কেউ বিচারের ঊর্ধ্বে নয়


প্রকাশিত :২০.১০.২০১৭, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

0a6002ad9bd1d34e44839234fdab9e08-59e8c6db8a9cf

‘সংবিধান দেশের জন্য, জনগণের জন্য। ফলে আইন সবার জন্য সমান। দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতিসহ কেউই বিচারের ঊর্ধ্বে নয়।’ বৃহস্পতিবার বিকালে ‘বিচারের রাজনীতি, রাজনীতির বিচার’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিতে অংশ নিয়ে আলোচকরা এসব কথা বলেন।

বৈঠকিতে অংশ নেন- সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, সাংবাদিক স্বদেশ রায়, আইনজীবী ব্যারিস্টার রুমীন ফারহানা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ। শুক্রাবাদের বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ। পাশাপাশি শীর্ষ স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে সরাসরি বৈঠকি দেখানো হয়। বৈঠকি সঞ্চালনা করেন মুন্নী সাহা।

বৈঠকিতে অংশ নিয়ে সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি যোগদানের সাড়ে তিন মাস পর থেকেই একের পর এক তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। তার অনেক দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে। তার চাকরি জীবনের অনেক অনেক টাকার হিসাব ট্যাক্সের আওতায় পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৯১ সালের পর থেকে দেশে খোঁড়া গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হলেও অন্তত গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়েছে। এর ফলে একটু সুফল সবাই পাচ্ছে যে আমরা সবকিছু নিয়েই সমালোচনা করতে পারছি। সেহেতু বিচার বিভাগ নিয়েও সমালোচনা করা যাচ্ছে। দেশের জনগণ যেমন দেশের মালিক তেমনি বিচার বিভাগের মালিকও তো জনগণ। ফলে বিচার বিভাগের সমালোচনা জনগণকে করা উচিত।’

বৈঠকিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগ নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না। তবে জনগণের কাছে বিচার বিভাগকেও মুখোমুখি হতে হবে, এটা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা গণতান্ত্রিক দেশ। দেশ স্বাধীনের পরে বলা হল রাষ্ট্রের প্রতিটি স্থানে জবাবদিহিতা থাকবে। কিন্তু যদি বলা হয়, আমার জবাবদিহিতা আমি নিজেই করবো, তাহলে নিজেকেই নিজে প্রশ্নবিদ্ধ করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনভাবে বিচারবিভাগ সৃষ্টি হচ্ছে যে, যেন সৃষ্টিকর্তার পরে আমার অবস্থান। আমার ওপরে কারও কোনও হস্তক্ষেপ থাকবে না। এর মানে আমরা বিচারের ঊর্ধ্বে উঠে যাচ্ছি। কিন্তু কেউ বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। এটা মানতে হবে।’

ব্যারিস্টার রুমীন ফারহানা বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি যখন বিদেশ যাবেন বলে ছুটি চাইলেন তখন তার চিঠিতে বানান ভুল, তার স্বাক্ষরও সঠিক কি না তা নিয়ে নানা সংশয় রয়েছে। আবার তিনি যখন বিদেশে গেলেন তখন তিনি যে চিঠি রেখে গেলেন তখন ওই চিঠির প্রথমেই লিখলেন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। আবার তিনি যখন দেশে ছিলেন তখন কেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সামনে আনা হলো না। কেন তিনি বিদেশ যাওয়ার পরেই অভিযোগগুলো এলো?

তিনি আরও বলেন, ‘আবার যখন তিনি (প্রধান বিচারপতি) অসুস্থ বলে জানা গেলো তখন অনেকেই তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে অনুমতি পাননি। কিন্তু ওই সময়ই আইনমন্ত্রীসহ সরকারের অনেকেই দেখা করেছে। তাহলে এটা কিভাবে রাজনৈতিক না? এছাড়া তার বিরুদ্ধে যদি ২০১৫ সাল থেকেই অভিযোগ ওঠে থাকে তাহলে কেন সেটা বিচার করা হলো না। এই বিষয়গুলো নিয়ে নানা মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে এটা রাজনৈতিক কিনা তা জনগণের ওপরই ছেড়ে দিলাম, তারা বুঝবে।’

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এখন যে ঘটনা ঘটছে এমনই ঘটনা এরশাদ সর্বপ্রথম ঘটিয়েছিলেন। কামাল উদ্দিন যখন বিচার করছে তখন একজন একটি পত্রিকার খবর দেখিয়ে বললেন, স্যার আপনার তো বিচার নেই। তখন তিনি সেখান থেকে চলে এসে আইনজীবীদের সঙ্গে বললেন, আমি বিচার বিভাগে না থাকি বিচার বিভাগ বেঁচে থাকবে। এ নিয়ে অনেক প্রতিবাদ হয়েছে। এরশাদ ছিল স্বৈরাচারী সরকার। বর্তমান প্রধান বিচারপতি অসুস্থ হওয়ার পর তাকে কেউ দেখতে যেতে পারেনি কিন্তু এরশাদের সময় কামাল উদ্দিন আইনজীবীদের মাঝে যেতে পেরেছিলেন।’

সংবিধান যেহেতু আছে সেই মোতাবেক সবকিছু চলে, সংবিধান না মানলে অনেক কিছুই করা যায় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানে তো সবই আছে, বিচারপতির বিরুদ্ধে কিভাব বিচার করতে হবে। বিচারপতিদের অপসারণসহ যে যে পদক্ষেপ নেওয়ার আইন আছে সেই মোতাবেক নিতে হবে। সুতরাং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে এখান থেকে আলাদা করার সুযোগ নেই।’

বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ বলেন, ‘জুডিশিয়াল স্বৈরাচার ভয়াবহ বিষয়। প্রধান বিচারপতি রায় দিয়ে জুডিশিয়াল ডিক্টেটরশিপ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। বিবেক একটি আপেক্ষিক বিষয়। জবাবদিহিতা যদি বিবেকের কাছেই থাকে, তাহলে পৃথিবীর একটি গ্রুপ আছে- যারা বিচারপতি, এদেরই শুধুমাত্র বিবেক আছে, আর কারও বিবেক নাই, তা আমি মনে করি না। আমি মনে করি না, একজন বিচারপতির চেয়ে আমার বিবেকবোধ কোনও অংশে কম আছে। একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে হলেও তো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে। সুতরাং বিবেক জিনিসটি শুধুমাত্র বিচারপতিদের থাকবে, আর সাধারণ মানুষের থাকবে না, আমি তা বিশ্বাস করি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচারপতিরা এ দেশের যেকোনও ফরমেটেই হোক চাকরি করেন। ফলে তাদের জবাবদিহিতা থাকবেই। কিন্তু আমার জবাবদিহিতা আমিই করবো, এটা হতে পারে না। রাষ্ট্রপতি যেমন জবাবদিহি করেন, প্রধানমন্ত্রী যেমন জবাবদিহি করেন, তেমনি নিয়ম থাকা উচিত- বিচারপতিকেও সঠিক উপায়ে জবাবদিহি করতে হবে। দেশে তো আইন দু’টো নয়, আইন তো একটি দেশে একটিই। বিচারপতিদের জন্য আইন কেন আলাদা হবে। যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের দেওয়া চিঠি বন্ধ করেন, তার তো সেই পদে থাকার কোনও অধিকার নেই।’



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon