সনদ পেলেই কি একজন ‘আইনজীবী’ হয়ে উঠেন?


প্রকাশিত :২৮.১২.২০১৬, ৪:১৪ অপরাহ্ণ

motiur-rahman-foisalমতিউর রহমান ফয়সাল

আইনপেশা সর্বজনবিদিত মানবতাবান্ধব ও ন্যায়পরায়ন পেশা। ভণ্ড, শঠ কিংবা অসৎ মানুষের জায়গা এটি নয়। তবে বর্তমানে এই পেশার প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব লক্ষ করা যায়। একশ্রেণীর আইনজীবীর প্রতারণার কারণে সম্মানজনক এই পেশাটির প্রতি মানুষের ভুল ধারণা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তবে শিক্ষিত লোক মাত্রই এই পেশার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই মুহূর্তে আইন শিক্ষার শেষপ্রান্তে অবস্থান করছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। কয়েক মাস পরে এদের অনেককেই আদালত-প্রাঙ্গণে ছোটাছুটি করতে হবে। একজন আদর্শ আইনজীবী হওয়ার জন্য যেসব দক্ষতা অর্জন করতে হবে তা জানাটা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। আইন পেশার প্রতি গণমানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং মহৎ এই পেশাটি সম্পর্কে নতুনভাবে মানুষ যেন চিন্তা করতে পারে, সে উদ্দেশ্যটি সামনে রেখেই এই লেখা।

প্রথমেই জেনে নেয়া যাক ‘আইনজীবী’ কে? ‘আইনজীবী’ মূলত এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আদালতে বা আদালতের বাইরে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা দেবার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্বীকৃত। একজন ব্যক্তিকে ‘আইনজীবী’ হিসেবে গড়ে উঠতে হলে যে দক্ষতাগুলো প্রয়োজন, এবার সেগুলোর আলোচনা করা যাক। আইনজীবীকে ইংরেজি ‘ল’ইয়্যার’ বলা হয়। ‘ল’ইয়্যার’ শব্দটির প্রতিটি বর্ণের মধ্যেই একজন আইনজীবীর প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো বলে দেয়া হয়েছে। যেমন, ১. ‘এল’- লিগ্যাল এক্সপার্ট (আইনবিষয়ে অভিজ্ঞ), ২. ‘এ’- অ্যানালাইটিক্যাল (ব্যাখ্যাকারী), ৩. ‘ডবিস্নউ’- উইজডম (জ্ঞানী), ৪. ‘ওয়াই’- ইয়ুথফুল (তারুণ্যময়), ৫. ‘ই’- এভারগ্রিন (চির যৌবনের শিল্পী), ৬. ‘আর’- রয়েলিস্ট (রাজকীয়)।

বলা হয়ে থাকে, একজন আইনজীবীকে সবগুলো বিষয়ের কিছু কিছু জানতে হবে, কিন্তু কিছু বিষয়ের সব জানতে হবে। এতক্ষণ যাবত একজন আইনজীবীর দক্ষতাই আলোচনা করা হলো কেবল, গুণ নয়। একজন আইনজীবীকে কঠিন কিছু গুণের অধিকারীও হতে হয়।

প্রথমত, তিনি হবেন আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও হালনাগাদ। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখতে হবে তার। তাকে সব আইন মুখস্থ রাখতে হবে না বটে; তবে প্রয়োজনীয় আইনটি কোথায় রয়েছে তা পরিষ্কারভাবে জানতে হবে ।

দ্বিতীয়ত, আইনটি সময়মতো যথাস্থানে প্রয়োগের দক্ষতাও থাকতে হবে তার।

তৃতীয়ত, সব বিষয়ে তার জ্ঞান থাকতে হবে। বিজ্ঞান, ব্যবসায় বা কলা বিষয়টি যে বিভাগেরই অন্তর্ভুক্ত হোক না কেন, একজন আইনজীবীকে সর্বস্তরের জ্ঞান নিয়ে কাজ করতে হবে।

চতুর্থত, একজন আইনজীবী হবেন তারুণ্যময়। তার কণ্ঠ হবে মাধুর্যময় ও বলিষ্ঠ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রখ্যাত আইনজীবী রফিকুল হকের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি সাফল্যের সঙ্গে আইনপেশায় কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি যেন চির তারুণ্যের অধিকারী।

পঞ্চমত, একজন আইনজীবী হবেন একজন দক্ষ শিল্পী। আদালত হচ্ছে তার জন্য এক মঞ্চ, যেখানে সফল হবার জন্যে তিনি তার সর্বোচ্চ পরিশ্রমটুকু দিয়ে অভিনয় করবেন। এক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিত্ব এবং আত্মবিশ্বাস খুব কাজে দেবে। তিনি বিচারককে মোহিত করবেন তার অভিনয়-শিল্প দিয়ে। আদালতপাড়ায় এ ব্যাপারে ড. কামাল হোসেন অতুলনীয়।

ষষ্ঠত, একজন আইনজীবীর জীবন হবে রাজকীয়। রাজার মতো তিনি হবেন ভদ্র ও সাহসী। আদালতে নিজেকে প্রকাশ করবেন রাজকীয়ভাবে। নিজেকে ছাড়িয়ে যাবেন অনন্য দক্ষতার মাধ্যমে। বিশ্বের যত বড় বড় নেতা, তাদের বেশির ভাগই ছিলেন আইনজীবী। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য।

অদক্ষ আইনজীবীরা অযুক্তি ও অসত্যের আশ্রয়ে চলে। এ ধরনের আইনজীবীদের কারণেই জনমানসে একটি কথা প্রচলিত হয়ে গেছে ‘যার নাই কোনো গতি, সে করে ওকালতি!’ আইন পেশায় আসার আগে প্রত্যেককে নিজের মানসিকতা শুদ্ধভাবে প্রস্তুত করে আসা উচিত। নয়তো ভুল, মিথ্যা আর প্রতারণার স্বীকার হয়ে মানুষ গোটা বিচারালয়কে গালি দিতে আসবে। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষ আস্থা হারাবে।

আইনজীবী হবেন সৎ ও নির্লোভ ব্যক্তি। যিনি সঠিকভাবে তার পেশাদারিত্বের দায়িত্ব পালন করে মক্কেলের কাছ থেকে আয় করবেন। মিথ্যার আশ্রয় নয়, বরং আইন অনুযায়ী যুক্তির মধ্য দিয়ে তার লড়াই পরিচালিত হবে।

আপাতদৃষ্টে মনে হয়, আইনজীবীরা নিরপরাধকে যেমন সাহায্য করেন, তেমনি অপরাধীকেও সাহায্য করেন। তবে এ ধারণা সঠিক নয়। অপরাধীর পক্ষ সমর্থন করার মানে অপরাধীকে সমর্থন করা নয় বরং অপরাধীর বিরুদ্ধে অপরাধ করার প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে উপস্থিত করা হয়েছে কি না তা নির্ধারণে আইনজীবীগণ বিচারককে সাহায্য করেন। একজন ভালো আইনজীবীর জেরাকে ‘ওপেনহার্ট’ সার্জারির সাথে তুলনা করা যায়। কেননা, এর ফলে আদালতের সামনে বাস্তব ও লুকায়িত তথ্য বেরিয়ে আসে। কারণ, আইনের আশ্রয় নেয়ার ক্ষেত্রে আইন সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে চায়। কোন নিরপরাধ যেন সাজা না পায় তার জন্য আইনজীবীদের লড়াই করতে হয়।

যুক্তিহীন মানুষকে মনুষ্যত্বহীন বলা হয়। আইনজীবীরা সবকিছু যুক্তির মাধ্যমে জয় করবেন। একজন আইনজীবীকে অবশ্যই কর্মে, চিন্তায়, বিচক্ষণতায় পরিপক্ক এবং সকল বিষয় ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ও কুশলী হতে হবে। নিজের বিবেক-ব্যক্তিত্বের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরের প্রকাশ ঘটাবেন বিজ্ঞ আইনজীবীরা।

যাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা, বিবেক ও মনুষ্যত্ব নেই তাদের আইন প্রয়োগ দুর্বল হবে। এ পেশার মহত্ত ধরে রাখতে হলে ন্যায়পরায়ণ আর মানবিক হতে হবে। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবী জয় করা সহজ, কিন্তু মন জয় করা নয়। একজন আইনজীবীকে যুক্তি, জ্ঞান, বিচক্ষণতার মাধ্যমে তার মক্কেলসহ বিচারকের মন জয় করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়।

আইনপেশা নিয়ে কটূ কথা বলার আগে অবশ্যই এটি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেয়া উচিত। না জানাটা একপ্রকার অজ্ঞতা। এই পেশায় নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষকে পরিমাপ করা যায়।

তবে বটতলার উকিল, স্বার্থপর, লোভী, মিথ্যাবাদী ও অসৎ আইনজীবীর সংখ্যা নিতান্ত কম নয়, যারা এ পেশাকে কলুষিত করেছে। এ কারণেই বলা হয়, ‘শুধু সনদ পেলেই আইনজীবী হওয়া যায় না।’

 

 
লেখক: আইনজীবী, ময়মনসিংহ জেলা জজ কোর্ট



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon