নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিনিয়োগের সুফল অনেক


প্রকাশিত :২৬.১২.২০১৬, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

loxmi-puri১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির জেন্ডার সমতা অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্য জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব এবং ইউএন উইমেনের উপনির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মী পুরী সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন। ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় এই প্রতিনিধির সঙ্গে তিনি কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ লিঙ্গ সমতায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ভর্তির ক্ষেত্রে জেন্ডার প্যারিটি আনা, মাতৃমৃত্যু রোধসহ মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন ‘চ্যাম্পিয়ন’। তবে অনেক অর্জনের পরেও বাংলাদেশে পারিবারিক নির্যাতন, ক্ষতিকারক প্রথা, বিশেষ করে বাল্যবিবাহের হারও অনেক বেশি, যা উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিবার বা সমাজে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব কেমন হয়?

লক্ষ্মী পুরী: নারী নির্যাতনের অনেক ধরনের মূল্য দিতে হয়। তা সমাজকে আঘাত করে। নির্যাতনের হার দেখে একটি সমাজের অবস্থান বলে দেওয়া যায়। আমরা বলছি, নারী নির্যাতনের ফলাফলগুলো হলো—মানুষের দুঃখ, ব্যথা, চাকরিচ্যুত হওয়া, হত্যাসহ নানান কিছু। ৫০ শতাংশ নারী ঘরের ভেতরে খুন হচ্ছে এবং যারা খুন করছে তারা ওই নারীর পরিচিত, নারী তাকে ভালোবাসত অথবা বিশ্বাস করত। অন্যদিকে মাত্র ৬ শতাংশ পুরুষের বেলায় এ ঘটনা ঘটছে। নির্যাতনের ফলে কিশোরীদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা বিশ্বকে মোকাবিলা করতে পারছে না। কর্মক্ষেত্রে অথবা প্রকাশ্য জনসমাগমের স্থানে যৌন নির্যাতনের শিকার হলে কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। নির্যাতন সব ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। এই ধরনের ক্ষতিগুলোকে আমরা সামাজিক ক্ষতি বলতে পারি।

পরিবারের যে ছেলেশিশুরা নির্যাতন দেখে বড় হয় তারা ভবিষ্যতে নির্যাতকের ভূমিকা পালন করতে পারে অথবা নির্যাতনের শিকার হয়। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে। নির্যাতনের পর স্বাস্থ্য খরচ, কাজ কামাই করাসহ বিভিন্ন খাতে বিশ্বে ন্যূনতম দেড় লাখ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে, যা কানাডার মোট জিডিপির সমান। আমরা বলছি, যদি তোমরা দেড় লাখ কোটি ডলারের মধ্যে ২ শতাংশও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ প্রকল্পে বিনিয়োগ কর, তাহলে তোমরা সমতা অর্জন করতে পারবে, যার পরিমাণ দাঁড়াবে ২৮ ট্রিলিয়ন (ইউএন উইমেনের সহায়তায় ম্যাকেঞ্জির পরিচালিত গবেষণা)। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প প্রস্তুতকারক সমিতির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ৩০ বছর বয়সী নারীরা কর্মক্ষেত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্র বা পরিবারে নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি কারণ, যা তাঁদের কর্মক্ষেত্রে যেতে বাধা দিচ্ছে। এই ধরনের ক্ষতির বিষয়গুলো আগে বিবেচনায় নেওয়া হতো না, এখন বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তাই আমাদের কিছু করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার একটি বিশেষ ধারা রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পাস করতে যাচ্ছে। এই বিশেষ ধারার ফলে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের বৈধতা মিলবে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

লক্ষ্মী পুরী : আমি বাংলাদেশের সুশীল সমাজ এবং সরকারের সঙ্গেও কথা বলেছি। প্রথমত, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার কমছে, যা প্রশংসার যোগ্য। যে অর্জন তা কোনো বিশেষ ধারার জন্য যাতে পিছিয়ে না যায় বা পিছিয়ে যেতে না হয়, তা মনে রাখতে হবে। আইনের খসড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। আইনের বিধিতে বাস্তবায়নের বিষয়টি থাকবে। বিধিতে বিষয়টি এমনভাবে আসতে হবে যাতে করে কেউ আইনটির অপব্যবহার করতে না পারে বা কোনো ফাঁকফোকর না থাকে। উন্নত বিশ্বের আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের কথা থাকলেও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। উন্নত বিশ্বে বাবা–মা জোরপূর্বক মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন না। বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু রোধ, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে মেয়েদের ভর্তি এবং জেন্ডার সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে অগ্রগতি করতে না পারলে এ অর্জনগুলো ধরে রাখা সম্ভব হবে না। মাতৃমৃত্যু রোধ ও শিক্ষার যে সূচক, তাকেও প্রভাবিত করবে। বাল্যবিবাহ মানেই হলো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া। বাল্যবিবাহ মানে হলো মাতৃমৃত্যু। আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, এমন কোনো বিষয় যাতে না থাকে, যা দ্বিধা তৈরি করে। আইনে এমন কিছু রাখা ঠিক হবে না যা ‘ফ্রি লাইসেন্স’ হিসেবে কাজ করবে, যা অভিভাবকেরা প্রতিনিয়ত করে থাকেন।

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সিডওর (জাতিসংঘের নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ) গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা (২ এবং ১৬ ১. গ) থেকে আপত্তি তুলে নেয়নি। আপনার মন্তব্য কী?

লক্ষ্মী পুরী : আমরা এ বিষয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, যেসব দেশ সিডও সনদে অনুসমর্থন করে বিভিন্ন ধারায় আপত্তি বহাল রেখেছে, সেসব দেশকে প্রতিনিয়ত আপত্তি তুলে নিতে বলছি। বেইজিং ঘোষণায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ধর্ম, সংস্কৃতি বা প্রথাকে নারীর অধিকার রক্ষার পথে বাধা বা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন

লক্ষ্মী পুরী : নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারকে দায়িত্ব পালনকারী (ডিউটি বিয়ারার) হিসেবে কাজ করতে হবে। নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের পরিবর্তন, নীতির সংস্কার, বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান তৈরি প্রয়োজন। সব মিলে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের কার্যক্রম ইংরেজি চারটি ‘পি’ অক্ষরকে কেন্দ্র করে হতে হবে। এই চার পি হলো—প্রিভেনশন, প্রোটেকশন, প্রসিকিউশন (অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর সুরক্ষা) এবং প্রভিশন (ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মতো সমন্বিত কার্যক্রম)। শরণার্থীশিবির, অভিবাসী নারী শ্রমিকসহ ঘরে-বাইরে যেখানেই নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে, তাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারকে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইন যাতে যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় সে জন্য যথাযথ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে আলাদা আইন করেছে, এখন এ আইনের বাস্তবায়ন জরুরি। হটলাইন, পুলিশ এবং বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জেন্ডার সংবেদনশীল প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রকে ভূমিকা পালন করতে হবে। সুশীল সমাজ এবং নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনকেও সহায়তা করার দায়িত্ব সরকারের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা, প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে নজর দেওয়ার দায়িত্বও সরকারের।

নারীরা শিক্ষা-দীক্ষা বা আর্থিকভাবে আগের তুলনায় এগিয়েছে, কিন্তু নির্যাতন তাঁদের পিছু ছাড়ছে না…

লক্ষ্মী পুরী : বহু বছরের পুরোনো পিতৃতান্ত্রিকতা, সমাজের আচরণ এবং মনোভাবের কারণে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলছে। পুরুষ নির্যাতন করতে পারে এ ধরনের একটি ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে, বিভিন্ন গবেষণাতেও তাই উঠে এসেছে। নির্যাতন করার বিষয়টিকে পুরুষ নিজের অধিকার হিসেবেই ভাবছে। এটি তাঁদের পৌরুষত্বের প্রকাশ। অন্যদিকে নারীরাও ভাবছেন তঁাদের দোষেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অথবা এটি লজ্জার বিষয়। কোনো অন্যায় করেছিল বলেই নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটেছে। এটি তাঁদের মেনে নিতে হবে। তাঁদের সম–অধিকার পাওয়ার কথা না। তাই বলা যায়, নারী নির্যাতন হচ্ছে একটি মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে যদি বলেন।

লক্ষ্মী পুরী : নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বড় অর্জন হলো, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, যা নারী নির্যাতন ঘরের ভেতরের গোপনীয় কোনো জিনিস নয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। কেউ বলতে পারবে না সে আমার স্ত্রী, সে আমার সম্পত্তি, আমার যা খুশি তার সঙ্গে আমি তা-ই করতে পারি। নারী নির্যাতন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম হিসেবে বর্তমানে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। নারী এবং মেয়েশিশুদের নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে কঠোরভাবে। ধর্মীয় এবং স্থানীয় নেতা, বিশেষ করে যাঁরা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, তাঁদের কাজে লাগানো যায়। এই আলোচনায় যাঁরা ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে নারী নির্যাতনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন, তাঁদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিনিয়োগের সুফল অনেক। এই বিনিয়োগের ফলে সমাজে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। নারীর ক্ষমতায়ন হয়। সব নির্যাতন, ব্যথার সমাপ্তি ঘটে, যার সুফল পায় পুরো সমাজ, যা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য আপনার কোনো বার্তা আছে কি?

লক্ষ্মী পুরী: দেশটির অগ্রগতি দেখে আমি অভিভূত। নারী-পুরুষের সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামে দেশটির পাশে আছি এবং থাকব সব সময়। একই সঙ্গে সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে, তা মোকাবিলা করার জন্যও আমাদের পাশে পাবেন। ছেলে এবং পুরুষদের উদ্দেশে বলতে চাই, সবাই ‘হি ফর শি’ শীর্ষক ক্যাম্পেইনে যোগ দেন। যে সমাজে জেন্ডার সমতা আসে সে সমাজে একজন অন্যজনকে সম্মান করে। আমরা বর্তমানে যে বিশ্বে বসবাস করছি, জেন্ডার সমতা অর্জিত হলে আরও ভালো পৃথিবীতে বসবাস করা যাবে। নারী ও শিশু নির্যাতনমুক্ত পরিবেশে বাস করলে তার সুফল পাবে সমাজ ও সমাজের জনগণ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানসুরা হোসাইন/প্রথম আলো



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon