মানবাধিকার রক্ষায় বিচার বিভাগের ভূমিকা


প্রকাশিত :১৭.১২.২০১৬, ২:১৫ অপরাহ্ণ

dr-kamal-hossainকামাল হোসেন

১. পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ: ঔপনিবেশিক সমাজ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র

আমাদের বর্তমান ইতিহাস শুরু হয় স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় থেকে। যে সমাজ থেকে এর জন্ম, সেটা তখনো ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। স্বাধীনতার মধ্যে ছিল সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার। ঔপনিবেশিক সমাজে সামন্ত আধিপত্য পরম্পরা ছিল, তার সঙ্গে ছিল পৃষ্ঠপোষক-সুবিধাভোগী সম্পর্ক এবং সম্পদ, শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্য। সকলের পক্ষে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকার পাওয়া ছিল অসম্ভব, ফলে আত্মবিকাশের সমান সুযোগ ছিল না। উত্তর-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ওপর একজন নৃবিজ্ঞানী ধ্রুপদি কাজ করেছেন, যার শিরোনাম হচ্ছে ‘ফ্রম সাবজেক্ট টু সিটিজেন’। ঔপনিবেশিক সমাজে ব্যক্তিমানুষ ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসকের প্রজা, শাসকের ভাইসরয় সংবিধানের আওতার বাইরে সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করতেন। ফলে প্রজাদের মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তাঁদের ছিল না। একইভাবে সেই সমাজের প্রজারা তাদের অধিকারের বিচারিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী ছিল না। স্বাধীনতার পর প্রজারা নাগরিকে পরিণত হয়, তাদের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা।

দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানের রূপকার সংবিধান সম্পর্কে বলেছেন, এটা ‘জাতির আত্মজীবনী’। এতে তার ইতিহাস বোঝা যায়। সংবিধানের বিভিন্ন ধারা দেখলে বোঝা যায়, তা যুক্ত করা হয়েছে জাতির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা হিসেবে, যা অতীতের নেতিবাচক উপাদান থেকে মুক্ত। অর্থাৎ সংবিধান মানুষের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণীত হয়, যার মধ্য দিয়ে ওই সময়ের মানুষের চিন্তাধারা বোঝা যায়। এতে ভবিষ্যতের রূপরেখা প্রণয়নের চেষ্টা থাকে, নিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তনের কাঠামো থাকে। বস্তুত সংবিধান নিজেই ঔপনিবেশিক ও কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন থেকে মুক্তির নিদর্শন, যার মধ্যে অবশ্যই পুরোনো সমাজের বৈষম্য ও অসমতা দূর করার অঙ্গীকার থাকতে হবে। সংবিধানে মৌলিক অধিকার–সংবলিত ও রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক দিকনির্দেশনা-সংবলিত যে ধারা থাকে, তা একধরনের আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সেটা কাজে লাগানো যায়। এর মধ্যে সৃজনশীলতার সঙ্গে আইন প্রণয়ন, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, প্রতিকার ও ইতিবাচক কাজের নির্দেশ থাকে। স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচার-বিষয়ক যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার রয়েছে, এগুলো তাতে রসদ জোগায়।

২. বিচারিক পর্যবেক্ষণের আওতা সম্প্রসারণ

আমাদের সংবিধানে বিল অব রাইটস অন্তর্ভুক্ত করা, বিচার বিভাগকে বিচারিক পর্যবেক্ষণের অধিকার দেওয়া ও মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা খুবই গভীরভাবে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারে। বিচারিক পর্যবেক্ষণের আওতা সম্প্রসারণ ও সৃজনশীলভাবে সক্রিয় থাকার কারণে বিচার বিভাগ সামাজিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত করতে আমাদের সংবিধানের উপাদানসমূহ ব্যবহার করেছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধানের অধিকারবান্ধব ব্যাখ্যা দিয়ে বিচার বিভাগ সামাজিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছেন। জনস্বার্থবিষয়ক মামলায় বিচার বিভাগের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে তারা সামাজিক পরিবর্তন সহজতর ও ত্বরান্বিত করতে গতিশীল ভূমিকা পালন করছে। সেটা করতে গিয়ে তারা অতীতের বাধা দূর করেছে, যার কারণে বিচার বিভাগের ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হতো।

দক্ষিণ এশিয়ায় বিচারিক পর্যবেক্ষণের আওতা ক্রমেই বড় হচ্ছে। এর কারণ সংবিধানের অধীনে রাষ্ট্রের সব অঙ্গেরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা নির্ধারণ করার দায়িত্ব সরকারের। মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, তার কারণেই নানা উদ্ভাবনী মনোভঙ্গির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার সংখ্যাবৃদ্ধি। লৈঙ্গিক অসমতা, শৃঙ্খলিত শ্রম, বস্তিবাসীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ, বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়—এগুলো নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিচার বিভাগকে এসবও সামাল দিতে হচ্ছে।

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায় দেন, যেখানে আদালত বলেন, পরিবেশবাদী আইনজীবীদের সংগঠন জনস্বার্থে রিট পিটিশন করতে পারবে। ফলে দেশে জনস্বার্থে মামলা করার হার বেড়ে যায়। ওই পিটিশনে সফলভাবে ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়, যেটা সংশ্লিষ্ট ও আক্রান্ত মানুষদের মতামত ছাড়াই প্রণয়ন করা হয়েছিল। উল্লেখ, এ কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছিল, যার পরিবেশগত ও বস্তুগত প্রভাবও নগণ্য ছিল না।

সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন বিষয়ে জনস্বার্থবিষয়ক মামলা উৎসাহিত করছেন, যার মধ্যে আছে কারখানা নিরাপত্তা (অগ্নিকাণ্ড ও অনিরাপদ গার্মেন্টস কারখানা), পরিবেশ (গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ), দুর্নীতি (অবৈধভাবে খাসজমি বণ্টন), আইনি হেফাজতে অমানবিক ব্যবহার (বিচারিক হেফাজতে বেড়ি পরানো), ধর্ষিতাকে আটক (হাতকড়া পরিয়ে), অন্য নারীদের ‘নিরাপত্তা’ হেফাজতে রাখা ও বস্তিবাসীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা।

৩. সংবিধান বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগ

সাংবিধানিক ও আইনি অনুশাসন যাতে আইনের মাধ্যমে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তা দেখার দায়িত্ব এককভাবে নির্বাহী বিভাগের ওপর ন্যস্ত। এখন যদি তারা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে আদালত ও বিচারকেরা এটা ভাবতে পারেন না যে এর মধ্য দিয়ে মানুষের যে অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, সেটা দেখা তাদের দায়িত্ব নয়। যদি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অসাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ তাঁকে এই মর্মে নির্দেশনা দিতে পারেন, যাতে তিনি দ্রুততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। যদি এমন হয় যে বহুসংখ্যক বিচারাধীন আসামির দীর্ঘদিন বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না, তাহলে বিচারক অবশ্যই তাদের মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে দ্রুত বিচার শুরু করার নির্দেশ দিতে পারেন। কারাগারের পরিবেশ যদি অমানবিক ও অধঃপতিত হয়, তাহলে বিচারক তা সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারেন। বস্তিবাসীদের যদি জোরপূর্বক উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহলে বিচার বিভাগের কাছ থেকে সুরক্ষা চাইতে পারে।

সংবিধান একটি জীবন্ত সত্তা, যা মূলত মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এর লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের অগ্রগতি, শান্তি, কল্যাণ নিশ্চিত করা, তাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব রক্ষা করা। এটা মৌলিক কাঠামো, যার ভিত্তিতে সৌধটা দাঁড়িয়ে থাকে। সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে স্বাধীন বিচার বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন এবং সমাজ পরিবর্তনে প্রভাবকের কাজ করতে পারে। সূত্র: প্রথম আলো

ইংরেজি থেকে অনূদিত।

 

 
লেখক: ড. কামাল হোসেন, সংবিধানপ্রণেতা ও আইনজীবী।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon