ক্রীড়া আইনের প্রয়োজনীয়তা


প্রকাশিত :০৯.১১.২০১৭, ৫:৪৮ অপরাহ্ণ

বেশ কিছুদিন ধরেই ক্রীড়া ক্ষেত্রে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেই চলেছে। তা সত্ত্বেও একটি বিস্তারিত ক্রীড়া আইন প্রণয়নের প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পাতানো খেলা ও খেলোয়াড়দের দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন অনুপস্থিত, এমনকি দণ্ডবিধি ১৮৬০ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এ এ সম্পর্কিত স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন মাজহারুল ইসলাম।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৩ সালে রেজুলেশন ৫৮/৫ এর মাধ্যমে ক্রীড়াকে শারীরিক কর্মদক্ষতা ও শান্তির উপায় হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ক্রীড়া এখন বিশ্বব্যাপী মুনাফা সৃষ্টিকারী ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, তাছাড়া বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে এর প্রচারণার কারণে ক্রীড়া খাত দ্রুতগতিতে উন্নত হচ্ছে। এ জন্য দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে স্বতন্ত্র ক্রীড়া আইনের বিস্তার ও বিকাশ হচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ক্রীড়া সংস্থা বা সমিতি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন জাতীয় ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে একেকটি স্বাধীন সরকারি সংস্থা। ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন ১৯৭৪’ দ্বারা এই সংস্থাগুলোর প্রতিষ্ঠা হয়।

যাই হোক ১৯৭৪ সালের এই আইনে খেলোয়াড়দের জন্য বিশদ নিয়ম ও বিধিমালা এবং কোনো বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থার উলেস্নখ নেই। তবুও এটি একটি প্রধান সংস্থা যা ক্রীড়ার উন্নয়ন এবং অন্যান্য ক্রীড়া সংগঠন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।

বিসিবি ও বাফুফে তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত। এই গঠনতন্ত্রে বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সংস্থা দুটি ঠিক কোন ধরনের সংস্থা তা আইনে স্পষ্ট করা হয়নি। এগুলো কোনো করপোরেট সংস্থা বা সাংবিধানিক সংস্থা নয়। এমনকি কোনো নিবন্ধিত সংঘও নয়। তবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বিধানগুলো আইসিসি ও ফিফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অন্যদিকে ক্রীড়া আইন মূলত বিভিন্ন আইনের সংমিশ্রণে একটি সমৃদ্ধ নিয়ম-কানুনের সমষ্টি যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শ্রম আইন, চুক্তি আইন, দ-বিধি, মেধাস্বত্ব আইন, টর্ট আইন, প্রতিযোগিতা আইন, কোম্পানি আইন, বীমা আইন, মেডিকেল আইন ও মানবাধিকার আইন।

ক্রীড়া আইনে মূলত থাকে বিভিন্ন প্রকার খেলাধুলার নিয়ম, এ সম্পর্কিত সংস্থা বা সংঘের গঠনাবলি, ক্রীড়াবিদদের মাদক দ্রব্যের ব্যবহার সম্পর্কিত বিধান, খেলোয়াড়দের আচার-আচরণ ও তাদের দ্বারা পরিচালিত ব্যবসা সম্পর্কিত বিষয়গুলো এবং পাতানো খেলায় অংশগ্রহণ সম্পর্কিত আইন। ক্রীড়া সম্পর্কিত অপরাধের সংজ্ঞা এবং সেগুলোর জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও এই আইনে থাকে।

বাংলাদেশের ক্রীড়া সম্পর্কিত আইনি বিষয়গুলো আলোচনার অন্যতম কারণ হচ্ছে এর ব্যাপক বিস্তার ও বাণিজ্যিকীকরণ। বেশ কিছুদিন ধরেই ক্রীড়া ক্ষেত্রে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেই চলেছে। তা সত্ত্বেও একটি বিস্তারিত ক্রীড়া আইন প্রণয়নের প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পাতানো খেলা ও খেলোয়াড়দের দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন অনুপস্থিত, এমনকি দণ্ডবিধি ১৮৬০ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এ সম্পর্কিত স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। তা ছাড়া হতাশার কথা হচ্ছে এই যে, একটি বিশেষ ক্রীড়া আইন প্রণয়নের বিষয়টি এখন পর্যন্ত জাতীয় নীতি বা কোনো পরিকল্পনার মধ্যে নেই। সুতরাং একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ক্রীড়া আইন অতি প্রয়োজন এবং যা হবে সব আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রের সব দিকগুলো যে আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এদিকে ২০১৬ সালে টিআইবি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ন্যায়পাল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। যদিও পুরো ক্রীড়াঙ্গনের চিত্রটা ওই রিপোর্টে উঠে আসেনি। বাংলাদেশে ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন মিলিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাটা প্রায় ৪০, সবই কমবেশি অনিয়মের কথা বাতাসে ওড়ে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও আছে দুর্নীতির অভিযোগ। তবে শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটকেই আনা হয় ওই প্রতিবেদনে। সেটিও মূলত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দুর্নীতির আলোচিত বিষয়গুলোই। ‘সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং পাতানো খেলা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধে টিআইবির তরফ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মতো বাংলাদেশের ক্রিকেটেও ম্যাচ গড়াপেটার মতো অনিয়মের প্রভাব পড়ছে। এটা বন্ধ করতে না পারলে খেলাটির পথ হয়ে পড়বে কণ্টকাকীর্ণ। ম্যাচ গড়াপেটার পূর্বাপর তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ম্যাচ গড়াপেটার সঙ্গে পাকিস্তানের ছয়জন, ভারতের পাঁচজন, বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুলসহ বিভিন্ন দেশের আরও কয়েকজনের নাম এসেছে। এটা থেকে বেরিয়ে ক্রিকেটকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা, সুশাসনের ঘাটতি, বোর্ড ও ক্লাব স্তরে রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিসিবি পরিচালনায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জের নানা দিকও তার কথায় উঠে আসে। ক্রিকেটের জন্য একজন স্বাধীন ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাবও করা হয় প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে পাতানো খেলা, স্পট ফিক্সিং এবং অন্য সব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্যও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। বিপিএলে পাতানো খেলায় একটি দলের সংশ্লিষ্টতার বিষয় তুলে এনে বলা হয়, খেলাটির এগিয়ে চলার পথে এসব বড় প্রতিবন্ধকতা সরানো জরুরী। একই সঙ্গে প্রয়োজন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতির বিচারে সুনির্দিষ্ট আইনের ঘাটতি দূর করা।

প্রসঙ্গত ক্রীড়া আইন অপরিহার্য বেশ কিছু কারণে। যেমন : ক. ক্রীড়ার বিকাশ সাধন করতে সমাজের বিভিন্ন সংঘ সংস্থার করণীয় নির্ধারণকল্পে; খ সকল ক্রীড়া সংস্থা ও সংঘের স্বীকৃতি প্রদান ও আইনের আওতায় রেখে সরকার কর্তৃক তহবিল প্রদান ও তার সঠিক ব্যবহারকল্পে; গ. তহবিল প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের নেয়া কার্যক্রমের সঠিক মূল্যায়ন এবং পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণকল্পে। সর্বোপরি একটি স্বাধীন স্থায়ী তত্ত্বাবধায়কের পদ তৈরির মাধ্যমে ক্রীড়া ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। এছাড়া ক্রীড়া সম্পর্কিত আইনি সমস্যা ও বিরোধ মোকাবেলার জন্য একটি ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা ক্রীড়া আইনে থাকা বাঞ্ছনীয়।

উপরন্তু আইন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রীড়াক্ষেত্রে উচ্চতর গবেষণা ও ক্রীড়া আইনের ওপর বিশেষ কোর্স চালু করা যেতে পারে। পরিবর্তনশীল বিশ্বে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য ক্রীড়া আইনে বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে। এজন্য একটি উন্নত, স্বতন্ত্র ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ক্রীড়া আইন প্রয়োজন যা ক্রীড়াক্ষেত্রের উদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উত্তরণ ও ক্রীড়াক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একত্রকরণের মাধ্যমে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনে সাহায্য করবে।

 

লেখক: পিএইচডি গবেষণারত সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লি, ভারত।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon