জনসচেতনতাই ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতকরণে অন্যতম ভূমিকা পালন করে


প্রকাশিত :০৪.১২.২০১৬, ১২:০৯ অপরাহ্ণ

parvejশেখ নোমান পারভেজ

প্রতিদিনই আমরা কিছু কিছু বিড়ম্বনার শিকার হই। এই যেমন আমরা প্রায়ই রেস্টুরেন্ট এ ত্রিশ টাকার বোতলজাত পানি পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনি এবং ষাট টাকার কোমল পানীয় একশো থেকে একশো বিশ টাকা দিয়ে কিনি। আবার কখনো কখনো মেয়াদ উত্তীর্ণ পন্য কিনে বিড়ম্বিত হই, পন্য ফেরত দিতে চাইলে করতে হয় অনেক বাক-বিতর্ক। এ রকম পন্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার আমরা প্রায়শই হয়ে থাকি, কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলে আর বেশীরভাগটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাই। নিরাপদ এবং ন্যায্যমূল্যে পন্য কিনতে পারাটা ভোক্তার অধিকার এবং তা আইন দ্বারা সংরক্ষিত। একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকই ভোক্তা। উন্নত দেশগুলোতে এ রকম ঘটনার তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা সরকারি ভাবে নেয়া হয় কেননা এই ঘটনা গুলোকে নাগরিকের অধিকার পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয়। আর আমাদের দেশে আইন থাকার পরও সেই তদারকি ব্যবস্থা খুবই নাজুক।

ভোক্তার অধিকার কি, বেশীরভাগক্ষেত্রে তা আমরা ভোক্তারাই জানিনা। ভোক্তার অধিকার সম্পর্কে যে সকল মাপকাঠি করা হয়েছে তাঁর মধ্যে রয়েছে, নিরাপদ নির্ভেজাল পণ্য বা সেবা পাওয়া, পণ্য বা সেবায় প্রতারণা শিকার হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া, পণ্যের মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে পণ্য পাওয়া, যথাযথ ওজনে এবং পরিমাপে যথাযথ পণ্য প্রতিশ্রুত অবস্থায় পাওয়া ইত্যাদি। ভোক্তাকে আইনি সুবিধা নিশ্চিত করতে আমাদের দেশে “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯” প্রচলিত আছে। এবং এই আইনের ধারা ২০ অনুযায়ী ভোক্তা অধিকার পরিপন্থীকার্যসমূহের মধ্যে রয়েছেঃ

নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোন পণ্য এবং ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করা

নকল এবংমেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় সাথে সাথে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকারক কোন দ্রব্য বা ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করা বা করতে প্রস্তাব করা

পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করা এবং ক্রেতাকে কোন পন্য বিক্রয়কালে পরিমাপে বা ওজনে ঠকানো

এই আইনের সাধারন ক্রেতা প্রতারিত পন্য ক্রয়ে প্রতারিত হলে প্রতারকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমান সাপেক্ষে রয়েছে সর্বনিম্ন একবছর থেকে সর্বোচ্চ তিন বৎসর কারাদন্ড,বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে৷একই আইনের ৪৬(৪) ধারা অনুযায়ী ভোক্তা কোন পন্য কিনে যদি প্রতারিত হন কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী তার অন্য কোন অভিযোগ প্রমানিত হলে তাহলে জরিমানার ২৫ শতাংশ নগদ টাকা অভিযোগকারীকে দেয়া হবে। এবং অভিযোগ ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার ত্রিশ দিনের মধ্যে ভোক্তা নিজেই কাওরান বাজারস্থ ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরে লিখিত দিয়ে কিংবাএসএমএস, ফ্যাক্স বা ই-মেইল যে কোনো মাধ্যমে অভিযোগ করতে পারেন তাছাড়া জেলা পর্যায়ে ম্যাজিষ্ট্রেট, বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তরে ভোক্তা অভিযোগ করতে পারবেন। এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে পণ্য মূল্যের ৫ গুন জরিমানা করার বিধান রয়েছে। শুধু তাই নয় “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯” এর পাশাপাশি পন্য নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে রয়েছে “মোড়কজাত বিধিমালা ২০০৭” যার ২০(৪) উপধারা মতে যেকোন মোড়কজাত পণ্যের দাম বাড়াতে হলে দুইটি দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে এবং নির্ধারিত ফি দিয়ে নতুন মোড়কের অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনিস্টিটিউটকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। বিভ্রান্তিকর এবং অসম ওজনে মোড়কজাত পণ্য বিক্রয় নিষেধ ও সনাতনী পাল্লা ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞাসহ রয়েছে বেশ কিছু নির্দেশনা। এই বিধিমালাতেও অভিযোগকারী অভিযোগ প্রমানিত হওয়া সাপেক্ষে পুরস্কৃত হবেন জরিমানার ২৫ শতাংশ নগদ টাকা। তা হলে আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে আইন ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে বেশখানিকটা সহায়ক। কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে নাগরিক তথা ভোক্তাকে প্রতারিত হতে দেখা যায়। কেননা আইনের যদি সঠিক ব্যাবহার না হয় তাহলে আইনের সুফল কোনভাবেই পাওয়া সম্ভব নয়। ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এসকল আইনে প্রয়োগে নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কি অভিযোগ করবেন, কোথায় অভিযোগ করবেন বা অভিযোগ করে আদৌ কোন লাভ হবে কি না এসব সংক্রান্ত পরিষ্কার ধারনা না থাকায় প্রতারণার শিকার ভোক্তা প্রতারণাগুলো সাবলীল ভাবে এড়িয়ে চলে যান। আবার অনেক সময় বিষয়টি তুচ্ছ মনে করেও অভিযোগ করতে চান না। এতে করে শুধু ভোক্তার অধিকার প্রেক্ষাপটে হওয়া প্রতারণা প্রশ্রয়ই দেয়া হয় না সাথে সাথে প্রতারককে ভবিষ্যতে বড়ধরণের চুরি করার সুযোগও করে দেয়া হয়। যার মধ্যে অন্যতম হিসেবে রয়েছে মুল্য সংযোজন কর ফাকি, ভোক্তা তাঁর নিজস্ব গাফলতির জন্য অনেক সময় ভ্যাট চালান নেন না, যার ফলে বিক্রেতা সুযোগ পান মুল্য সংযোজন কর ফাঁকি দিয়ে কালো টাকার পাহাড় গড়ার।

আইনের সুফল সব সময় নাগরিকের জন্যই এবং সেই আইনের সুফল ভোগ করার জন্য নাগরিককেই সচেতন হতে হয়, তা না হলে অসাধু শ্রেনী অন্যায় ভাবে সুবিধা নিবে এটাই স্বাভাবিক। শুধুমাত্র প্রতিবছর ১৫ই মার্চ আন্তর্জাতিক ভোক্তা অধিকার দিবসে উৎসবের রূপে পালন করলেই চলবে না সাথে সাথে গড়ে তুলতে হবে শক্ত জনসচেতনতা। শুধুমাত্র আইন এবং অধিদপ্তর থাকলেই চলবে না,সরকারি এবং বেসরকারিভাবে শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত করতে হবে সচেতনতা মুলক প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাম্পেইনিং সাথে সাথে ইউনিয়ন পর্যায়ে আয়োজন করতে হবে প্রচারণা কিংবা পথনাট্য, যাতে করে প্রতিটি নাগরিক একজন ভোক্তা হিসেবে এই মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। কাজেইভোক্তা অধিকার নিশ্চিতকরণে আইন প্রয়োগ, প্রশাসন এনং নাগরিককে একই মাত্রায় কাজ করতে হবে এবং তাঁর মধ্যে নাগরিক তথা ভোক্তার ভুমিকা হবে অন্যতম নিয়ামক।

 

 

 

লেখক: শিক্ষার্থী, স্কুল অব ল’ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon