জমির খাজনা দেবেন কখন ও কীভাবে?


প্রকাশিত :০৩.১২.২০১৬, ২:৫৮ অপরাহ্ণ

adv-siraj-pramanik-1অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

জমি থাকলে জমির খাজনা দিতে হবে সেটাই নিয়ম। নিয়মিত খাজনা প্রদানের মধ্য দিয়ে জমির প্রতি মালিকের অধিকার শক্ত হয় এবং মালিকানা প্রমাণে খাজনা প্রদানের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সব ধরনের জমিরই কি খাজনা দিতে হয়?

কোনো জমি ভোগদখলের সুবিধা গ্রহণের জন্য সরকারকে প্রতি শতাংশ জমির জন্য বছরপ্রতি যে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা প্রদান করতে হয় তাকেই ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা বলে। ১৯৭৬ সালের ভূমি উন্নয়ন কর বিধিমালার ৭ বিধি অনুসারে, নাগরিকের বেশকিছু খাজনাসংক্রান্ত অধিকার রয়েছে। যেমন : খাজনা প্রদান করে দাখিলা গ্রহণের অধিকার, খাজনা প্রদান করে দাখিলার মাধ্যমে জমির মালিকানা প্রমাণের অধিকার, যদি কোনো ব্যক্তি খাজনাসংক্রান্ত ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো আদেশে অসন্তুষ্ট হন সে ক্ষেত্রে আপিলের অধিকার ইত্যাদি।

১৯৭৬ সালের ভূমি উন্নয়ন কর বিধিমালা অনুসারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনা খাজনায় জমির ভোগদখলের অধিকার রয়েছে। প্রথমত ২৫ বিঘার কম জমি থাকলে, দ্বিতীয়ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি পর্যায়ে নিজে শারীরিক পরিশ্রম করে হাঁস-মুরগির খামার কিংবা ডেইরি ফার্ম হিসেবে কোনো জমি ব্যবহার করলে, তৃতীয়ত পাঁচটির কম হস্তচালিত তাঁত যদি কোনো জমির ওপর অবস্থিত হয় এবং তাঁতগুলো যদি জমির মালিক নিজে শারীরিক পরিশ্রম করে চালান, চতুর্থত যদি কোনো জমি প্রধানত প্রার্থনার স্থান অথবা ধর্মীয় উপাসনালয় অথবা সর্বসাধারণের কবরস্থান কিংবা শ্মশানঘাট হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে।

ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা প্রদানের বেশকিছু সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই অত্যন্ত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন এবং আইনি বিষয় সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ থাকার কারণে বিভিন্ন বিষয় অবহেলা করেন। এসবের মধ্যে খাজনা প্রদান একটি। কিন্তু তারা জানেন না যে খাজনা প্রদান করলে কী কী সুবিধা তারা ভোগ করতে পারবেন। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ফলে যে দাখিলা পাওয়া যায় ওই দাখিলা মালিকানা প্রমাণের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গণ্য হয়। ভূমি উন্নয়ন কর নিয়মিত প্রদান করলে রেকর্ড হালনাগাদ থাকে। নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করলে দুষ্ট লোকেরা ভুয়া রেকর্ডের সুযোগ নিতে পারে না। অনেক সময় একজন আরেকজনের জমি গোপনে নামজারি বা রেকর্ড করিয়ে নেন। জমির মালিক নিজের জমির খোঁজখবর না রাখার কারণে ভুয়া নামজারি বা মিউটেশনের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন না। ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ থাকলে জমি নিলাম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

ভূমি উন্নয়ন কর বার্ষিক ভিত্তিতে দিতে হয়। প্রতি বছরের ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা যথাসময়ে নিয়মিত পরিশোধ করলে কোনো সুদ দিতে হয় না। যদিও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) অন্য যে কোনো ধরনের করের তুলনায় কম, তবুও খাজনা বকেয়া পড়তে থাকলে সুদের হার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন করের ওপর ধার্যকৃত সুদের হার ৬.২৫ শতাংশ।

যদি ভূমি উন্নয়ন কর এক বছরের বকেয়া হয় সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাংলা সনের ৩০ চৈত্রের পরই ওই কর বকেয়া বলে গণ্য হবে এবং মূল পাওনাকৃত করের সঙ্গে ৬.২৫ হারে সুদ যোগ হবে এবং যত বছরের কর বাকি থাকবে তত গুণ সুদ বেশি হবে এবং মূল করের সঙ্গে যুক্ত হবে।

কৃষি জমির ক্ষেত্রে ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফ করে দেয়া হয়েছে। ২৫ বিঘার অধিক থেকে ১০ একর পর্যন্ত জমির প্রতি শতাংশ জমির জন্য ৫০ পয়সা করে। ১০ একরের বেশি হলে প্রতি শতাংশ জমির জন্য ১ টাকা হারে খাজনা দিতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ এলাকার আবাসিক জমির খাজনা কিছুটা ভিন্নরকম। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা মহানগরীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আবাসিক জমির জন্য খাজনা শতকপ্রতি ২২, জেলা সদরের (ঘনবসতি জেলা ছাড়া) পৌর এলাকার জমির জন্য খাজনার হার শতকপ্রতি ৭ এবং অন্যসব পৌর এলাকার আবাসিক জমির জন্য কর শতকপ্রতি ৬ টাকা।

পল্লী এলাকার আবাসিক জমির ক্ষেত্রে খাজনার হার ভিন্নরকম। ১৯৯০ সালের ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েলের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পল্লী এলাকায় বসবাসকারী কৃষি পরিবারের চাষের জমি এবং বসতবাড়ি কৃষি জমি হিসেবে গণ্য করে কৃষি হারে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করতে হবে। তবে পল্লী এলাকার পাকা ভিটির বাড়ির জন্য শতকপ্রতি ৫ টাকা হারে খাজনা দিতে হবে।

শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত ভূমির জন্য খাজনার হার যেভাবে নির্ধারিত হবে তা হলো যে পরিমাণ জায়গা শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয় তার খাজনা বাণিজ্যিক হারে আদায় করতে হবে। যে পরিমাণ জমি আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হবে তার খাজনা আবাসিক হারে আদায় করতে হবে। অব্যবহৃত বা পতিত জমির কর কৃষি হারে (১ টাকা প্রতি শতাংশ) আদায় করতে হবে ।

কর কর্তৃপক্ষের কিছু কাজ আপনার অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন : খাজনা প্রদানের পর দাখিলা/রসিদ প্রদান না করা, খাজনা প্রদান করে দাখিলার মাধ্যমে জমির মালিকানা প্রমাণে বাধা দেয়া, ২৫ বিঘার কম জমি থাকা সত্ত্বেও খাজনা দাবি করা, খাজনা মওকুফের জন্য দরখাস্ত গ্রহণ না করা, রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা হওয়ার আগে নোটিশ প্রদান করা ইত্যাদি। আপিলের মাধ্যমে এসব লঙ্ঘনের প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। ১৯৭৬ সালের ভূমি উন্নয়ন কর বিধিমালার ৭ বিধি অনুযায়ী, খাজনা প্রদানসংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে সমস্যা সৃষ্টি হলে থানা রাজস্ব কর্মকর্তা তথা সহকারী ভূমি কমিশনারের অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন করসংক্রান্ত কোনো প্রাথমিক দাবি সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির বা ভূমি মালিকের কোনো আপত্তি থাকলে আপত্তি দাখিল করা যাবে। ১৯৭৬ সালের ভূমি উন্নয়ন কর বিধিমালার ৭ বিধি অনুসারে আপত্তি দাখিল করতে হবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অথবা জেলা প্রশাসক (ডিসি)-এর কাছে। ১৫ দিনের মধ্যে এ আপত্তি দাখিল করা যাবে। জেলা প্রশাসকের আদেশে কোনো ব্যক্তি সন্তুষ্ট না হলে সে আদেশের বিরুদ্ধেও আপিল করা যাবে। এ ধরনের আপিলের জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে যেতে হবে। বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে কোনো ব্যক্তি সন্তুষ্ট না হলে সে আদেশের বিরুদ্ধেও আপিল করা যাবে ভূমি আপিল বোর্ডের কাছে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে।

 
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইন গ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক দৈনিক ‘সময়ের দিগন্ত’।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon