পেশাগত দায়িত্ব পালনে আইনজীবীর অধিকার ও রাষ্ট্রের কর্তব্য


প্রকাশিত :২১.১২.২০১৬, ১:২৩ অপরাহ্ণ

adv-shahanurঅ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম সৈকত

আইনজীবীর ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মূলনীতিতে (ইউএন বেসিক প্রিন্সিপাল অন রোল অফ ল ইয়ার) পেশাগত জীবনে আইনজীবীর প্রাপ্য অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতিগুলোর সারসংক্ষেপ রয়েছে। ১৯৯০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কিউবার রাজধানী হাভানায় অনুষ্ঠিত ‘অপরাধ প্রতিরোধ ও অপরাধীর চিকিৎসাবিষয়ক জাতিসংঘ কংগ্রেস’-এর ৮ম অধিবেশনে এই মূলনীতি সর্বোসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। পরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মানবাধিকারবিষয়ক প্রস্তাবে এই মূলনীতিকে স্বাগত জানায়, যা ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে সাধারণ পরিষদের প্রাথমিক অধিবেশন ও তৃতীয় কমিটির অধিবেশনে কোনো ধরনের ভোটাভুটি ছাড়া গৃহীত হয়। তবে এখনো আইনজীবীর ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মূলনীতি সাধারণ পরিষদ থেকে স্পষ্টভাবে অনুমোদিত হয়নি।

আইনজীবীর ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মূলনীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো কোনো ধরনের অনুচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া আইনজীবীদের কার্যক্রম পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের সঠিক ভূমিকা প্রসারে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা। আরো সুনির্দিষ্টভাবে, সব ব্যক্তির সহজ ও কার্যকর আইনি পরিষেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এর উদ্দেশ্য।

আইনজীবীর ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মূলনীতি শুধু আইনজীবীদের নয়, বরং অন্যান্য ব্যক্তি ও সংস্থা যথা বিচারক, সরকারি কৌশলী, নির্বাহী ও আইনসভার সদস্য এবং সাধারণ জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য গৃহীত হয়।

২৯টি ধারাবিশিষ্ট এই মূলনীতি পেশাগত দায়িত্ব পালনে একজন আইনজীবীর শুধু ব্যক্তিগত অধিকার ঘোষণা করেনি, রাষ্ট্রের প্রতি বাধ্যবাধকতাও ঘোষণা করে। তাছাড়া এই মূলনীতির প্রয়োগ শুধু পেশাজীবী আইনজীবীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পেশাজীবী আইনজীবী ছাড়াও যারা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে একজন আইনজীবীর পরিপূরক হিসেবে কার্যসম্পন্ন করে তাদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য।

আইনজীবীর ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মূলনীতি ১৬ থেকে ২২ ধারা একজন আইনজীবীর পেশাগত কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি বাধ্যবাধকতা আরোপ করে: প্রথমত, সব ধরনের ভয়ভীতি, প্রতিবন্ধকতা, হয়রানি বা অনুচিত হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশে একজন আইনজীবী যেন তার পেশাগত কার্যক্রম সম্পাদনে সক্ষম হয় রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে, (ধারা:১৬-এ); দ্বিতীয়ত, পেশাগত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে একজন আইনজীবী মক্কেলের সঙ্গে দেশের ভিতর এবং বাইরে যেন মুক্তভাবে ভ্রমণ ও পরামর্শ করতে সক্ষম হয় রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে (ধারা:১৬-বি); তৃতীয়ত, পেশাগত মর্যাদা ও নৈতিকতার অধীনে দায়িত্ব বা কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য একজন আইনজীবী যেন কোনো ধরনের দুর্গতি অথবা বিচারিক বা প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা অথবা হুমকির সম্মুখীন না হয় রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে (ধারা ১৬-সি); চতুর্থত, পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে কোনো কার্যক্রম সম্পাদনের ফলে যদি একজন আইনজীবীর নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয় তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে (ধারা: ১৭); পঞ্চমত পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে একজন আইনজীবীকে তার মক্কেলের পরিচয়ে শনাক্ত করা যাবে না (ধারা:১৮); ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক মানদ-সহ এই মূলনীতির আলোকে দেশীয় আইন ও অনুশীলন দ্বারা অযোগ্য ঘোষিত না হলে কোনো আদালত বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ মক্কেলের দ্বারা স্বীকৃত কোনো আইনজীবীকে তার পক্ষে আদালতে উপস্থিত হয়ে মামলা পরিচালনার অধিকার বাধাগ্রস্ত বা অস্বীকার করবে না (ধারা:১৯); সপ্তমত, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একজন আইনজীবীর কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল অথবা অন্য কোনো আইনগত বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে সরল বিশ্বাসে প্রাসঙ্গিক মৌখিক বা লিখিত বক্তব্য প্রদান অথবা পেশাগত উপস্থাপনার জন্য সব ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি দায়মুক্তি ভোগ করবে (ধারা: ২০); অষ্টমত, মক্কেলকে কার্যকর আইনগত সহায়তা প্রদানে প্রয়োজনীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পেশাগত আয়ত্তাধীন সব তথ্য, ফাইল এবং নথি রাষ্ট্র যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে আইনজীবীকে সরবরাহ নিশ্চিত করবে (ধারা: ২১); এবং নবমতম, পেশাগত দায়িত্ব সম্পাদনকালে একজন আইনজীবী ও মক্কেলের মধ্যে সম্পাদিত সব ধরনের যোগাযোগ ও পরামর্শ গোপনীয় বলে সরকার গণ্য করবে (ধারা: ২২)।

আইনজীবীর ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মূলনীতির ধারা ২৩ সব আইনজীবীর মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। ওই ধারা অনুযায়ী- (ক) অন্যান্য সাধারণ নাগরিকের মতো একজন আইনজীবীর মতপ্রকাশ ও ধারণ, সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও সমাবেশে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা রয়েছে; (খ) পেশাগত অবরোধ আরোপ ছাড়াই একজন আইনজীবীর আইন, বিচার প্রশাসন এবং মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণসংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে; এবং (গ) শুধু আইনগত সংগঠনের সদস্য হওয়ার কারণে অথবা আইনগত কার্যক্রম পরিচালনার কারণে কোনো ধরনের অবরোধ আরোপ ছাড়াই একজন আইনজীবীর স্থানীয়, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা বা যোগদান এবং তাদের বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে।

আইনজীবীর ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘ মূলনীতি একটি ‘সফট ল’ হিসেবে বিবেচিত এবং কেউ আইনগতভাবে মানতে বাধ্য নয়। তবে এ মূলনীতি সর্বত্র ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও গৃহীত। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আঞ্চলিক আদালত এই মূলনীতিকে রেফারেন্স হিসেবে প্রায়ই ব্যবহার করে। তাছাড়া এই মূলনীতি আন্তর্জাতিক আইনের উৎস, এমনকি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।

সর্বোপরি এই মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত অধিকারগুলো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি; নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর ব্যবহার অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তি; অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি; মানবাধিকারসংক্রান্ত ইউরোপিয়ান কনভেনশন; মানবাধিকারসংক্রান্ত ইউএস কনভেনশন এবং মানব ও জনগণের অধিকারসংক্রান্ত আফ্রিকান সনদসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার চুক্তিগুলোয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্র এসব অধিকার কোনোভাবে অস্বীকার করতে পারে না, বরং এসব অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে সব ধরনের ভয়ভীতি, প্রতিবন্ধকতা, হয়রানি বা অনুচিত হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশে একজন আইনজীবীর পেশাগত দায়িত্ব সম্পাদনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 
লেখক: মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী; জাস্টিসমেকার্স ফেলো, সুইজারল্যান্ড; জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ইউএনডিপি) কর্মরত।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon