সাত বছরে ভোক্তার অভিযোগ বেড়েছে শতগুণ


প্রকাশিত :১৭.১০.২০১৭, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

4ec3e1105cc2778560b03434e47122d3-59e4f21e12a30

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর কার্যক্রম শুরু করে ২০১০ সালের এপ্রিলে। ওই বছর অধিদফতরে অভিযোগ নিয়ে আসেন মাত্র ৭৩ জন ভোক্তা। আর চলতি বছরের দশ মাসেই অভিযোগকারীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, সাত বছরের ব্যবধানে অভিযোগকারী ভোক্তার সংখ্যা বেড়েছে ১০০ গুণেরও বেশি। অধিদফতর প্রতিষ্ঠার পর গত বছরই প্রথম অভিযোগকারীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়ায়।

এই সাত বছরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ৩২ হাজার ১৬৮টি প্রতিষ্ঠান। আদায় করা হয়েছে ২২ কোটি ১৮ লাখ টাকারও বেশি। এর মধ্যে অভিযোগকারীদের ২৫ শতাংশ হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৩০ লাখ টাকা।

২০০৯ সালের ২৮ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল থেকে বাজার তদারকির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ বাস্তবায়ন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিদফতরের কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে অভিযোগের সংখ্যা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, কার্যক্রম শুরুর প্রথম বছর ২০১০ সালে অভিযোগ জমা পড়েছিল ৭৩টি। পরের বছর জমা পড়ে মাত্র ৫টি। ২০১২ সালে ৬৯টি অভিযোগ জমা পড়লেও তার পরের বছর এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩২টিতে। ২০১৪ সালের ৫৩৭টির বিপরীতে পরের বছর অভিযোগ দায়ের হয় ২২৫টি। এই ‘উত্থান-পতনে’র ধারা শেষে ২০১৬ সালে অভিযোগের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৬২২টিতে। আর চলতি বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দশ মাসে অভিযোগ জমা পড়েছে সাত হাজার ৫৭৯টি। এরমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে সাত হাজার ১৪৯টি অভিযোগ। তদন্ত চলছে ৪৩০টির বিষয়ে। আগের বছরগুলোয় জমা হওয়া অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে সঙ্গে সঙ্গেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচার না থাকায় অধিদফতরে অভিযোগের সংখ্যা সেভাবে বাড়ছে না। বাজারে প্রতারিত হলেও অনেকে এখনও জানেন না কিভাবে, কোথায় প্রতিকার পেতে হয়। তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, ধীরে হলেও মানুষজন অধিদফতর সম্পর্কে জানছেন। ফলে তারা সচেতন হচ্ছেন, অভিযোগ নিয়ে আসছেন। দিনে দিনে এ সংখ্যা বাড়বে বলে তারা আশাবাদী।

সংস্থাটির বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের কথায়। পণ্যের মোড়কের গায়ে লেখা খুচরা মূল্যের চেয়ে বিক্রেতা তার কাছ থেকে দাম বেশি রাখার অভিযোগ নিয়ে এসেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে। এর আগেও তিনি আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। তার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সেই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছিল অধিদফতর। আদায় করা জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী হিসেবে পেয়েছিলেন মাহফুজুর রহমান। অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতেই এবারও অভিযোগ নিয়ে এসেছেন তিনি।

মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ভোক্তা হিসেবে কোথাও হয়রানির শিকার হলে কার কাছে, কিভাবে, কোথায় অভিযোগ করব জানা ছিল না। এখন জানি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর আমাদের (ভোক্তা) অধিকার নিয়ে কাজ করে। ইতোমধ্যে তাদের কাছে অভিযোগ দিয়ে সফলতা পেয়েছি। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে।’

শুধু মাহফুজুর রহমান নয়, ভোক্তা হিসেবে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য অভিযোগ নিয়ে আসছেন এমন অভিযোগকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত বছরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর বিভিন্ন ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৩২ হাজার ১৬৮টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ২২ কোটি ১৮ লাখ ৯৮ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এর মধ্যে দুই হাজার ৩৯৫ জন অভিযোগকারীকে জরিমানার ২৫ শতাংশ হিসেবে ৩০ লাখ ৫ হাজার ২১২ টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ২১ কোটি ৮৮ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৭ টাকা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে জমা হওয়া অভিযোগের মধ্যে পণ্যের মোড়কে লেখা নির্ধারিত দামের তুলনায় বেশি রাখার অভিযোগ এসেছে সবচেয়ে বেশি। এর সংখ্যা ১২ হাজার ৭৫১টি। এর মধ্যে মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের খুচরা বিক্রয়মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ইত্যাদি লেখা না থাকা, পণ্য ও সেবামূ্ল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা, নির্ধারিত মূল্যের অধিক দাবি করার অপরাধে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছয় কোটি ৫৬ লাখ ২২ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি, ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত পণ্য বিক্রি, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের প্রতারিত করা, প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করার অপরাধে ১২ হাজার ৭২০টি প্রতিষ্ঠানকে ১১ কোটি ৭৯ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ওজনে, বাটখারা বা ওজন মাপার যন্ত্রে, পরিমাপে, দৈর্ঘ্য মাপার ফিতা ইত্যাদিতে কারচুপির অভিযোগে এক হাজার ৭৪১টি প্রতিষ্ঠানকে ৬১ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া, নকল পণ্য তৈরি, মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রি, সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্নকারী কাজ করা, অবহেলার কারণে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য ইত্যাদির ক্ষতিসাধনের অপরাধে পাঁচ হাজার ৫৭৩টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে তিন কোটি ২১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫০ টাকা।

এক্ষেত্রে একই দোকান বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিকবার একাধিক ধারায় জরিমানা আরোপ ও আদায় করা হয়েছে বলে জানান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. মাসুম আরেফিন।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, ‘জনগণ আগের তুলনায় আরও বেশি সচেতন হচ্ছে। তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। ফলে কোথাও তারা অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে সে ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছেন।’ এ সংখ্যা যত বাড়বে অন্যায় তত কমবে বলে মনে করেন তিনি।

মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি। ভবিষ্যতে বিলবোর্ডে প্রচারণা চালানো হবে। এতে করে জনগণ আরও বেশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সম্পর্কে জানতে পারবে। জনগণ সচেতন হলে একদিকে যেমন ভোক্তা হিসেবে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারবে, তেমনিভাবে সেবা প্রদানকারী বা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করার সুযোগও কমে আসবে।’

জেলা পর্যায়ে অধিদফতরের কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম লস্কর আরও বলেন, ‘জনগণ তাদের অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসছে। আমরা আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আমাদের গণশুনানি কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে, বাজার অভিযানও বেড়েছে। জনগণ এর সুফল পাচ্ছে। জনগণ ভবিষ্যতে যেন আরও বেশি আস্থাশীল হয় সে ব্যাপারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কার্যক্রম সারাদেশেই রয়েছে। প্রতিটি জেলায় একজন করে সহকারী পরিচালক দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তা দেওয়া সম্ভব হবে।’

কে অভিযোগ করতে পারবেন?

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ধারা ২(৩) অনুযায়ী, কোনও ভোক্তা, একই স্বার্থসংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক ভোক্তা, কোনও আইনের অধীন নিবন্ধিত কোনও ভোক্তা সংস্থা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ বা তার পক্ষে অভিযোগ দায়েরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনও কর্মকর্তা, সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনও সরকারি কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী।

যেখানে অভিযোগ করা যাবে

মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ১ কারওয়ান বাজার (টিসিবি ভবন-৮ম তলা), ঢাকা, ফোন: +৮৮০২ ৮১৮৯৪২৫। জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র, টিসিবি ভবন- ৯ম তলা, ১ কারওয়ান বাজার ঢাকা, ফোন: ০১৭৭৭ ৭৫৩৬৬৮, ই-মেইল: nccc@dncrp.gov.bd।

উপ-পরিচালক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, টিসিবি ভবন, বন্দর টিলা, চট্টগ্রাম, ফোন: ০৩১-৭৪১২১২।

উপ-পরিচালক, রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, শ্রীরামপুর, রাজশাহী, ফোন: +৮৮০৭ ২১৭৭২৭৭৪।

উপ-পরিচালক, খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, টিসিবি ভবন, শিববাড়ী মোড়, খুলনা, ফোন: ০৪১-৭২২৩১১।

উপ-পরিচালক, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, মহিলা ক্লাব ভবন, বরিশাল, ফোন: +৮৮০৪ ৩১৬২০৪২।

উপ-পরিচালক, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সিলেট ফোন: ০৮২১-৮৪০৮৮৪।

উপ-পরিচালক, রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া, রংপুর, ফোন: ০৫২১-৫৫৬৯১।

এছাড়াও প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করা যাবে।

যেভাবে অভিযোগ করতে হবে

অভিযোগ অবশ্যই লিখিতভাবে করতে হবে। ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েবসাইট, ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বা অন্য কোনও উপায়ে অভিযোগ দায়ের করা যাবে।

অভিযোগপত্রের সঙ্গে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে। অভিযোগকারী তার পূর্ণাঙ্গ নাম, বাবা ও মায়ের নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করবেন।

অভিযোগ দায়েরের সময়সীমা

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ধারা ৬০ অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি কারণ উদ্ভব হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এই আইনের অধীনে অভিযোগ দায়ের করবেন। অন্যথায় অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না।

জরিমানার অর্থের ২৫ শতাংশ প্রদান

আমলযোগ্য অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত ও জরিমানা আরোপ করা হলে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ধারা ৭৬(৪) অনুযায়ী আদায় করা জরিমানার ২৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারীকে প্রদান করা হবে।

(রাফসান জানি/ বাংলা ট্রিবিউন)



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon