নির্বাহী ও বিচার বিভাগে টানাপোড়েন


প্রকাশিত :১৩.১২.২০১৬, ১:২৯ অপরাহ্ণ

bicar-o-nirrbahi-bivagঅধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধির গেজেট নিয়ে শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত থেকে কয়েক দফায় সময় নিয়েও শৃঙ্খলা বিধির প্রজ্ঞাপন জারি করেনি আইন মন্ত্রণালয়। সে কারণে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে সোমবার (১২ ডিসেম্বর) স্ব-শরীরে আদালতে হাজির হতে বলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

এদিকে রবিবার (১১ ডিসেম্বর) আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র ইস্যু করা হয়। যাতে উল্লেখ করা হয়, অধস্তন আদালতের বিচারকগণের জন্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রস্তাবিত আচরণ বিধি ও শৃঙ্খলা বিধির খসড়া গেজেটে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা নেই মর্মে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সানুগ্রহ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।

রাষ্ট্রপতির এমন সিদ্ধান্তের পরদিনই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ বিষয়ে শুনানিকালে জানিয়ে দেন, ‘রাষ্ট্রপতিকে ভুল বুঝানো হয়েছে’। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা কোনো আপোষ করবেন না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন নির্বাহী বিভাগ সবসময়ই বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। তবে এই টানাপোড়েনের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত বিচার বিভাগের পুরোপুরি স্বাধীনতা অর্জিত হবে।

মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক করে চারটি বিধিমালা গেজেট আকারে জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান এবং চাকরির অন্যান্য শর্তাবলী) বিধিমালা, ২০০৭ একটি।

যেখানে বলা হয়েছে পৃথক বিধি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধান করা হবে ১৯৮৫ সালের গভর্নমেন্ট সার্ভিস রুলস অনুযায়ী।

সেই পৃথক বিধিমালার একটি খসড়া তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টের মতামতের জন্য পাঠায়। খসড়া বিধিমালা কিছু সংশোধন করে আবারও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেই বিধিমালাটি গেজেট আকারে জারি নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে শুনানি চলছে সর্বোচ্চ আদালতে। রাষ্ট্রপক্ষ বিধিমালা জারি করতে বারবার সময় নিয়েছে। চলতি বছর আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত সরকার অন্তত চারবার সময় নিলেও গেজেট আকারে তা জারি করা হয়নি।

এ কারণেই গত ৮ ডিসেম্বর আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হককে ১২ ডিসেম্বর স্বশরীরে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।

তবে এর ঠিক একদিনে আগে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ‘প্রস্তাবিত আচরণ বিধি ও শৃঙ্খলা বিধির খসড়া গেজেটে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা নেই মর্মে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সানুগ্রহ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন’ মর্মে পরিপত্র ইস্যু করা হয়।

রাষ্ট্রপতির এ সিদ্ধান্ত জানানোর পরই এ নিয়ে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। সোমবার সকালে আপিল বিভাগ বিধি নিয়ে তাদের আপোষহীন মনোভাবের কথা জানিয়ে দেন।

আপিল বিভাগের তলবের প্রেক্ষিতে সোমবার সকালে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব আদালতে উপস্থিত হন। নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ মিনিট বিলম্বে সোয়া ৯টার দিকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৮ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়।

শুরুতেই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ্য করে আপিল বিভাগ বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি আপনি অবহিত করবেন। গেজেট নিয়ে আসার জন্য আমরা দুই সচিবকে ডেকেছি। কেন তারা গেজেট নিয়ে আসতে পারেননি, সেই ব্যাখ্যা তাদেরকে দিতে হবে।

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আইন মন্ত্রণালয় একটি চিঠি দিয়েছে। রেজিস্ট্রার জেনারেলকেও এর অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।

তখন আদালত বলেন, এ ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমাদের একটি আবেদন রয়েছে। এ সময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে আবেদনটি পড়তে বলেন।

তখন অ্যাটর্নি জেনারেল গেজেট প্রসঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রটি পড়ে শোনান।

আদালত বলেন, আমরা তো খসড়া বিধিমালার কোনো প্রস্তাব দেইনি। সরকার শৃঙ্খলা বিধিমালার খসড়া সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়েছে। ওই খসড়ার সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা বিধিমালার কোনো পার্থক্য নেই। তাই সরকার যে খসড়া পাঠিয়েছিল আমরা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে তা সংশোধন করে দিয়েছি মাত্র। রাষ্ট্রপতিকে ভুল বোঝানো হয়েছে। এরকম করলে সরকার চলে? আপনারাই তো এটা পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্টের কাছে। এতো বড় বিল্ডিং (সচিবালয়), কিভাবে এটা কাজ করে?

আদালত বলেন, আমরা কাঁদব না হাসব কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ল’ মিনিস্ট্রিতে কি কোনো মন্ত্রী নাই? সরকারের ৮০/৯০ ভাগ মামলাই তো এই কোর্টে আসে। আমরা তো সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী নই। আমরা চাই রাষ্ট্রের একটি অঙ্গের সঙ্গে আরেকটি অঙ্গ ভারসাম্য রক্ষা করে চলুক, এর বেশি কিছু না।

রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে যারা পরিপত্র জারি করিয়েছে তাদের সম্পর্কে আদালত বলেন, মন্ত্রণালয়ে যারা আছে তাদের সামান্যতম জ্ঞান থাকলে এ ধরনের চিঠি ইস্যু করতো না। আমাদের কাছে কোনো ইস্যু নাই। আপনারা যেটা করে দিয়েছেন সেটা সমাধান করছি। এটা নিয়ে ৫ বছর প্রক্রিয়া চলার পর এখন বলছেন প্রয়োজন নাই। সব জিনিষগুলো কেমন জানি আপনারা ‘ধুম্রজাল’ সৃষ্টি করছেন।

এরপর আদালত দুই সচিবকে ডাকেন। তখন দুজনই ডায়াসের সামনে গিয়ে দাড়ান। শুরুতে আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং উইংয়ের সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, আইনের খসড়া প্রণয়ন এই বিভাগ থেকে করা হয়।

আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক বলেন, আপনাদের সংশোধিত খসড়া রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। এরপর যে সিদ্ধান্ত এসেছে তার ভিত্তিতে এই পরিপত্র জারি করা হয়েছে।

পরিপত্র জারিতে রাষ্ট্রপতিকে ভুল বুঝানো হয়েছে উল্লেখ করে আপিল বিভাগ বলেন, প্রস্তাবটা কিন্তু আপনাদের। আমরা চেয়েছি ওটা মাসদার হোসেন মামলার আলোকে করতে। মাসদার হোসেন মামলার ৭ নম্বর নির্দেশনায় বিধির কথা রয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিষয়ে উল্লেখ করে আপিল বিভাগ বলেন, আপনারা যেটা পাঠাবেন রাষ্ট্রপতি তো শুধু হ্যা বা না বলবেন। সংসদীয় পদ্ধতিতে তো রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নামমাত্র। শুধু প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি কোনো কিছুই একা করতে পারেন না। আপনারা ফাইলটা যেমন করবেন উনি সেভাবে করেছেন।

তখন আইন সচিব বলেন, উপর থেকে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই করা হয়েছে। আমরা তো এর বাইরে যেতে পারি না।

জবাবে আদালত বলেন, আপনি তো বিচার বিভাগের লোক। আপনাকে ওই পদে রাখা হয়েছে (নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের) সমন্বয়ের জন্য। কিন্তু আপনি ভুল করছেন, আপনাকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। যেমনটি হাবিবুল আউয়ালের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল।

তখন আইন সচিব বলেন, আপনারা যে আদেশ দেবেন তা বাস্তবায়ন করব।

এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রীসহ বিভিন্ন উর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। রাতে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলো, আমি বিচারাধীন বিষয় বলে কোনো বক্তব্য দেইনি।

আদালত বলেন, সাংবাদিকদের এর মধ্যে টেনে আনছেন কেন? এই শৃঙ্খলা বিধিমালার সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি জড়িত। কথায় আছে যার হাতে খড়গ থাকে তার কথায় চলতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে কোন আপোষ নেই।

অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে আদালত বলেন, মাসদার হোসেন মামলার রায় আপনারা মেনে নিয়েছেন। রায়ের ৮০ ভাগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ১৫ জানুয়ারি এটা আপনি গেজেট করে আসবেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে বলেন, এই বার্তাটি তো পৌঁছে দিতে হবে। তাই আরো সময় দরকার।

তখন আদালত বলেন, এক মাস সময় অনেক। এটা করতে কেবিনেটের সিদ্ধান্ত লাগবে না। এটা করে দিলে সরকারের পতন হবে না। পার্লামেন্টেও যেতে হবে না। মাসদার হোসেন মামলার রায় সরকার মেনে নিয়েছে। আমরা এখান থেকে পেছনে ফিরব না।

আদালত বলেন, মাসদার হোসেন মামলার রায় দুইবার রিভিউ হয়েছে। সংবিধানেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা আছে। আমাদের প্রস্তাবে কোনো ভুল থাকলে পয়েন্ট আউট করে নিয়ে আসবেন।

আপিল বিভাগের এই পর্যবেক্ষণের পর অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা নিয়ে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে সেকথা স্বীকার করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। এর মধ্য দিয়েই বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীন হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের কাছে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সোমবার দুপুরে আদালতের আদেশের পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় শাহদীন মালিক বলেন, এটা বিচারাধীন, তাই এ নিয়ে বলব না। তবে এতোদূর বলা যায়, আমরা যেটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং স্বাধীন করার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলছে। সারা দুনিয়াতেই নির্বাহী বিভাগরা বিচার বিভাগকে সহজে স্বাধীন হতে দিতে চায় না। ওইভাবে আমাদেরও নির্বাহী বিভাগ চেষ্টা করছে যাতে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ যাতে স্বাধীন না হয়। তবে গণমাধ্যম, আইনজীবী ও জনগণের সমর্থনে আজ হোক কাল হোক আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন হবেই।

আর শৃঙ্খলা বিধি নিয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার চেয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সোমবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের ল’ রিপোর্টার্স ফোরামে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, এটা করার প্রয়োজন নাই। যা সমগ্র জাতিকে হতাশ করেছে। বিচারকদের শৃঙ্খলা ও আচরণ সংক্রান্ত বিষয় আইন মন্ত্রণালয় তথা নির্বাহী বিভাগ থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে। যেটা সংবিধান ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি। রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন। মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের অনুরোধ জানাচ্ছি।

তবে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে টানাপোড়েনের কথা অস্বীকার করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সোমবার আদালত থেকে বেরিয়ে নিজ কার্যালয়ে তিনি বলেন, কোনোমতেই শাসন বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগ মুখোমুখি অবস্থাতে দাঁড়াতে চায় না এবং কোনো সময় দাঁড়ায়ওনি। সমস্ত বিষয় যেন সাংবিধানিক আলোকে ও মাসদার হোসেন মামলার আলোকে নিস্পত্তি হয় এবং বিচার বিভাগ যাতে সুষ্ঠুভাবে স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রের দুটি অঙ্গের মতো ভালোভাবে দাঁড়াতে পারে সেটাই আদালত বলেছেন।

আর গেজেট প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের দাবি, আদালত ১৫ জানুয়ারির মধ্যে গেজেট জারির কোনো নির্দেশ দেননি। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৫ জানুয়ারি দিন ধার্য্য করেছেন। সূত্র: দ্য রিপোর্ট

 

 

ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম ডেস্ক



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon