‘ইভটিজিং’ বিকৃত যৌন কামনার বহিঃপ্রকাশ


প্রকাশিত :২২.১২.২০১৬, ২:০৩ অপরাহ্ণ

15683305_350841045297090_1808726322_nরীনা পারভীন মিমি

যৌন হয়রানী মূলত নগন্য পুরুষের বিকৃত যৌন কামনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশে এমন নারী খুঁজে পাওয়া দুস্কর যে কখনো কোনো দিন যৌন হয়রানীর শিকার হয়নি। আমরা ধর্ষণকেই কেবল যৌন নির্যাতন বলে গণ্য করি। কিন্তু মেয়েরা যে আরও কতরকমের যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হন, কিন্তু কেউই আমরা এগুলো নিয়ে কথা বলি না লোকলজ্জার ভয়ে।

সাধারণ মানুষ চলাচল করে এমন প্রায় সব জায়গাতেই নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। যৌন হয়রানী ঘরে বাইরে, অফিসে, মার্কেটে, রাস্তায়, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও হয়ে থাকে। এটি এমন একটি নির্যাতন যা সাধারনত হয়রানীর শিকার কিংবা হয়রানীকারীর শ্রেণী, বয়স, পেশা, সামাজিক মর্যাদা বা অবস্থানের উপর নির্ভর করে না ।

ইভটিজিং মূলত প্রকাশ্যে যৌন হয়রানি, পথেঘাটে উত্ত্যক্ত করা বা পুরুষ দ্বারা নারী নির্যাতনের নির্দেশক একটি শব্দ। ‘ইভ’ শব্দটি বাইবেলের ইভ (Eve) বা পবিত্র কোরআনের ‘হাওয়াকে’ বোঝায়। অন্যদিকে টিজিং শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘পরিহাস বা জ্বালাতন’। সুতরাং ‘ইভ’ বলতে বুঝায় নারী বা রমণী এবং টিজিং বলতে বুঝায় উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করা। একসময় সমাজের বখে যাওয়া একটি ক্ষুদ্র অংশ ইভটিজিং-এর সাথে জড়িত থাকলেও এখন উঠতি বয়সী তরুণ, কিশোর অনেক মধ্য বয়সীরাও এর সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে। আধুনিক সমাজে ‘ইভটিজিং’ শব্দটি ‘যৌন হয়রানি’ (Sexual Harassment) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ‘যৌন হয়রানি’ হচ্ছে সেই ধরনের কর্মকাণ্ড ও আচরণ যা মানুষের যৌনতাকে উদ্দেশ্য করে মানসিক ও শারীরিকভাবে করা হয়।

 

যৌন হয়রানি বলতে যা বুঝায়

ক) অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আবেদনমূলক আচরণ (সরাসরি অথবা ইঙ্গিতে) যেমনঃ শারীরিক স্পর্শ বা এ ধরণের প্রচেষ্টা।

খ) প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে কার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা।

গ) যৌন হয়রানি বা নিপীড়নমূলক কথা বলা।

ঘ) যৌন সুযোগ লাভের জন্য অবৈধ আবেদন।

ঙ) পর্ণগ্রাফি দেখানো।

চ) যৌন আবেদনমূলক ভঙ্গী।

ছ) অশালীন ভঙ্গী, যৌন নির্যাতনমূলক ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, কাউকে অনুসারন করা বা পিছন পিছন যাওয়া, যৌন ইঙ্গিতমূলক ভাষা ব্যবহার করে ঠাট্টা বা উপহাস করা।

ঞ) ব্লাকমেইল অথবা চরিত্র লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে স্থির বা চলমান চিত্র ধারণ করা।

ট) যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির কারনে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিক্ষাগত কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হওয়া।

ঠ) প্রেম নিবেদনে করে প্রত্যাখ্যান হয়ে হুমকি দেয়া বা চাপ প্রয়োগ করা।

ড) ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রতারনার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা স্থাপনে চেষ্টা করা।

এছাড়াও ভীড়ের মধ্যে অহেতুক নারীদের সাথে ধাক্কাধাক্কি ও শারীরিক ভাবে নারীদের শ্লীলতাহানিতে ব্যস্ত হয়ে উঠে এই বখাটেরা এবং শাস্তি, ডিমোশন, চাকুরিচ্যুতি ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে যৌন সুবিধা নিতে চাওয়াটা এধরণের আচরণের অন্তর্ভুক্ত। কিংবা অফিসের পার্টিতে নাচার ছলে, লিফটে গা ঘেঁষে, গাড়িতে পাশাপাশি বসে কেউ এই কাজ করামাত্রই সে যৌন হয়রানি করাকেও হালকাভাবে নেবার কোন উপায় নেই।

 

যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কি?

বাংলাদেশ দন্ডবিধি আইনের ২৯৪ ধারায় বলা হয়েছে ‘‘যে ব্যক্তি, অন্যদের বিরক্তি সৃষ্টি করিয়া (ক) কোন প্রকাশ্য স্থানে কোন অশ্লীল কার্য করে অথবা (খ) কোন প্রকাশ্য স্থানে বা সন্নিকটে কোন অশ্লীল গান, গাঁথা সঙ্গীত বা পদাবলী গায়, আবৃত্তি করে বা উচ্চারণ করে; সেই ব্যক্তি যে কোন বর্ণনায় কারাদন্ডে যাহার মেয়াদ ৩ মাস পর্যন্ত হইতে পারে বা অর্থদন্ডে বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হবে’। এই আইন দ্বারা ছোট ছোট ঘটনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা সম্ভব।

বাংলাদেশ দন্ডবিধি আইনের ৫০৯ ধারা অনুযায়ী ‘‘যে ব্যক্তি কোন নারীর শালীনতার অমর্যাদা করার অভিপ্রায়ে এই উদ্দেশ্যে কোন মন্তব্য করে, কোন শব্দ বা অঙ্গভঙ্গি করে বা কোন বস্তু প্রদর্শন করে যে উক্ত নারী অনুরূপ মন্তব্য বা শব্দ শুনতে পায় অথবা অনুরূপ অঙ্গভঙ্গি বা বস্তু দেখতে পায়, কিংবা উক্ত নারীর নির্জনবাসে অনধিকার প্রবেশ করে, সেই ব্যক্তি ১ বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন’’।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশেও ইভটিজিং বা উত্যক্ততা বিষয়ে বলা হয়েছে। এই অধ্যাদেশের ৭৬ ধারায় বলা হয়েছে ‘‘যদি কেউ কোন রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে বা সেখান হতে দৃষ্টিগোচরে স্বেচ্ছায় এবং অশালীনভাবে নিজদেহ এমনভাবে প্রদর্শন করে যা কোন গৃহ বা দালানের ভিতর থেকে হোক বা না হোক কোন মহিলা দেখতে পায় বা স্বেচ্ছায় কোন রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে কোন নারীকে পীড়ন করে বা তার পথ রোধ করে বা কোন রাস্তায় বা সাধারনের ব্যবহার্য স্থানে কোন অশালীন ভাষা ব্যবহার করে, অশ্লীল আওয়াজ, অঙ্গভঙ্গি বা মন্তব্য করে কোন মহিলাকে অপমান বা বিরক্ত করে তবে সেই ব্যক্তি ১ বৎসর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদন্ডে অথবা ২ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৭৫ ধারায় ‘সর্ব সমাজে অশালীন বা উশৃংখল আচরনের শাস্তি হিসেবে তিন মাস মেয়াদ পর্যন্ত কারাদন্ড বা ৫০০ শত টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড’- শাস্তির বিধান আছে।

 

সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ৭ আগস্ট-২০০৮ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কর্মস্থলে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধের দিকনির্দেশনা চেয়ে রিট (রিট পিটিশন নম্বর ৫৯১৬/২০০৮) দায়ের করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ মে-২০০৯ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মাদ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকি;  কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব সরকারি-বেসরকারি, আধা-সরকারি অফিস এবং সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন ।

১. অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত পরিচালনা এবং সুপারিশ করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সব কর্মক্ষেত্র এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগ গ্রহণের জন্য কমিটি গঠন করবে

২. কমপক্ষে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হবে, যার বেশির ভাগ সদস্য হবেন নারী এবং সম্ভব হলে কমিটির প্রধান হবেন নারী

৩. কমিটির দুজন সদস্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে হবে, যে প্রতিষ্ঠান জেন্ডার এবং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কাজ করে।

পরবর্তীতে সমিতি ২০১০ সালে আরও একটি রিট পিটিশন (রিট পিটিশন নম্বর ৮৭৬৯/২০১০) দায়ের করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২৫ জানুয়ারি-২০১১ নিম্নোক্ত নির্দেশনা প্রদান করে।

১. প্রতিটি পুলিশ স্টেশনে যৌন হয়রানি-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক সেল থাকবে

২. স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য স্থানে যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ থাকে সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে

৩. উপরোক্ত সেল জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিকে এ উদ্দেশ্যে রিপোর্ট পেশ করবে।

প্রতিটি মানুষের কাছে আহবান  অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে আসুন সবাই রুখে দাড়াই সে যে পরিবেশেই হোক না কেন বা হোক না আমার পরিচিতজন বা আত্মীয়।। যৌন হয়রানি শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ।

মেয়েদের জেনে রাখা উচিত, যৌন হয়রানি ইভটিজিং যেহেতু একটি সামাজিক ব্যাধি, তাই একে সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে, প্রতিরোধ করতে হবে। যৌন হয়রানির শিকার হলে তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ করে অভিযুক্তকে বিতাড়িত করা দরকার।

 

 

লেখক: আইনজীবী ও সহযোগী সম্পাদক- ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডট কম।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon