ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর মেনে নেওয়া হবে না


প্রকাশিত :০১.০১.২০১৭, ১:৪০ অপরাহ্ণ

tureen_afrozতুরিন আফরোজ

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হারিয়েছি অনেক; আর হারাতে চাই না।

১৯৭২ সালের ‘দালাল আইন’-এর অধীনে যে বিচার শুরু করা হয়, তা ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর সেই বছরের ৩১ ডিসেম্বর আইনটি বাতিল করা হয়; বন্ধ হয়ে যায় বিচার প্রক্রিয়াও, নষ্ট করা হয় মামলার সব দলিল-দস্তাবেজ।

যুদ্ধাপরাধীরা হয়ে ওঠে ক্ষমতাবান। যে বাংলাদেশের জন্ম তারা স্বীকার করে নেয়নি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভিত্তি করে রচিত যে সংবিধান তারা পদদলিত করেছে, ঠিক সেই সংবিধানের ওপর হাত রেখে তারাই আবার নির্লজ্জের মতো বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তৃত্ব দখল করে। তাদের গাড়িতেও উড়েছে আমার প্রাণপ্রিয় লাল-সবুজের পতাকা। কী দুর্ভাগ্য এ জাতির!

আজও কি একই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে? যে ‘যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে বিশ্বকে ব্যাপকভাবে অবহিত করছে ১৯৭১ সালের গণহত্যার কথা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের কথা, সেটি কেন স্থানান্তর করা হবে? কেন ট্রাইবুন্যাল চত্বর ব্যবহৃত হবে অন্য কোনো কাজে? বিচার তো শেষ হয়নি, বিচার তো চলছে। তাহলে কেন?

আমি কি ধরে নেব, আবারও সেই একই অপচেষ্টা? ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর করা হচ্ছে কি যুদ্ধাপরাধের বিচারের নাম ও নিশানা এ জাতির ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার জন্য? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন জানতে না পারে, এই ট্রাইব্যুনালে কী বিচার হয়েছিল, কেন বা কাদের বিচার হয়েছিল? যুদ্ধাপরাধীরা যেন আবারও শকুনের মতো আমাদের লাল-সবুজের পতাকা খামচে ধরতে পারে? না, তা হতে দেওয়া হবে না।

ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তরের পক্ষে অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের অবকাঠামো বৃদ্ধির জন্য আরও বেশি জায়গা দরকার। দরকার থাকতেই পারে, অস্বীকার করব না। কিন্তু সেটার জন্য কি একটাই সমাধান রয়েছে পৃথিবীতে: ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর?

সুপ্রিম কোর্টের আওতাভুক্ত স্থানে ব্যায়ামাগার তৈরি করা হয়, সেলুন তৈরি করা হয়, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের লাউঞ্জ তৈরি করা হয়। এই ব্যায়ামাগার, সেলুন আর লাউঞ্জ কি আমাদের জাতির আবেগে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনালের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কখনও না! তাহলে কারা মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে ভুল বোঝাচ্ছেন? এর তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখানে উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্তটি কোনো বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।

সাংবধিানকি পদাধিকারী একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি গণমাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তরের পক্ষে যুক্তি দেখালেন: “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বেঁচে থাকবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায়ের মাধ্যমে, কোনো দালানকোঠার মাধ্যমে নয়। তাই ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর জাতির জীবনে কোনো প্রভাব ফেলবে না।”

আমি হতভম্ব হই তাঁর জ্ঞানের স্থূলতা দেখে! ইতিহাস যদি শুধু কাগজের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে শহীদ মিনার কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে না? জাতীয় স্মৃতিসৌধ চত্বর এত বড় জায়গা দখল করে আছে, তা কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে না? নাকি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে ধীরে ধীরে শহীদ মিনার বা জাতীয় স্মৃতিসৌধও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে? না, তা হতে দেওয়া হবে না।

আমরা দেখেছি, ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ইস্পাত কঠিন অবস্থান গ্রহণ করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির টেলিফোনের তোয়াক্কা করেননি। পাকিস্তানি সংসদের একের পর এক নিন্দা প্রস্তাব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউমান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা আল-জাজিরার মিথ্যা প্রপাগান্ডা– কোনো কিছুই তাঁর সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে জামায়াত-বিএনপি জোটের নির্মম-নিষ্ঠুর নগ্ন আস্ফালন প্রধানমন্ত্রী মোকাবিলা করেছেন। এর সবকিছুই তিনি করেছেন শুধুমাত্র একটি দাবির সমর্থনে। আর তা হল, যুদ্ধাপরাধের বিচারের সঙ্গে জাতীয় আবেগ জড়িত। তাই এই বিচার যে কোনো মূল্যে তিনি চালিয়ে যেতে বলেছেন। তাহলে আজ ‘মহামান্যগণ’ এই ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর করতে বলছেন কার স্বার্থে, কার প্রয়োজনে? না, তা হতে দেওয়া হবে না।

ন্যুরেমবার্গের বিচার কক্ষগুলো এখন যাদুঘরে পরিনত করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম সেখানে যায় ইতিহাসের, কালের সাক্ষীকে অনুভব করার জন্য। তেমনি আমাদের ট্রাইব্যুনালে যখন বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হবে, সেটিকে যাদুঘরে রূপান্তরিত করতে হবে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য।

‘বাংলাদেশ ওয়ার ক্রাইমস ট্রায়াল মিউজিয়াম’ এখন জাতির একটিই দাবি। যে চত্বরে ট্রাইব্যুনাল রয়েছে সেখানে যুদ্ধাপরাধ বিচার শেষ হলে চত্বরটিকে সংরক্ষণ করে একটি আন্তর্জাতিক মানের যুদ্ধাপরাধ বিচার যাদুঘর তৈরি করতে হবে। এর কোন অন্যথা হতে দেওয়া যাবে না।

দৃষ্টি আকর্ষণ করছি সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদের প্রতি:

“বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যমণ্ডিত স্মৃতিনিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহকে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”

অনুচ্ছেদটি আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহের অন্তর্গত এবং এ কারণে সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হবে না। কিন্তু তারপরও ‘মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বনাম বাংলাদেশ (২০১০) মামলা’-তে হাইকোর্ট ডিভিশন বাংলাদেশ সরকারকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ স্থান হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং দেশজুড়ে বধ্যভূমিসমূহ চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করার নির্দেশনা দেন।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বরটিও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। সুতরাং এ চত্বরটির বিকৃতি, বিনাশ এবং অপসারণ রোধ করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর তা যদি সরকার না করতে পারে তা হবে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের আত্মার সঙ্গে, পাঁচ লাখ বীরাঙ্গনা মা-বোনের সঙ্গে, এক কোটি উদ্বাস্তুর জীবনের সঙ্গে এবং লাখ লাখ নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা।

আর তাই ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর মেনে নেওয়া হবে না। জয় বাংলা!

 

 

লেখক: প্রসিকিউটর, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon