প্রধান বিচারপতির ছুটি এবং আনীত অভিযোগ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত


প্রকাশিত :১৬.১০.২০১৭, ১১:৩৫ অপরাহ্ণ

22551531_1822436844436553_696100491_n

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটি এবং বিদেশ গমন ইস্যুতে চলমান বিতর্কের পাশপাশি তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, অনিয়ম, দুর্নীতিসহ সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের আনীত ১১ টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পর আলোচনায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ মতামত জানতে ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডট কম সম্পাদক ড. বদরুল হাসান কচি মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য শ. ম. রেজাউল করিম; এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের প্রসিকিউটর ও ইষ্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি আইন বিভাগের চেয়ারপার্সন ড. তুরিন আফরোজের সাথে।

 

শ. ম. রেজাউল করিম

ছুটির আবেদনে প্রধান বিচারপতি অসুস্থতার কথা উল্লেখ করলেও দেশ ত্যাগের আগে লিখিত বক্তব্যে নিজেকে সুস্থ দাবি করেছেন, বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

শ. ম. রেজাউল করিম : মাননীয় প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার পূর্বে নিজেকে সুস্থ দাবি করলেও গণমাধ্যমকে দেয়া লিখিত বক্তব্যের কোথাও কিন্তু বলেননি যে তিনি অসুস্থতার কারণে ছুটির আবেদন করেননি। সেই বক্তব্যে তিনি লেখেননি যে তিনি ছুটির জন্য যে আবেদন করেছেন যা নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক তৈরি করেছে তা সঠিক বা বেঠিক এ নিয়ে কোনো ধরণের মন্তব্য করেননি। যেহেতু এ ব্যাপারে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি সেহেতু এটাই ধরে নিতে হবে যে উনার (ছুটির) আবেদনের প্রতিপাদ্য বিষয় বিবেচনা করেই ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে।

নৈতিক স্খলনসহ উত্থাপিত ১১ অভিযোগের ফলে প্রধান বিচারপতির শপথ ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করেন কি?

শ. ম. রেজাউল করিম : শুধুমাত্র নৈতিক স্খলন নয় বিচারকদের কোড অব কন্ডাক্ট রয়েছে অর্থাৎ আচরণবিধি। এই আচরণবিধির যে কোনো একটির ব্যত্যায় ঘটলে শপথ ভঙ্গ হয়। দেশ ছাড়ার আগে তিনি বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো হয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের প্রধান হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনিও শপথ গ্রহণ করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝানো হয়েছে মানে কি তিনি (প্রধানমন্ত্রী) অন্যের বোঝানো ভুল গ্রহণ করেন কিংবা তিনি ভুল বোঝানো দ্বারা প্রভাবিত হন? এ জাতীয় অভিযোগ করে প্রধান বিচারপতি কার্যত নিজের শপথই ভঙ্গ করেছেন।

আইনমন্ত্রী বলেছেন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করবে দুদক এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এ বিষয়টি সম্পর্কে কিছু বলুন…

শ. ম. রেজাউল করিম : দেখুন আইনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশে কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতি দায়িত্বপালনকালীন সময়ে সমস্ত দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন এছাড়া অন্যকেউ কোনো দায় থেকে মুক্ত হবার সুযোগ নেই। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা এ ধরণের কোনো অভিযোগ আসলে তা তদন্তের সুযোগ রয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বপ্রণোদিত হয়ে অনুসন্ধান করবে। অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেলে দুদক এজাহার রুজু করবেন। এরপর তদন্তে মাধ্যমে অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত পেলে চার্জশিট দাখিল করবেন। এ ক্ষেত্রে আলাদাভাবে কেউকে বাদী হবার প্রয়োজন পড়বে না। দুদক নিয়েই বাদী হয়ে মামলা করতে পারবে।

 

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ

ছুটির আবেদনে প্রধান বিচারপতি অসুস্থতার কথা উল্লেখ করলেও দেশ ত্যাগের আগে লিখিত বক্তব্যে নিজেকে সুস্থ দাবি করেছেন, বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ : আমার মনে হয় মাননীয় প্রধান বিচারপতির মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। কারণ, তিনি এর আগেও এক মুখে দুই কথা বলেছেন। ষোড়শ সংশোধনী রায়ে তিনিই এক জায়গায় বললেন বিচার বিভাগ স্বাধীন আবার তিনিই বলছেন সরকারের চাপে তিনি বিব্রত। একদিকে তিনি বলছেন বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকা উচিৎ অন্যদিকে তিনিই আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ না সেটা মনে করিয়ে দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন। ষোড়শ সংশোধনীতে যে ব্যক্তি বলেছেন দেশের সংসদ অপরিপক্ক, জনপ্রতিষ্ঠান অকার্যকর আবার তিনিই বলছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী। একবার তিনি বলছেন চাপকে ভয় পান না আবার বলছেন চাপে বিব্রত হয়ে তিনি বিদেশ চলে যাচ্ছেন! ফলে ছুটির আবেদনে প্রধান বিচারপতি অসুস্থতার কথা উল্লেখ করলেও দেশ ত্যাগের আগে লিখিত বক্তব্যে নিজেকে সুস্থ দাবি করায় আমার কাছে মনে হয়েছে উনার মানসিক স্থিতি নেই।

নৈতিক স্খলনসহ উত্থাপিত ১১ অভিযোগের ফলে প্রধান বিচারপতির শপথ ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করেন কি?

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ : এসমস্ত অভিযোগের প্রমাণিত হলে নিঃসন্দেহে শপথ ভঙ্গ হবে। তবে এক্ষেত্রে তদন্তের অবকাশ রয়েছে। অনেকেই ইনিয়ে বিনিয়ে বলছেন এতো অভিযোগ থাকলে বিচারের মুখোমুখি না করে উনাকে (প্রধান বিচারপতিকে) বিদেশ যেতে দেয়া হল কেন। আমি বলবো আমাদের সংবিধানে প্রিজামশন অব ইনোসেন্স এর একটা ব্যাপার রয়েছে। ফলে উনার দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে বিচারিক কোনো কর্মকাণ্ড কিন্তু এখনো শুরু হয়নি।

আইনমন্ত্রী বলেছেন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করবে দুদক এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এ ক্ষেত্রে আপনার অভিমত কি?

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ : কেউ আইনের উর্ধ্বে নন। উনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ দুদক নিজেও তদন্ত করতে পারে এবং অভিযোগের সত্যতার উপর ভিত্তি করে দুদক আইনে বিচার হতে পারে। এছাড়া অপরাধ যদি ফৌজদারি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইনেও আদালতে বিচার হতে পারে।

 

 



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon