বাদী হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় আসামি হলেন সাংবাদিক


প্রকাশিত :০৯.১১.২০১৭, ১:৪৬ অপরাহ্ণ

৫৭ ধারার মামলায় আসামি হয়ে ১ নভেম্বর থেকে জেল হাজতে আছেন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দৈনিক সংবাদ পত্রিকার প্রতিবেদক আনিছুর রহমান। তার অপরাধ, প্রায় দেড় মাস আগে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে দেওয়া আপত্তিকর একটি পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়েছিলেন তিনি। এরপর পাশে বসে থাকা শাহ কামাল নামের এক যুবলীগ নেতা প্রমাণ হিসাবে তা শেয়ারইটের মাধ্যমে নিজের ফোনে নিয়ে পোস্টদাতার বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেন। এরপর ওই পোস্টদাতাকে আসামি করে ৫৭ ধারায় মামলা দায়েরের জন্য সাংবাদিককে আনিছুরকে আহ্বান জানান পুলিশ। কিন্তু, তিনি মামলায় জড়াতে রাজি না হয়ে পুলিশের প্রস্তাব একাধিকবার ফিরিয়ে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ৩১ অক্টোবর ৫৭ ধারার ওই মামলার অভিযোগপত্রে সাংবাদিক আনিছুর রহমানের নামও সংযুক্ত করে দেয় পুলিশ।

সাংবাদিক আনিছুর রহমানের স্ত্রী মিনু রহমান, মামলার বাদী শাহ কামাল, রৌমারী প্রেসক্লাবের সভাপতি সুজাউল ইসলাম সুজা, রৌমারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সিরাজুল ইসলাম সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সাংবাদিক আনিছুর রহমানের স্ত্রী মিনু রহমানের অভিযোগ, রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম এবং সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (রৌমারী সার্কেল) সিরাজুল ইসলাম কয়েকবার আনিছকে ওই মামলার বাদী হতে বলেন। কিন্তু মামলার বাদী হতে রাজি না হওয়ায় আনিছকে আসামি করে সাজানো মামলা করা হয়। এতে স্থানীয় কিছু মাদক ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা ইন্ধন দিয়েছে বলেও দাবি করেছেন মিনু।

মিনু আক্তার বলেন, ‘রৌমারী এলাকার প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন আনিছ। এছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও পুলিশের সখ্যতা নিয়ে প্রতিবেদন করেন তিনি। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এক নম্বর সাক্ষী যাদুচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন সবুজ নিজেও আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি দখল করে রেখেছেন।’

গত ১ নভেম্বর আনিছকে গ্রেফতার করে কুড়িগ্রাম জেলহাজতে পাঠানোর পর ৪ নভেম্বর আনিছের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তার ফোন ও কম্পিউটার জব্দ করে নিয়ে যায় পুলিশ।

এ ব্যাপারে গ্রেফতারকৃত সাংবাদিকের স্ত্রী মিনু আক্তার আরও বলেন, ‘আনিছকে গ্রেফতারের পর গত ৪ নভেম্বর সার্কেল এএসপি সিরাজুল ইসলামসহ পুলিশের কয়েকজন সদস্য বাড়িতে এসে আনিছের ফোন ও কম্পিউটার জব্দ করে নিয়ে যান। এসময় সার্কেল এএসপি সিরাজুল আলম আমাকে বলেন, ‘‘আনিছ ভাইকে বারবার বললাম অপনি বাদী হন। কিন্তু তিনি বাদী হলেন না। তিনি বাদী হলে আজ আসামি হয়ে জেলে থাকতে হতো না’’।’

মামলার বাদী শাহ কামাল জানান, তিনি আনিছের কাছ থেকে ওই ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে সেটি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে থানায় অভিযোগ করেন। সুমন মিয়া নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে পোস্টটি করা হয়েছিল। তার দায়ের করা প্রথম অভিযোগপত্রে সাংবাদিক আনিছের নাম ছিল না বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে পরে কেন আনিছের নাম যুক্ত করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে মামলার বাদী শাহ কামাল বলেন, ‘মোবাইলে এতো কিছু বলা সম্ভব নয়।’

এদিকে রৌমারী প্রেসক্লাবের সভাপতি সুজাউল ইসলাম সুজা বলেন, ‘প্রেসক্লাবের সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম সাজু, সাবেক সহসভাপতি এস এম সাদেক হোসেন ও আমার সামনে বসেই আনিছকে মামলার বাদি হওয়ার প্রস্তাব দেন রৌমারী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম এবং সার্কেল এএসপি সিরাজুল ইসলাম। কিন্তু আমরাই তাকে বাদী হতে নিষেধ করি। কারণ আমরা সারা দেশের সাংবাদিক সমাজ ৫৭ ধারা বাতিলের জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। সেখানে সাংবাদিক হয়ে আমরা কিভাবে ওই মামলার বাদী হই!’

এ ব্যাপারে রৌমারী সার্কেলের এএসপি সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘পুলিশ এ মামলার বাদী নয়। সুতরাং আনিছের বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা দায়েরের অভিযোগটি ঠিক নয়।’

সাংবাদিক আনিছকে মামলার বাদী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এএসপি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এটা প্রথম দিকের কথা। ঘটনার প্রথমদিকে আমার বিস্তারিত জানা ছিল না এবং পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে মামলার ব্যাপারে নির্দেশনা ছিল না। পরবর্তীতে পুলিশ হেড কোয়ার্টারের নির্দেশনা মোতাবেক মামলা রুজু করা হয়েছে।’

এএসপি সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘স্ক্রিনশট নেওয়া অপরাধ নয়, শেয়ার করা অপরাধ। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে বলা যাবে কে প্রকৃত দোষী আর কে দোষী নয়।’

সাংবাদিক আনিছকে যে মামলায় আসামি করে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাকে সেই মামলার বাদী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনেক আগের ঘটনা, তেমন কিছু বলা হয়েছিল কিনা এখন মনে করতে পারছি না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত সাংবাদিক আনিছ ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। ছাত্র-জীবনে ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি। প্রায় দেড় মাস আগে আনিছ তার পরিচিত স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা শাহ কামালের সঙ্গে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে বসে তার ফেসবুক পেজ দেখছিলেন। সেসময় তিনি তার ওয়ালে দেখতে পান একই এলাকার ধনারচর গ্রামের আব্দুল্লাহ মিয়ার পুত্র সুমন মিয়া (২৪) নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিকৃত ছবি পোস্ট করা হয়েছে। তিনি বিষয়টি শাহ কামালকে জানান। এ সময় শাহ কামাল সাংবাদিক আনিছকে ওই ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে তার মোবাইলে শেয়ার ইটের মাধ্যমে দিতে বলেন।

এরপর শাহ কামাল ওই স্ক্রিনশট জমা দিয়ে সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে রৌমারী থানায় একটি অভিযোগ করেন। পুলিশ গত দেড় মাসে সুমন মিয়াকে গ্রেফতার না করে অভিযোগকারী শাহ কামালের পরিবর্তে সাংবাদিক আনিছকে মামলার বাদী হওয়ার প্রস্তাব দিতে থাকে। কিন্তু সাংবাদিক আনিছ পুলিশের প্রস্তাবে রাজি হতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, ভূমিদস্যুতার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আছে এমন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ইন্ধনে পরবর্তীতে মামলায় আনিছের নাম যুক্ত করেছে পুলিশ।

-বাংলা ট্রিবিউন

 

সম্পাদনা- ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon