু ধারা-১৬৫ শুধুমাত্র রুজুকৃত মামলা সংক্রান্তে কোন মালামাল উদ্ধারের জন্য সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অথবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা এই দু’য়ের অনুরূদ্ধ অপর কোন কর্মকর্তা ছাড়া, এমন তল্লাশি আর অন্য কেউ করতে পারেন না।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ ধারা মোতাবেক যদি কোন স্থানে মাদক দ্রব্য লুকায়িত আছে বলে পুলিশ অফিসার জানতে পারেন , তাহলে ( ইন্সঃ নিম্নে নহে) পুলিশ অফিসার বিনা পরোয়ানায় তল্লাশী করতে পারেন।{মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ ধারা।}

পুলিশ আইনের ২৩(৮) ধারা মোতাবেক পোশাক পরিহিত কর্তব্যরত অবস্থায় যে কোন জুয়ার আড্ডা , সরাইখানা , বিনা পরোয়ানায় তল্লশীর জন্য সার্চ করতে পারেন ।{পুলিশ আইনের ২৩(৮) ধারা।}

আফিম আইনের ১৪ ধারা মোতাবেক কনষ্টেবল এর চেয়ে উপরের যে কোন পুলিশ অফিসার আফিম উদ্ধারের জন্য বিনা পরোয়ানায় তল্লাশী চালাতে পারেন। {আফিম আইনের ১৪ ধারা।}

সরকারী অফিস গোপনীয় আইনের ১১(২) ধারা মোতাবেক বিনা পরোয়ানায় তল্লাশী চালাতে পারেন।{সরকারী অফিস গোপনীয় আইনের ১১(২) ধারা}

এছাড়াও জুয়া আইনের ৫ ধারা, বিস্ফোরক আইনের ৭ ধারা, আফগারী আইনের ৬৭ ধারা, অস্ত্র আইনের ৩০ ধারার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য।

উপরে উল্লেখিত ধারা মোতাবেক পুলিশ অফিসার বিনা পরোয়ানায় তল্লাশী চালাতে পারেন ।

১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০২, ১০৩ ও পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গল [পিআরবি] প্রবিধান-২৮০ তে পুলিশের তল্লাশির দায়িত্ব এবং নাগরিকের অধিকার স্পষ্ট করা হয়েছে।

কোনো স্থান বা বাড়ি তল্লাশির ক্ষেত্রে

যদি পুলিশ কোনো স্থান বা বাড়িতে তল্লাশি করতে আসে তাহলে তল্লাশির পূর্বে পুলিশ ওই এলাকার গণ্যমান্য দুই বা ততোধিক ব্যক্তিকে ডাকবেন এবং উক্ত তল্লাশিতে সাক্ষী হতে বলবেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে তাদের একজনের প্রতি লিখিত আদেশ দিতে পারবেন। এরপর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে পুলিশ ওই বাড়ি বা স্থানটি তল্লাশি করবেন। তল্লাশি শেষে আটক জিনিসগুলোর একটি তালিকা তৈরি করবেন এবং তালিকাটিতে সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেবেন। তবে এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, তল্লাশিতে সাক্ষীদেরকে যদি আদালত বিশেষভাবে সমন দিয়ে তলব না করে তাহলে উক্ত সাক্ষীদের আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া যাবে না।

এছাড়াও তল্লাশিকৃত স্থানের দখলকারী ব্যক্তি অথবা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তিকে তল্লাশির সময় উপস্থিত থাকার অনুমতি দিবে পুলিশ। উক্ত দখলকারী ব্যক্তি বা তার পক্ষে প্রতিনিধি অনুরোধ করলে সাক্ষীদের স্বাক্ষরযুক্ত আটককৃত মালামালের তালিকার একটি নকল দিতে হবে।

যদি তল্লাশিযোগ্য কোনো স্থান বন্ধ থাকে বা মুক্তভাবে প্রবেশ করা না যায় তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা পুলিশ ভেতরের বা বাইরের দরজা-জানালা ভেঙে প্রবেশ করতে পারবেন। ওই জায়গায় যদি কোনো ব্যক্তি থাকে তাহলে তাকে গ্রেফতার করতে পারবেন।

কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশির ক্ষেত্রে

বর্তমানে আমাদের দেশে যেভাবে ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধিতে এ ধরনের তল্লাশির সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩(৪) ধারায় বলা হয়েছে, কার্যবিধি ১০২(৩) ধারা অনুসারে কোন ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করা যাবে। উক্ত ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে বস্তু সম্পর্কে তল্লাশি হওয়া উচিত, উক্ত স্থানে বা স্থানের নিকট কোন ব্যক্তি উক্ত বস্তু তাহার দেহে লুকাইয়া রাখিতেছে বলিয়া যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহ করা যায়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করা যাইতে পারে।’

অর্থাৎ যে জিনিসটি পুলিশ তল্লাশি করছে তা যদি ওই ব্যক্তির শরীরের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে বলে সন্দেহ হয় তাহলে ওই ব্যক্তিকে পুলিশ সন্দেহ করতে পারবে।

উক্ত ধারায় এটাও বলা হয়েছে, সন্দিগ্ধ ব্যক্তি যদি মহিলা হয় তাহলে অন্য আরেকজন মহিলা দ্বারা কঠোর শালীনতার মধ্য দিয়ে তল্লাশি করতে হবে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫২ ধারা অনুযায়ী মহিলাদের দেহ তল্লাশির সময় নিন্মে লিখিত বিষয় খুব সতর্কতার সহিত পালন করতে হবে:-

-মহিলাদের দেহ তল্লাশি মহিলা পুলিশ দিয়ে করাতে হবে; পুরুষের এ অধিকার নেই।

-দেহ তল্লাশির সময় সব শালীনতা রক্ষা করতে হবে। সে সময় কোন পুরুষ লোক সেখানে উপস্থিত থাকতে পারবে না।

– মহিলা পুলিশ না থাকলে স্থানীয় কোন মহিলাকে দিয়ে তল্লাশি করাতে হবে।

সন্দিগ্ধ কোনো স্থান বা বাড়ির তল্লাশির জন্য যেমন দুই বা ততোধিক গণ্যমান্য ব্যক্তি সাক্ষী হিসেবে থাকতে হয় ঠিক তেমনি ব্যক্তির তল্লাশির ক্ষেত্রেও তা অবশ্যই পালনযোগ্য। ব্যক্তির কাছ থেকে আটককৃত জিনিসের তালিকা করবে পুলিশ এবং ওই ব্যক্তি চাইলেই একটি নকল তাকে দিতে হবে।

১০৩ ধারায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, লিখিত আদেশ দ্বারা আহবান জানানো সত্ত্বেও যে ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তল্লাশিতে উপস্থিত না হয় ও সাক্ষী হতে অস্বীকার বা অবহেলা করেন, তিনি দণ্ডবিধির ১৮৭ ধারায় বর্ণিত অপরাধ করেছেন বলে ধরা হবে।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৩ ধারা সম্পর্কিত উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো এমন-

(১) এই ধারা চারটি উদ্দেশ্যে সংযোজন করা হয়েছে। তারমধ্যে একটি হলো, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা তল্লাশি কার্য পরিচালনা করেন, তারা যাতে কোন অসাধুতার আশ্রয় নিতে না পারেন। [27Cri LJ 73]; [AIR 1931 Rang.333].

(২) এই ধারায় সম্মানিত অধিবাসী বলতে তাকে বুঝায় যিনি নিরপেক্ষ হবেন এবং যাকে তল্লাশি স্থানের মালিক বা প্রতিনিধি প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন। উক্ত অধিবাসীদের মধ্যে কেউ জব্দ তালিকার কপি চাইলে তা সরবরাহ করতে হবে। [15 Cri LJ 441 FB]; [4 DLR 426].

(৩) এই ধারার বিধানসমূহ যথাযথভাবে অনুসরণ ব্যতিরেকে গৃহতল্লাশি করা বা কোন সন্দেহভাজন মালামাল জব্দ করা বৈধ বা আইনীকর্ম বলে গণ্য হবে না। [AIR 1955 All 138 (DB)].

পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গল [পিআরবি] প্রবিধান-২৮০ তে গৃহতল্লাশি পরিচালনা বিষয়ে দেয়া হয়েছে আরও সুস্পষ্ট ও সুনিদির্ষ্ট নির্দশনা। এখানে বলা হয়েছে:-

(ক) তল্লাশি পরিচালনাকারী কর্মকর্তা একদিকে ঘরের অধিবাসীদের অজ্ঞাতসারে ঘরের মধ্যে কোন জিনিষ প্রবেশ করার এবং অন্যদিকে ঘরের মধ্যে হতে কোন জিনিষ বের করার সম্ভাবনা রোধকল্পে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবেন। ঘরের মালিকের উপস্থিতিতে অথবা তার মনোনীত কোন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে তল্লাশি চালাতে হবে। তল্লাশির সাক্ষীদের উপস্থিতিকে কেবলমাত্র একটা আনুষ্ঠানিকতা মনে করা যাবে না। বরং তারা প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ তল্লাশি কার্যক্রমের প্রত্যক্ষদর্র্শী হবেন এবং কোথায় জিনিষটি পাওয়া গেল, তা স্পষ্টভাবে দেখতে সমর্থ হবেন। অত:পর তারা তল্লাশি তালিকায় স্বাক্ষর/টিপসহি করবেন। ঘরের মালিক বা যে সন্দেহভাজন ব্যক্তির মালামাল জব্দ (seize) করা হয়েছে, সে তল্লাশি চলাকালে উপস্থিত থাকলে তাকেও তালিকায় প্রথমে স্বাক্ষর করতে বলা হবে। যদি তাতে সে অস্বীকার করে, তবে এ সম্পর্কে একটি মন্তব্য লিপিবদ্ধ করা হবে এবং সাক্ষীদের দ্বারা তা সত্যায়িত করে নিতে হবে। ঘরের মালিক, সন্দেহভাজন ব্যক্তি অথবা তার প্রতিনিধিকে এই তল্লাশি তালিকার একটি অনুলিপি দিয়ে তার নিকট থেকে স্বীকারপত্রে স্বাক্ষর নিতে হবে। যদি এই স্বীকারপত্রেও সে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করে, তাহলেও এ সম্পর্কেও একটি মন্তব্য লিপিবদ্ধ করে তা সাক্ষীদের দ্বারা তা সত্যায়িত করে নিতে হবে।

যদি তল্লাশিকালে সন্দেহভাজন কোন মালামালই পাওয়া না যায়, তবে ‘জব্দকৃত কোন মালামাল নাই’ মর্মে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে উপরিল্লিখিত একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

(খ) যদি নির্দিষ্ট কোন জিনিষ বিশেষ কোন স্থানে বা বিশেষ কোন ব্যক্তির দখলে আছে বলে জানা যায় অথবা যুক্তিসঙ্গতভাবে এইরূপ সন্দেহ করা হয়, তবে কেবলমাত্র সেইক্ষেত্রেই বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি চালানো যেতে পারে।

সাধারণভাবে পরোয়ানা ব্যতীত তল্লাশি বেআইনী। কেবলমাত্র ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৫ ধারানুসারেই বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি করা যায়। তবে তদন্তের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় কিছু সুনির্দিষ্ট জিনিষ থাকা আবশ্যক এবং এরূপ জিনিষ কোন বিশেষ স্থানে আছে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ঠ যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে হবে। তল্লাশিতে বিলম্ব হলে সেই জিনিষ উদ্ধারে বিঘ্ন ঘটতে পারে, সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার তার ডায়েরীতে এমন বিশ্বাসের ভিত্তি এবং যে জিনিষ তিনি খোঁজ করছেন তার নাম উল্লেখ করবেন।অত:পর ফৌ.কা. ১৬৫ ধারানুযায়ী নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এর অনুলিপি যত শীঘ্র সম্ভব পাঠাবেন।

কোন গৃহের দখলদার দাগী দুশ্চরিত্র কিংবা ফেরারী আসামী, শুধুমাত্র এই অযুহাতেই সে জায়গায় বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি চালানো যাবে না।

(ঘ) তল্লাশি শুরু করার পূর্বে তল্লাশি পরিচালনা করবেন এমন প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তা, তাদের সহকারী, সংবাদদাতা প্রমূখদের দেহ- তল্লাশিতে অংশগ্রহনকারী সাক্ষীগণ, গৃহকর্তা অথবা তার প্রতিনিধির সামনে পরীক্ষা করতে হবে।

(ঙ) এমনভাবে তল্লাশির ব্যবস্থা করতে হবে, যেন গৃহবাসীদের জন্য, বিশেষ করে, মহিলাদের তাতে যথাসম্ভব কম অসুবিধা ঘটে।

(ছ) তল্লাশিতে কত সংখ্যক সাক্ষী উপস্থিত থাকা প্রয়োজন তা নির্দিষ্ট অবস্থার উপর নির্ভর করে। তবে মনোনীত সাক্ষীগণের একই এলাকার বা পাশ্ববর্তী এলাকার অধিবাসী হওয়া আবশ্যক। প্রয়োজনে এ ধরনের অধিবাসীকে লিখিতভাবে তল্লাশি সাক্ষী হওয়ার জন্য আদেশ দেয়া যেতে পারে।

(জ) যতদূর সম্ভব সাক্ষীরা যাতে সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ বা পুলিশের সাথে সম্পর্কযুক্ত না হয় এবং তারা যাতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বলে বিবেচিত হতে পারে, সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি সম্ভব হয়, স্থানীয় স্বায়ত্বশাসিত সংস্থার সদস্য বা গ্রামের প্রধাণ ব্যক্তিকেও তল্লাশি কর্মকান্ড দেখার জন্য উপস্থিত রাখতে হবে। কোন অবস্থাতেই কোন গুপ্তচর, অভ্যস্ত মদ্যপ বা সন্দেহভাজন চরিত্রের লোককে তল্লাশি সাক্ষী হিসেবে তলব করা যাবে না। আগ্রহী কোন ব্যক্তিকে তল্লাশি সাক্ষী হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হলে তার কারণসমূহ তল্লাশিকারী কর্মকর্তা কেস ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করবেন।

(ঝ) যখন বেআইনী অস্ত্র উদ্ধারের জন্য কোন গৃহতল্লাশি চালানো প্রয়োজন হবে, তখন অস্ত্র আইনের ২৫ ধারানুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হতে অবশ্যই পরোয়ানা সংগ্রহ করতে হবে। বেআইনী অস্ত্র উদ্ধারের জন্য কোন পুলিশ অফিসার নিজ উদ্যেগে গৃহতল্লাশি করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন।[অস্ত্র আইনের ২৫ ধারা দ্রষ্টব্য]।

(ঞ) গৃহতল্লাশির সময় নিয়ম বহির্ভূত কার্যকলাপ রোধ করার উদ্দেশ্যেই তল্লাশি পরিচালনাকারী কর্মকর্তা জব্দ করেছেন এমন মালামালের তালিকার তিনটি অনুলিপি ৪৪ নং বিপি ফরমে প্রস্তুত করবেন এবং তল্লাশি শেষে সেই প্রস্তুতকৃত তালিকার একটি অনুলিপি গৃহকর্তা বা তার প্রতিনিধিকে, একটি অনুলিপি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এবং একটি অনুলিপি তার নিজের কাছে রাখবেন।

তল্লাশিকারী কর্মকর্তা এমনভাবে তল্লাশি চালাবেন যেন উপস্থিত সাক্ষীদের মনে এইরূপ কোন সন্দেহ করার কোন অবকাশই না থাকে যে- তল্লাশিকারী কর্মকর্তাগণ, তাদের সঙ্গীয় কনস্টেবলগণ, সহযোগি চৌকিদারগন কিংবা তাদের প্রভাবাধীন অন্য কোন ব্যক্তি কর্তৃক কতগুলো জিনিষ গোপনে ঘরে প্রবেশ করিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে সেগুলো উক্ত তল্লাশির স্থান হতে উদ্ধারকৃত প্রকৃত জিনিষসমূহের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারে।

সাক্ষীদেরকে তল্লাশির সকল স্থানে অবাধ প্রবেশাধিকার এবং সেখানে যা কিছু ঘটে তা দেখতে ও শুনতে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

ডিএমপি এলাকার জন্যও অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য, যা বিধৃত আছে ডিএমপি(থানা)রুলস এর বিধি-১০৬ এ।

তাই সংশ্লিষ্ট কোন পুলিশ কর্মকর্তা যদি এই বিধানের ব্যত্যয় করে, তবে তা আইন বহির্ভূত বা বেআইনী কাজ বলে গণ্য হবে। সেই বেআইনী কাজটির জন্য তার শাস্তি হতে পারে এক বছরের কারাদন্ড। যা বিধৃত আছে দন্ডবিধি ধারা-১৬৬ এবং ডিএমপি অধ্যাদেশ ধারা-৫১ ও ৫২ তে। এই হলো দেহ , গৃহ তল্লাশি সম্পর্কিত আইনের বিধান।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তল্লাশী পরিচালনার ক্ষেত্রে- তল্লাশীর আগে, তল্লাশীর সময়, তল্লাশীর পরে যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখবেন:

তল্লাশীর আগেঃ

১। তল্লাশী কাজে স্বাক্ষী হওয়ার জন্য ২/৩ জন স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিকে আহ্বান করতে হবে।{ফৌঃ কাঃ১০৩ ধারা, পিআরবিঃ ৪৬৫ নিয়ম}

২। কোনো গৃহে বা আবাস স্থলে তল্লাশী করার জন্য বাড়ীর মালিকের অনুমতি নিতে হবে। {ফৌঃ কাঃ ১০২(১) ধারা।}

৩ যে স্থান তল্লাশী করা হবে সেই স্থানে পর্দাশীল মহিলা থাকলে তাদের শালীনতা বাজায় রেখে সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে যাহাতে কোন অপরাধজনক বস্তু নিয়ে পালাতে না পারে

৪। যাহারা তল্লাশী কাজে অংশ গ্রহণ করবেন তাদের পোশাক পরিহিত অবস্থায় থাকতে হবে । {পিআরবি ৯৫১ নিয়ম।}

৫। বাড়ীর মালিক ও সাক্ষীদের সামনে যাহারা তল্লাশী কাজে অংশ গ্রহণ করবেন তাদের শরীর তল্লাশী করে দেখাতে হবে।{ফৌঃ কাঃ ১০৩ ধারা, পিআরবি ২৮০ নিয়ম।}

৬। কোনো গৃহে বা আবাস স্থলে তল্লাশী করার সময় বাড়ীর মালিককে জিজ্ঞাসা করে নিতে হবে যে স্থান তল্লাশী করা হবে সেই স্থানে কোন অপরাধজনক বস্তু আছে কিনা।

তল্লাশী সময়ঃ-

১। কোনো গৃহে বা আবাস স্থলে তল্লাশী কালে বাড়ীর মালিককে সঙ্গে নিয়ে তল্লাশী করতে হবে ।{ফৌঃ কাঃ ১০৩(৩) ধারা।}

২। পরোয়ানায় উল্লেখিত স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থান তল্লাশী করা যাবে না।{ফৌঃ কাঃ ৯৭ ধারা।}

৩। পরোয়ানায় উল্লেখিত স্থান ভালভাবে তল্লাশী করতে হবে।

৪। যে বস্তুটির জন্য তল্লাশী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে সেই বস্তুটি যদি কারো শরীরে লুকায়িত আছে বলে সন্দেহ হয় তাহলে তার শরীর তল্লাশী করা যাবে।

মহিলা হলে মহিলা দ্বারা তল্লাশী করাতে হবে।{ফৌঃ কাঃ ১০২(৩) ধারা, ফৌঃ কাঃ ৫২ ধারা।}

৫। বে-আইনীভাবে তল্লাশী বা তল্লাশী কালে কাউকে হয়রাণী ও বিরক্ত করা যাবে না। {পিআরবি ২৬০ নিয়ম।}

৬। বাদীকে সঙ্গে রাখা যাবে না ।

৭। পরোয়ানায় উল্লেখিত বস্তু ব্যতীত অন্য কোন বস্তু হস্তগত করা যাবে না ।{ডিএমপি অধ্যাদেশ ৫১,৫২ ধারা।}

তল্লাশীর পরেঃ-

১। তল্লাশী করিয়া কোন বস্তু উদ্ধার হলে ৩ কপি জব্দ তালিকা তৈরি করে সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়ে বাড়ীর মালিককে এক কপি, কোটে এক কপি এবং থানায় এক কপি জমা দিতে হবে। {ফৌঃ কাঃ ১০৩(২),১০৩(৩) ধারা।}

২। তল্লাশী করিয়া কোন কিছু না পাওয়া গেলেও তিন কপি জব্দ তালিকা করে সাক্ষীদের স্বাক্ষর নিতে হবে।

৩। উদ্ধারকৃত মালামালের গায়ে লেবেল লাগাতে হবে। {পিআরবি ৩৭৯ (খ) নিয়ম।}

৪। তল্লাশী করার শেষে নিজের শরীর সাক্ষীদের সামনে পরীক্ষা করে দেখাতে হবে।

৫। তল্লাশী করার শেষে জব্দ তালিকা ছাড়া অন্য কোন মালামাল হস্তক্ষেপ করেন নাই তার একটি প্রাপ্তি স্বীকার বাড়ীর মালিক ও সাক্ষীদের নিকট হতে নিতে হবে।

উপরে উল্লেখিত কার্যক্রম এর ক্ষেত্রে বা তল্লাশীকালে অব্যশই ফৌঃ কাঃ আইনের ১০২,১০৩,১৬৫,১৬৬ ধারা, পিআরবি ২৮০ বিধি অনুসরণ করতে হবে।

উপরের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল যদি কোন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রচলিত আইনের বরখেলাপ করে তল্লাশি কার্য পরিচালনা করে তাহলে তার পরিণাম বা শাস্তি কি হবে সেই বিষয়টি। কিন্তু বর্তমানে রাস্তায় মোটরসাইকেল বা গাড়ি আটকিয়ে জনগণকে যেভাবে তল্লাশি করা হয় তা আদতে কতটুকু আইনসিদ্ধ সেটি আমার জানা নেই। এই প্রক্রিয়ায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তল্লাশির ক্ষেত্রে বেড়ে গেছে দুর্নীতি এবং মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন হচ্ছে মানবাধিকার।

 

 

লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কুমিল্লা



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon