জরিপের আগে ও পরে ভূমি মালিকের করণীয়


প্রকাশিত :০৮.১২.২০১৬, ৫:৫৪ অপরাহ্ণ

adv-soyeb-rahmanসোয়েব রহমান

ভূমি আইন ভূমি (Land) সম্বন্ধে ধারণা:

আমরা সাধারণ ভাষায় ভূমি বলতে আবাদি কিংবা অনাবাদি জমিকেই বুঝি। কিন্তু ভূমি বা জমি কথাটির অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। ভূমি বলতে যা বুঝানো হয়েছে তা হলো, যে ভূমি আবাদি, অনাবাদি অথবা বসতের, যে কোন সময় জল দ্বারা নিমজ্জিত থাকে এবং ভূমি/জমি হতে উত্পন্ন সুবিধাদি সহ, বাড়ী ঘর দালান কোঠা ভূমির সাথে সংযুক্ত বস্তু সমূহ অথবা জমির সাথে সংযুক্ত কোন বস্তুর সাথে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ রয়েছে এমন বস্তু বা বস্তুসমূহকে ভূমির অর্ন্তভূক্ত বা ভূমি বলে গণ্য। সাধারণভাবে সকল আবাদি ও অনাবাদি ভূমি এবং নদনদী, খাল-বিল, নালা- ডোবা, পুকুর, বাড়ীঘর, দালান কোঠাসহ যা ভূমির সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত রয়েছে, তাকেই ভূমি বলে গণ্য হবে। তবে কোন সাগর বা উপসাগরকে ভূমি বলে গণ্য করা হবে না। (স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্ট ১৯৫০-এর ২ ধারার ১৬ দফা মতে)

জমি সংক্রান্ত বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর । বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে উচ্চ বিত্ত কিংবা উচ্চ শিক্ষিত মানুষও ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের জমির উপর তাদের স্বত্ব আছে কিনা কত পরিমাণ স্বত্ব আছে সেই হিসাব বুঝে নেয়ার জন্য সব সময়ই সজাগ । যেহেতু জমির স্বত্বের হিসাবের ব্যাপারে প্রত্যেকটি মানুষই খুব সজাগ তাই জমির পরিধি নিয়ে বা পরিমাপ নিয়ে নানা ধরনের সমস্যার উদ্ভব হয়৷ এই সমস্যা সমাধানের জন্য জমির সঠিক জরিপ খুবই প্রয়োজন।

ভূমি জরিপ কি:

১৮৭৫ সালের Servey Act এবং ১ঌ৫৭ সালের Technical Rules অনুযায়ী, জরিপ তথা ইংরেজী Survey শব্দটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে । ভূমি জরিপ বলতে বিভিন্ন মৌজা তথা গ্রাম বা সীমানা ভিত্তিক নকশা (Map) তৈরি বা জমির মালিকানা সংক্রান্ত পুরাতন রেকর্ড পর্যালোচনা বা যাচাই বাছাইকে বুঝায় । অর্থাত্‍ সহজ ভাষায় জরিপের সময় পুরাতন তৈরীকৃত নকশা (Map) ও রেকর্ড সংশোধন করা এবং জমির আকৃতি ও প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে থাকলে অর্থাত্‍ মালিকানার পরিবর্তন হয়ে থাকলে সেই মোতাবেক সামঞ্জস্য রেখে মৌজা বা সীমানার মধ্যে জমির নকশা (Map) এবং কাগজ পত্রের রেকর্ড তৈরি করাকে বুঝায় ।

জমি জরিপ হওয়ার পূর্বে জরিপের বিষয়ে জানার অধিকার

# জমি জরিপ হওয়ার পূর্বে জরিপের বিষয়ে জানার অধিকার (যেমন-মাইকিং, ঢোল সহরত অথবা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে) {১৮৭৫ সালের সার্ভে আইনের ৫ ধারা এবং ১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ২৯ ধারা}

# রেকর্ডের ভুল সংশোধনের জন্য আপিল করার অধিকার।{১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ৩১ ধারা}

# চূড়ান্ত রেকর্ডের উদ্দেশ্যে যখন প্রকাশনার কাজ চলে তখন পুনরায় পর্যবেক্ষণের অধিকার।

# রেকর্ডের মূদ্রিত কপি ও নকশা সংগ্রহের অধিকার।

# জরিপের খসড়া সংশোধনের জন্য ভুমি প্রশাসন অফিস/সেটেল্টমেন্ট অফিস থেকে ৩০ কার্য দিবস সময় পাবার অধিকার।{১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ৩০ ধারা}

# কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীগণের নাম নতুন করে রেকর্ড করে নেয়ার অধিকার।

# রেকর্ডের মূদ্রিত কপি পাওয়ার পর তা সংশোধনের অধিকার।

# চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশনার পরও যদি কোনো ভূল ত্রুটি থাকে তাহলে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে মামলা করার অধিকার। {১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্টের ১৪৫ (ক) ধারা}

# ভূমি জরিপ আপিলেট ট্রাইবুনালে আপিল করার অধিকার। {১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্টের ১৪৫ (খ) ধারা}

# বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার অধিকার। {১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্টের ১৪৫ (গ) ধারা}

লঙ্ঘন

# জমি জরিপ হওয়ার বিষয়ে না জানানো ৷

# রেকর্ড সংশোধনের জন্য সময় ও সুযোগ না দেওয়া ৷

# চুড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশনার কাজ চলার সময় পর্যবেক্ষণের সুযোগ না দেওয়া ৷

# রেকর্ডের মুদ্রিত কপি ও নকশা সংগ্রহ করতে চাইলে তা প্রদান না করা ৷

# কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার উত্তরাধিকারী গণের নামে জমি রেকর্ড করিয়ে নেওয়ার সুযোগ না দেয়া ৷

# রেকর্ডের মুদ্রিত অংশের কপি পাওয়ার তা সংশোধনের সুযোগ না দেওয়া ৷

# চুড়ান্ত প্রকাশনার পরও যদি কোনো ভুল থাকে তাহলে ভুমি জরিপ ট্রাইবুনালে মামলা করতে বাধা দেওয়া ৷

প্রতিকারের জন্য কোথায় যেতে হবে?

ভূমি জরিপ সংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে কোন সমস্যা হলে প্রথমে ভূমি জরিপ কারী আমিনের সংগে যোগাযোগ করে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে ৷ যদি সমাধান না হয় তাহলে থানা ভূমি সেটেল্টমেন্ট অফিসারের অফিসে গিয়ে জরিপ সংশোধনের জন্য লিখিত দরখাস্ত দাখিল করতে হবে ৷ (১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব বিধিমালার ৩০ ধারা) ।

আপত্তি দাখিলের সময়সীমা

ভূমি জরিপের খসড়া প্রকাশের পর ৩০ দিনের মধ্যে ৷ (১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব বিধিমালার ৩০ ধারা) ।

ভূমি জরিপ চলাকালে ভূমি মালিকদের করণীয়

ভূমি মালিকের জন্য ভূমি বা জমি জরিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জমি জরিপের সময় জমির মালিকানার উপর ভিত্তি করে জমি রেকর্ড তথা খতিয়ান বা স্বত্ব লিপি তৈরি করা হয়। সাধারণত কোন এলাকায় জমি জরিপ শুরু হওয়ার আগে ভূমি প্রশাসন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সেই এলাকার জনগণকে অবহিত করেন অনেক সময় ভুমি প্রশাসন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে মাইক দ্বারা মাইকিং করে জরিপের ব্যাপারে জনগণকে নিশ্চিত করেন। তারপর পূর্ব ঘোষিত নির্দিষ্ট তারিখ অনুযায়ী ভূমি প্রশাসনের কর্মী তথা সার্ভে কর্মকর্তা বা আমিন গন জমির মালিকের সহায়তায় তাদের জরিপের কাজ শুরু করে দেন। এক্ষেত্রে জমির মালিকগণের যে কাজটি পূর্বেই করে রাখতে হবে তাহলো তাদের নিজস্ব জমির সীমানা নির্ধারণ করে রাখা, এতে জমি জরিপের সময় নিজে অথবা জমির মালিকের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি (যেমন ছেলে) জরিপ কর্মচারী বা আমিনদেরকে জরিপ কাজে সহায়তা করবে। জমির মালিককে সংশ্লিষ্ট জমি অর্থাত্‍ যে জমির জরিপ কাজ শুরু হবে সেই জমির আগের রেকর্ডের পর্চা বা দলিল দস্তাবেজ নিয়ে মালিক বা তার অভিজ্ঞ এবং বিশ্বস্ত প্রতিনিধি মাঠে হাজির থেকে জরিপকারীর নিকট যথাযথভাবে উপস্থাপন করে নাম রেকর্ড করে নিতে হবে। যদি কোন পুরাতন রেকর্ড থাকে এবং সাবেক রেকর্ডের মালিক মারা গিয়ে থাকেন তাহলে তার উত্তরাধিকারীগণ তাদের নাম ঠিকানা বর্ণনা করে নতুন করে নাম রেকর্ড ভুক্ত করতে আমিনকে সাহায্য করতে হবে। (১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব বিধি মতে) ।

চূড়ান্ত (Final) রেকর্ড প্রকাশের পূর্বের কাজ

জমির মালিকদের জমি জরিপ হয়ে যাওয়ার পর চূড়ান্ত রেকর্ডের উদ্দেশ্যে যখন প্রকাশনার কাজ চলে তখন পুনরায় পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়া হয়। সরকারী নির্ধারিত মূল্য দিয়ে জমির মালিকগণ ইচ্ছা করলে মূদ্রিত খতিয়ানের কপি ও নক্সা ক্রয় করে কোথাও কোন ভুল আছে কিনা তা দেখতে পারবেন। মূদ্রিত তথা খসড়া খতিয়ানের কপি সংগ্রহের পর যদি কোন নামের, গাণিতিক, পরিমান, করণিক বা মূদ্রণ জনিত ভুল অথবা কোন জালিয়াতি বুঝা যায় তাহলে সেটেলন্টমেন্ট অফিসে গিয়ে তা সংশোধনের জন্য দরখাস্ত পেশ করতে হবে। উক্ত দরখাস্ত পাওয়ার পর সেটেলমেন্ট অফিসার তদন্ত করবেন এবং কোনরূপ ভুলের প্রমাণ পেলে তিনি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারির পূর্বে বিধি মোতাবেক সংশোধন করবেন। সুতরাং জমির জরিপ সংক্রান্ত ব্যাপারে জরিপ চলাকালীন সময় থেকে জরিপ কার্য শেষ হওয়া পর্যন্ত মধ্যবতী সময়ে রেকর্ড সংক্রান্ত কোনরূপ সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি সাথে সাথে সেটেলমেন্ট অফিসার/সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর দৃষ্টি গোচরে নিয়ে আসতে হবে। (১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব বিধির ৩০ ধারা) ।

জমি রেকর্ডের খসড়া প্রকাশনার পর করণীয়

প্রজাস্বত্ত বিধি অনুযায়ী জরিপ শেষ হওয়ার পর ভূমি রেকর্ডের খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর জমির মালিকদের বা তাদের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের জন্য ৩০ কার্য দিবস খোলা রাখা হয় ৷ এই খসড়া রেকর্ডে যদি কোন ভুল ত্রুটি ধরা পড়ে তাহলে ৩০ ধারা মোতাবেক আপত্তি দাখিল করতে হবে, যাকে লোক মুখে Dispute বলে ৷ ৩০ ধারায় আপত্তি দাখিলের পর উক্ত আপত্তি বা Dispute মামলার রায় যার বিপক্ষে যাবে সে ব্যক্তি প্রয়োজন মনে করলে উক্ত রায়ের দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আইন অনুযায়ী আপিল দায়ের করতে পারবেন৷ এক্ষেত্রে আপিল দায়েরকারীকে তার দাবীর স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সাক্ষী আদালতে হাজির করতে হবে ৷ (১৯৫৫ সালের প্রজাস্বত্ব বিধির ২৯, ৩০, ৩১ ধারা) ।

ভূমি জরিপ চূড়ান্ত প্রকাশনার পর কোথায় যেতে হবে?

ভূমি জরিপের পর জরিপের চূড়ান্ত প্রকাশনার পর যদি কোনো ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হন তাহলে ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের করতে হবে ৷ {১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এক্টের (সংশোধনী ২০০৪) এর ১৪৪, ১৪৫ (ক) ৬ ধারা}

ভূমি জরিপ ট্রাইবুনাল ও ভুমি জরিপ আপিলেট ট্রাইবুনাল এর মাধ্যমে প্রতিকার

বাংলাদেশের জমি সংক্রান্ত বিষয়াবলীর মাধ্যমে সৃষ্ট বিভিন্ন বিরোধের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ সরকার ২৭শে ফাল্গুন ১৪১০ মোতাবেক ১০ই মার্চ ২০০৪ ইং তারিখে The State Acquisition and Tenancy Act (1950 xxviii of 1951) এর সংশোধনী এনেছেন। উক্ত আইনের ১৪৫ (ক) ধারায় ভূমি জরিপ ট্রাইবুনাল (Land Survey Tribunal) গঠন করার কথা বলা হয়েছে, সরকার প্রয়োজন মনে করলে অনেক ভূমি জরিপ ট্রাইবুনাল গঠন করতে পারবে। উক্ত আইন (সংশোধনী ২০০৪) এর ১৪৫ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, ভূমি জরিপের চূড়ান্ত প্রকাশনার পর যে সকল সমস্যা উদ্ভবের ফলে মামলার সৃষ্টি হবে সেগুলি সরাসরি ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। উল্লেখ্য যে ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালের বিচারক হবেন একজন যুগ্ম জেলা জজ।

মামলা করার সময় সীমা

উক্ত আইন (সংশোধনী ২০০৪) এর ১৪৫ (ক) ৬ দফাতে বলা হয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তি ১৪৪ ধারা মোতাবেক চূড়ান্ত প্রকাশনার পর অসন্তুষ্ট হন তাহলে তাকে চূড়ান্ত প্রকাশনার তারিখ হতে ১ বছরের মধ্যে ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের করতে হবে।

তবে বাদী যদি তার দেরীর সংগত কারণের কথা ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালকে বুঝাতে সক্ষম হন কিংবা সন্তষ্ট করতে সক্ষম হন তাহলে উপরোক্ত ১ বছর পরেও ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালে চুড়ান্ত জরিপ সংক্রান্ত প্রকাশনা সংশোধনের জন্য মামলা করতে পারবেন।

যদি কোন ব্যক্তি ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালের রায়ে সন্তুষ্ট না হন তাহলে এই আইনের ১৪৫ (খ) (৫) ধারা মোতাবেক ভূমি জরিপ ট্রাইবুনালের রায়, ডিক্রি অথবা আদেশ প্রদানের তারিখ হতে ৩ মাসের মধ্যে ভূমি জরিপ আপিলেট ট্রাইবুনালে আপীল করতে পারবেন।

এই আইনের ১৪৫ (গ) ধারায় বলা আছে যে যদি কোন ব্যক্তি ভূমি জরিপ আপিলেট ট্রাইবুনালের রায়েও সন্তুষ্ট না হন তাহলে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে আপীল দায়ের করতে পারবেন।

 

 

লেখক: আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কুমিল্লা।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon