দীর্ঘ বিবাহিত জীবনেও বাড়ছে যৌতুক ও নির্যাতন, কমছে মামলা


প্রকাশিত :০৮.১২.২০১৬, ৫:২৬ অপরাহ্ণ

nari-nirjatonছয় বছর আগে কেন্দুয়ার সাধু রহমতের ছেলে দোয়াদ বিয়ে করেন একই এলাকার রেবেকাকে। কিন্তু তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি কাবিন নেই। বিয়ের পর সেলিম ও জাহিদ নামে তাদের দুই সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই স্বামী দোয়াদ রেবেকার ওপর বিভিন্ন নির্যাতন চালালেও  বাবার বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা বা কিছু আনতে এতদিন কোনও চাপ দেননি। হঠাৎ করে যেন অচেনা হয়ে যান দোয়াদ। ভিন্ন এক চরিত্রে আবির্ভুত হন তিনি। এবার বাবার বাড়ি থেকে মোটা অংকের টাকা এনে দেওয়ার জন্য তিনি স্ত্রীর ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। রেবেকা অস্বীকৃতি জানালে স্বামী ও তার বোন রেবেকার ওপর শারিরীক নির্যাতন শুরু করেন। নির্যাতন চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। পরে একদিন এতোটাই আহত করে ফেলেন যে, রেবেকাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করাতে হয়।

সাভারের শাহিনা (ছদ্মনাম) গত অক্টোবরে এসেছেন ঢামেক-এর ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে। তিন বছরের ছেলে সন্তানের মা শাহিনাকে পিটিয়ে স্বামী রমিজ সারা শারীরে কালসিটে দাগ ফেলে দিয়েছেন। শাহিনার মা একজন গৃহকর্মী। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সময় সাধ্যমতো  উপহার দিয়েছি। তিন বছর পর এখন সে আবারও যৌতুক চায়। একলাখ টাকা আমি কোথা থেকে পাবো! আর পেলেই বা কী, তাকে টাকা না দিলে আমার মেয়েকে এভাবে মেরে ছাল তুলে নেবে? আমি এর বিচার চাইব না।’

ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কর্মকর্তারা জানান, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার নারীরাই এখানে বেশি ভর্তি হন। কিন্তু সেসব কেস স্টাডি নিতে গিয়ে দেখা যায়, বিয়ের অনেক দিন হয়ে গেছে, সন্তানও জন্মেছে, অথচ এখন কিনা বিয়ের সময়কার যৌতুক চেয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। এছাড়া,সন্তানের জন্য কিছু করার কথা বলে মানসিক নির্যাতন ও পরে মারধর করার ঘটনা বেশি ঘটছে। এটা আরও শঙ্কার বিষয়। কারণ, বিয়ের আগের যৌতুক চাওয়ার সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সাংসারিক জীবনের পর যৌতুক চাওয়া প্রতিরোধে নারীর অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে সমাজে কোনও কাজ হয়নি।

dowryআইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যৌতুকের ১৯৩ ঘটনার মধ্যে ৭২টিতে মামলা হয়েছে। আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৪০ জন। কিন্তু মামলা হয়েছে মাত্র ৫৭টি।

এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতির ‘বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হন ৩৯২ জন নারী। এরমধ্যে হত্যা করা হয় ১৯২ জনকে। আর আত্মহত্যা করেছেন ১৮ জন।

কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করে নারী নেত্রীরা জানান,বিয়ের সময় যৌতুক নেওয়ার মানসিকতা সংখ্যাগতভাবে কমেছে। এটা হতে পারে যৌতুক চাওয়ার ধরণ পাল্টে যাওয়ার কারণে। উপহার ও মেয়ের অধিকার এসব কথা বলে পারস্পরিক বিনিময় চলে আসছে। কিন্তু বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ সময় পার করার পর যৌতুক চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এতে করে নির্যাতনও বেড়েছে। ফলে স্ত্রীর আইনি প্রক্রিয়ায় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রবণতা  কমেছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বহু বছর থেকেই যৌতুক নেওয়ার প্রবণতা চলে আসছে। এই কারণে এখন নারী নির্যাতনের মাত্রাও অসহনীয়ভাবে বেড়েছে। কিন্তু বিচারের দ্বারে পৌঁছানোর প্রবণতা তখনই কমে যাচ্ছে, যখন যৌতুকের দাবি বিয়ের ৬/৭ বছর পর হচ্ছে। তখন নারী তার সন্তানের কথা ভেবে সহজে স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চান না।’

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যৌতুক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা বাৎসরিক প্রতিবেদন করি। কিন্তু বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। আর এসব ক্ষেত্রে মামলা হলেও শতভাগ মামলাই পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে শেষ হয়ে যায়। যদি না বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।’

রোকেয়া কবির আরও বলেন, ‘লোকলজ্জা, ভয়ভীতি, মামলা করার সামর্থ্য না থাকার মতো বিষয়গুলোর কারণে দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের মধ্যে নির্যাতনের শিকার নারীরা এসব মেনে নিয়েই সংসারে টিকে থাকতে চান। ফলে যৌতুকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধের ধরণ বদলানো জরুরি। বিয়ের আগের যৌতুক চাওয়া নিয়ে সমাজকে সচেতন করা গেছে। কিন্তু দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের পর এধরনের ঘটনার প্রতিরোধ নিয়ে তেমন কোনও কাজ নেই।’ সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

 

ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম ডেস্ক



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon