সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে সাড়ে ৪শ’ আলোচিত মামলা


প্রকাশিত :২১.১২.২০১৬, ৪:৩০ অপরাহ্ণ

court2বছরের পর বছর কাটলেও নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না দেশের সাড়ে চারশ’ আলোচিত মামলা। মূলত সাক্ষীর অভাবে এসব মামলা নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এসব মামলার আসামিদের মধ্যে অধিকাংশই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, হত্যাকারী ও জঙ্গি। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় কারাগারে যেমন নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে, একইভাবে এসব আসামিকে বারবার ব্যাপক ঝুঁকি নিয়ে আদালতে হাজির করতে হচ্ছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের টনক নড়েছে। ফলে মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্মৃতি রানী ঘরামির নেতৃত্বে একটি কমিটি মামলাগুলো তদারকির দায়িত্ব নিয়েছে। নির্ধারিত দিনে আসামির মতো সাক্ষীদেরও আদালতে হাজির করতে তারা নানা দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। আলোচিত এ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা শাখা থেকে ৫৭ জেলার ডিসি ও পুলিশ সুপারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে মামলার বিবরণ, আসামি কোন আদালতে বিচারাধীন, মামলার তারিখ, আসামি ও সাক্ষীর নামসহ বিস্তারিত তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। যৌক্তিক কারণ উল্লেখসহ প্রতিবেদন না পাঠালে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি করতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশের কোন কারাগারে কতজন আসামি কোন মামলায় আটক, আদালতের নাম, বিচারাধীন মামলার ধারা, নম্বর ও তাদের নাম, কারাগারে বন্দির পর কতবার আদালতে হাজির করা হয়েছে, সর্বশেষ হাজিরার তারিখসহ পরিসংখ্যান চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোন কারণে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না, মামলার বর্তমান অবস্থা কী_ সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আলোচিত ৪৬২ আসামি বন্দি রয়েছেন বলে কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। কারা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচিত মামলা হলেও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না।

জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) অন্যতম সদস্য ও দুর্ধর্ষ জঙ্গি ইয়ামিন মিয়া, পিতা-মোসলেম উদ্দীন, মাদারগঞ্জ, দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল। জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরক দ্রব্যসহ টাঙ্গাইল থেকে তাকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই ঘটনায় চাংড়াছড়ি, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ির মোজাহার আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম আটক হয়। দু’জনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। টাঙ্গাইল বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জজ-২ আদালতে এ দু’জনের বিচার কার্যক্রম চলছে। গত ৯ বছর বিচারের জন্য এ দু’জনকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদালতে ৯০ বার হাজির করা হয়। কিন্তু সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বছরের পর বছর মামলার তারিখ পাল্টালেও বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে বছরের পর বছর অপরাধীরা কারাগারে থাকছে। কারা কর্তৃপক্ষের জন্য এসব জঙ্গি যেমন নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করছে, তেমনি তাদের আদালতে আনা-নেওয়াও ব্যাপক ঝুঁকি।

খুনের মামলায় সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের ফারুক হোসেন ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। মৌলভীবাজারের দায়রা জজ আদালতে তার বিচার কার্যক্রম চলছে। গত ১১ বছরে তাকে ১২৫ বার শুনানির জন্য আদালতে হাজির করা হয়। সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় বারবার তারিখ পরিবর্তন হলেও মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না ।

বন্দি আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যারা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আলোচিত মামলায় কারান্তরীণ আসামিদের বিচার কাজ চলছে বিভিন্ন জেলার দায়রা জজ আদালতে। ২০১০ সাল থেকে বান্দরবানের বাসিন্দা রেজাউল করিম ও উবাসিং মারমা চাঁদাবাজি ও খুনের মামলায় চাঁদপুর জেলা কারাগারে রয়েছেন। বিচারের জন্য তাদের দায়রা জজ আদালতে ১০৮ বার হাজির করা হয়। সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় মামলার শুনানি থেমে আছে।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বাসিন্দা রাজু আহমেদ খুনের অভিযোগে ২০০৩ সালের ৩ মার্চ থেকে হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছেন। বিচারের জন্য আসামিকে ১০৮ বার আদালতে হাজির করা হয়। একইভাবে সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে বার বার নতুন তারিখ পড়লেও বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে না।

বাগেরহাটের কাকা মোল্লা নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ২০০৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে করাগারে রয়েছেন। এ পর্যন্ত তাকে ৯০ বার আদালতে হাজি করা হয়। ১০ বছর পার হলেও সাক্ষীর অভাবে বিচার কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না। নাটোরে ২০০৫ সাল থেকে খুনের মামলায় আবদুল খালেক কারাগারে রয়েছেন। তাকে ৭০ বার আদালতে হাজির করা হলেও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে পার হয়ে গেছে ১১ বছর। একই কারাগারে মাদক মামলায় বন্দি নওশাদ মণ্ডলকে ৮০ বার আদালতে হাজির করা হয়। সাক্ষী হাজির না হওয়ায় তার মামলাও দীর্ঘদিন ঝুলে রয়েছে।

খুনের মামলায় ২০০৯ সালের ৬ মে থেকে বরগুনা জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন একই জেলার আবদুল জলিল। একই কারাগারে জাহাঙ্গীর আলম নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় বন্দি রয়েছেন। মামলার শুনানির জন্য আদালতে তাদের ৯৪ বার হাজির করা হলেও সাক্ষীর অভাবে বিচার কার্যক্রম থেমে আছে। এ দু’জনের বিচার চলছে বরগুনার দায়রা জজ আদালতে।

হাজতি মো. জহিরুল ইসলাম চাঁদপুরের বাসিন্দা। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ২০০৯ সালের ১০ অক্টোবর থেকে চাঁদপুর কারাগারে বন্দি আছেন। জেলা দায়রা জজ আদালতে চলা মামলায় তাকে ৭০ বার হাজির করা হয়। যথারীতি সাক্ষীর অভাবে মামলার শুনানি হচ্ছে না। একই জেলার আবদুল মান্নান ২০১০ সাল থেকে খুনের মামলায় কারাগারে রয়েছেন। গত ছয় বছরে কারা কর্তৃপক্ষ এ আসামিকে আদালতে ৭০ বার হাজির করলেও সাক্ষী অনুপস্থিত থাকছেন।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য না দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন আদালতে থাকা স্পর্শকাতর মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এর কারণ খুঁজে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা যাতে দ্রুত বিচার পায়, সে জন্য সরকার সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সাক্ষীদের জন্য নিরাপত্তা সুরক্ষা দেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসি ও এসপিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে মামলা সম্পর্কিত সব তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় এসেছে। আইনি সহায়তা নেওয়ার জন্য মামলার তালিকা, ধারাসহ অন্যান্য তথ্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে সাড়ে চারশ’ বন্দির মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন এবং বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্তরাও রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। কারাবন্দি এসব আসামির বিরুদ্ধে হত্যা, জঙ্গিবাদ, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, মাদক, বিস্ফোরকসহ গুরুতর একাধিক মামলাও রয়েছে। আদালতে শুনানির দিন কারা কর্তৃপক্ষ আসামিকে আদালতে হাজির করলেও সাক্ষীরা উপস্থিত থাকছেন না। অথচ নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পুলিশকে আসামি আনা-নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

ভয়ঙ্কর প্রকৃতির আসামিদের আদালতে উপস্থিত করতে নিরাপত্তা ঝক্কি প্রসঙ্গে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আদালতে মামলা শুনানির দিনে দুর্ধর্ষ আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে আনা-নেওয়া অনেক ঝুঁকির। পর্যাপ্ত পুলিশ না থাকার পরও ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে আসামিদের আদালতে হাজির করাতে হয়। এর পর সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা আর তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

দেশের কারাগারগুলোয় বন্দি ধারণক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। বন্দি ধারণক্ষমতা রয়েছে ৩৬ হাজার ৬১৪ জনের। বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ৭৮ হাজার ২৯০ জন। এর মধ্যে কয়েদি ১৯ হাজার ৩৬৯, হাজতি ৫৮ হাজার ৮৩২ ও বিদেশি আসামি ৫৮৬ জন। বিদেশি আসামির মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচজন, ময়মনসিংহে ২৫ জন, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ চারজন, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ ৫৭ জন, কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় করাগারে পাঁচজন, হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে ২১ জন, ফরিদপুরে পাঁচজন, টাঙ্গাইলে তিনজন, জামালপুরে একজন ও কিশোরগঞ্জে আটজন। আলোচিত ৪৬২ আসামির মামলার বিচার দায়রা জজ আদালতে চলছে। কোনো কোনো আসামির মামলা তদন্তাধীন, আদালতে বিচারাধীন ও বিচার শেষের অপেক্ষায় রয়েছে। -শরীফুল ইসলাম ও ফসিহ উদ্দীন মাহতাব/সমকাল

 

 
সম্পাদনা- ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon