বিচার বন্ধে বিচারকদের সই জাল করে ভুয়া আদেশ তৈরি


প্রকাশিত :০৪.০১.২০১৭, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

judge-signতিনটি সিন্দুকের একটিতে ছিল ২৫০টি সোনার বার, দ্বিতীয়টিতে ৬০ লাখ টাকা, তৃতীয়টি ফাঁকা। গত বছরের ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরের রেয়াজউদ্দিন বাজারের বাহার মার্কেটের একটি জুতার গুদাম থেকে সিন্দুক তিনটি উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় যথারীতি চোরাচালানের অভিযোগে মামলা হয়, শুরু হয় তদন্ত। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। এরপরই লুকিয়ে থাকা ‘অদৃশ্য শক্তি’ তৎপর হয়ে ওঠে। মামলার বিচারকাজ বন্ধ করতে হাইকোর্ট থেকে ভুয়া আদেশনামা পৌঁছে যায় চট্টগ্রাম আদালতে।

গত বছরের ২৮ আগস্ট চোরাচালান মামলায় হাইকোর্ট ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন—এমন একটি জাল আদেশ তৈরি করা হয়। এরপর সেই জাল নথি নিয়ম মেনেই আসে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে। নথি পাওয়ার পর আদালত মামলার কার্যক্রম ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। কিন্তু এত বড় জালিয়াতির বিষয়টি গোপন রাখা যায়নি। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের নজরে আসে বিষয়টি। বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জাফর আহমেদকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছরের ১৫ নভেম্বর জালিয়াতির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন; পাশাপাশি স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বার কাউন্সিলকে আদেশ দেন।

হাইকোর্টের নির্দেশ পেয়ে সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার সালাহউদ্দিন আহমেদ গত বছরের ২০ নভেম্বর রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি প্রতারণা মামলা করেন। এতে চোরাচালান মামলার একমাত্র আসামি আবু আহম্মেদ ছাড়াও হাইকোর্টের কথিত আইনজীবী মো. আবদুল হক ও তদবিরকারী জহিরুল ইসলামকে আসামি করা হয়। তদন্তে আবদুল হক ও জহিরুল ইসলামের অস্তিত্ব পায়নি শাহবাগ থানার পুলিশ।

পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন আবু আহম্মেদ ও চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি মো. তসলিম উদ্দিন। তাঁরা দুজনই এখন কারাগারে আছেন। আবু আহম্মেদের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায়। নগরের পশ্চিম ষোলশহরের হিলভিউ আবাসিক এলাকায় তাঁর বাসা। আর অন্য একটি জালিয়াতির ঘটনায় গত বছরের ১৫ অক্টোবর তসলিম উদ্দিনের আইনজীবী সনদ স্থায়ীভাবে বাতিল করেছে বার কাউন্সিল।

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, জায়গা নিয়ে জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে মো. তসলিম উদ্দিনের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন বার কাউন্সিলের একটি ট্রাইব্যুনাল। তাঁর বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আছে।
প্রতারণা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আবু আহম্মেদ ও আইনজীবী তসলিম উদ্দিনকে গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা ছেড়ে দিই। পরে এই জালিয়াতির ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্ততা পেলে আমরা ১৫ ডিসেম্বর দুজনকে গ্রেপ্তার করি। এর মধ্যে আবুকে দুই দফায় চার দিন এবং তসলিমকে এক দফায় দুই দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।’

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সোনা চোরাচালান মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্টের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। এর মধ্যে একজন আইনজীবী কলকাতায় আছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বিশাল চক্রকে ধরা যাবে। তদন্তে কথিত আইনজীবীদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জালিয়াতির ঘটনাটি বিচারপতি নিজস্ব সূত্রে জানতে পেরেছেন। সেখানে আমার নামও ব্যবহার করা হয়েছে। মো. আবদুল হক নামের আরেক আইনজীবীর (আবু আহম্মেদের আইনজীবী) নাম ব্যবহার করা হয়েছে। আমি আবদুল হক নামের এক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও বিষয়টি জানতেন না। অর্থাৎ, একটি শক্তিশালী চক্র বিচারকদের সই জাল করেছে এবং রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা হিসেবে আমার নাম ও আইনজীবী আবদুল হকের নাম ব্যবহার করেছে।’

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার চোরাচালান মামলাটি তদন্ত করছেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক কেশব চক্রবর্তী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি তিনি আদালতের মাধ্যমে জেনেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলেন, ওই ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভাগীয় তদন্তও চলছে। সূত্র: প্রথম আলো

 

 
সম্পাদনা- ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon