পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন এসকে সিনহা


প্রকাশিত :১২.১১.২০১৭, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

সিঙ্গাপুরে বসে স্বাক্ষর করা প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগপত্র গতকাল সকালে বঙ্গভবনে এসে পৌঁছে। কী লিখেছেন তার পদত্যাগপত্রে তা জানতে মানুষ উদগ্রীব ছিল। কী কারণে পদত্যাগ করলেন- এ বিষয়ে প্রশ্নও ছিল সবার মুখে মুখে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব এবং ‘মানসিক ও শারীরিক’ কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। তার পরিবারের অন্তত দুজন সদস্য গণমাধ্যমকে পদত্যাগের কারণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সিনহার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে যে পদত্যাগপত্রটিতে তিনি স্বাক্ষর করেন, তা লিখেন ইংরেজিতে। পদত্যাগপত্রে বিচারপতি সিনহা বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। মন্ত্রিসভার কয়েক সদস্য বিষয়টি নিয়ে সংসদে এবং সংসদের বাইরে নানাভাবে কটাক্ষ করে বক্তব্য দেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সামগ্রিক দিক বিবেচনায় আমি মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করছি। এ অবস্থায় আমার পক্ষে প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। তাই আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তার পারিবারিক সূত্র আরও জানায়, বিচারপতি এসকে সিনহা দেশে ফিরে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে ফেরায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার পরিবার। পরিবারের সদস্যরা তাকে সিঙ্গাপুরে বসেই পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে রাজি করান। এক্ষেত্রে তার দুই মেয়ে, স্ত্রী, ভাই ও ভাতিজা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশে ফিরে ঝামেলার মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে বিদেশে শান্তিতে বাকি জীবন কাটানোর পথ বেছে নেওয়ার জন্য বিচারপতি সিনহাকে তাগিদ দেন তারা।

এদিকে প্রধান বিচারপতির পদ ছাড়ার আগেই কানাডার টরেন্টোতে এস কে সিনহার জন্য বাড়ি ভাড়া করা হয় বলে জানিয়েছে সেখান থেকে প্রকাশিত একটি গণমাধ্যম। টরেন্টো পৌঁছার পর সিনহা কারো সঙ্গে কথা বলছেন না বলে জানিয়েছে ‘নতুন দেশ’ নামের গণমাধ্যমটি। সেখানে সিনহার অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার বিকালে সিঙ্গাপুর থেকে টরেন্টোর পিয়ারসন ইনটারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর সিনহাকে ডাউন টাউনে ভাড়া করা একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেটি তার থাকার জন্যই ভাড়া নেয়া হয়েছিল। বাড়িতে পৌঁছার পর ঘনিষ্ঠজন ছাড়া সিনহা কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন না।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাউকে ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। আবার বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের ঘটনাও এই প্রথম। ফলে রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের একটির প্রধান ব্যক্তির এ পদত্যাগ ৪৭ বছরের বাংলাদেশকে নতুন একটি অভিজ্ঞতার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এ ঘটনাটিকে ‘কলঙ্কজনক অধ্যায়’ আখ্যায়িত করে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বলে মনে করলেও বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জলঘোলা হওয়ার কোনো কারণ দেখছেন না।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ তুলে নানা আলোচনার জন্ম দেন বিচারপতি সিনহা। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধান নিয়ে সরকারের নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে তার বিরোধ দেখা দেয়। অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তার বাদানুবাদ বিচারাঙ্গন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়িয়েছিল। এর পর সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপন নিয়েও সরকারের সঙ্গে টানাপড়েন চলে বিচারপতি সিনহার।

সবচেয়ে বেশি টানাপড়েন দেখা দেয় অধস্তন আদালতের বিচারকদের আলাদা আচরণ ও শৃঙ্খলা বিধি তৈরি নিয়ে। এ বিধির গেজেট জারি করতে বারবার সরকারের পক্ষে সময় চাওয়ায় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এ বিষয় নিয়ে শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন মন্তব্য করেও বেশ আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েন।

এর পর সর্বশেষ উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিয়ে করা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে বড় ধরনের টানাপড়েনের মধ্যে পড়েন এসকে সিনহা। এ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশিত হয় ১ আগস্ট। ওই রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও সরকার-সমর্থক আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। কেউ কেউ তার পদত্যাগের দাবি তোলেন। সরকার-সমর্থক আইনজীবীরা তার পদত্যাগের আলটিমেটামও দেন। পাশাপাশি রায়ে প্রধান বিচারপতির দেওয়া পর্যবেক্ষণও স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানান। তবে বিএনপিসহ কিছু দল এ রায়কে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।

সমালোচনার মধ্যেই ২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হঠাৎ করেই এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে চিঠি দেন। পরের দিন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়াকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পর আইনমন্ত্রী জানান, প্রধান বিচারপতি ক্যানসারে আক্রান্ত। পরে ১১ অক্টোবর চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতির এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার ছুটি ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

গত ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন এসকে সিনহা। দেশ ছাড়ার আগে তিনি তার বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। বিচার বিভাগের স্বার্থে আবার ফিরে আসব। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে একটি মহল প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন।’ তিনি একটি লিখিত বিবৃতিও সাংবাদিকদের দিয়ে যান। পরের দিন ১৪ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ ওঠার পর তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে চাননি আপিল বিভাগের বিচারপতিরা। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতির দেশে ফেরা নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়।

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা একাই অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে আসেন। সেখানে উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধানে দফায় দফায় সমঝোতা বৈঠক করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাসহ তৃতীয় একটি পক্ষও ছিল। বৈঠকে এসকে সিনহা ১১ অভিযোগের বিষয়টি নিষ্পত্তি করে সম্মানজনকভাবে দেশে ফিরে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য এজলাসে বসতে চেয়েছিলেন। অন্যথায় পদত্যাগ করতে চান। সূত্রটি আরও জানায়, কিছু দিন আগে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর মাধ্যমে এ দেশ থেকে ই-মেইলযোগে পদত্যাগপত্রের খসড়া নেন। এর পর পদত্যাগপত্র প্রধান বিচারপতি নিজেই চূড়ান্ত করেন এবং তা সঙ্গে করেই সিঙ্গাপুরে আসেন। আপিল বিভাগের বিচারপতিরা আগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসে বিচারকার্য পরিচালনায় অপারগতা প্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়ায় মূলত সমঝোতার বিষয়টি ভেস্তে যায়।

-আমাদের সময়

 

সম্পাদনা- ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon