বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ: সুপ্রিম কোর্ট


প্রকাশিত :০৭.০১.২০১৭, ৩:৫১ অপরাহ্ণ

hc-00সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ। এটিকে পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটিই করা হয়েছে।

উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে সংসদের হাতে প্রদান করে আনা সংবিধানের ষোড়ষ সংশোধনী গত বছর ৫মে হাইকোর্ট বাতিল ঘোষণা করেন।

এই সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল হওয়ায় উচ্চ আদালতের বিচারকদের অসদাচরণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্বেও অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি সরকার প্রণয়ন করছে না।

আদালত বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমাদের ব্যক্তিগত নয়, এটি পুরো বিচার বিভাগের বিষয়। কারণ ভারতে বিচারক নিয়োগে একটি আইন করা হয়েছিলো। ওই আইন বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করে বিধায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিল করে দিয়েছে।

আদালত আরও বলেন, পুরো বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রনহীন অবস্থার মধ্যে যাচ্ছে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কোনো শৃংখলা বিধিমালা নেই। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো আইন নেই। একটা শূন্যতা চলছে। শৃংখলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে একজন প্রধান বিচারপতি হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিলের ওপর শুনানির দিন ধার্যকালে বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) আপিল বিভাগ এসব মন্তব্য করে।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে শুনানির প্রস্তুতির জন্য চার সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সেই সময় আবেদনের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার আদালত আপিল শুনানির জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি শুনানির দিন নির্ধারণ করেন।

ওই সময় আবেদনের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ১৬তম সংশোধনী বাতিলের হাইকোর্টের রায় কয়েক শত পৃষ্ঠার। রায়ে সংসদ সদস্যদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। এটা দুভাগ্যজনক। রাষ্ট্রের দুটি অঙ্গের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ করতে রায়ে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, শুনানির প্রস্তুতির জন্য চার সপ্তাহ সময় চেয়েছি। রিটকারী মনজিল মোরসেদ বলেন, এটা জরুরি বিষয়। দ্রুত শুনানির দরকার। আদালত বলেন, আমরা বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি করতে চাই।

অ্যাটর্নি বলেন, এখন ক্রান্তিকাল। এই মামলাটি এমন যে আপনারা নিজেদের বিচার নিজেরাই করতে যাচ্ছেন। আদালত বলেন, আপনি একপেশে মন্তব্য করবেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দুঃখিত আমার বক্তব্যকে ভিন্নভাবে নেবেন না। হয়তো আমি আদালতকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে পারছি না।

আদালত বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কোনো শৃংখলা বিধিমালা নেই। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও বর্তমানে কোনো আইন নেই। একটা শূন্যতা চলছে। পুরো বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় আছে। শৃংখলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সব পেশারই একটি শৃংখলা বিধি থাকা দরকার। এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নিম্ন আদালতের একজন বিচারক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ দিয়ে বিচার বিভাগে কর্মরত আছেন এটা আশ্চর্যজনক। অ্যাটর্নি জেনেরেলের উদ্দেশে আদালত বলেন, আলাপ-আলোচনা ছাড়া আপনারা এমন কিছু করেন যা আমাদের উপর চাপিয়ে দেন। এতে আমরা বিষ্মিত হয়ে যাই। আলাপ-আলোচনা করে করলে হয়তো সমস্যার সৃষ্টি হতো না।

আদালত বলেন, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় আমরা সংবিধানের ৫ম, ৮ম ও ১৩তম সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছি। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রিটকারী পক্ষ তাড়াহুড়ো করে মামলার শুনানি করতে চায়। আদালত বলেন, উনাদের দোষ দেবেন না। এ ধরণের মামলা যত তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি করা যায় রাষ্ট্রের জন্য ততই কল্যাণকর। আমরা কোনো মামলাই ফেলে রাখি না।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যখন সংবিধান সংশোধন করা হয় তখনই বিচারক অপসারনের আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিলো। সেই আইন করা হয়েছে। কিন্তু ওই আইন ভাল না খারাপ তার বিচার হবে। যেহেতু ওই আইনের স্টেকহোল্ডার হলেন আপনারাই। এজন্য এই আইনের ওপর আপনাদের মতামত দেওয়া দরকার ছিল। আদালত বলেন, এ আইন আমরা দেখবো না। কারন যখন হাইকোর্টে ১৬তম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট মামলা বিচারাধীন তখন আপনারা তাড়াহুড়ো করে ওই আইনের খসড়া করেছেন। বিচারাধীন থাকাবস্থায় যে আইনের খসড়া করেছেন তা আমরা গ্রহণ করবো না। এটাই আমাদের বার্তা। বিষয়টি সরকারকে জানিয়ে দেবেন। আদালত বলেন, বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের সেতু বন্ধন হিসেবে যিনি কাজ করেন তিনি এখানে এসে এক ধরণের কথা বলেন, আবার মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদে গিয়ে ভিন্ন কথা বলেন। এটা ঠিক নয়। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সরকারের সময় আবেদন মঞ্জুর করে ৮ ফেব্রুয়ারি শুনানির জন্য দিন ধার্য করে দেন। একইসঙ্গে রিটকারী পক্ষকে আপিলের সার সংক্ষেপ দাখিলের নির্দেশ দেন।

এর আগে, বুধবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে সরকার। আপিলে সঙ্গে এর সার সংক্ষেপও জমা দিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়।

 

 
সুপ্রিমকোর্ট প্রতিনিধি/ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon