পারিবারিক আদালতে নারীর অধিকার ও স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটছে!


প্রকাশিত :১২.১১.২০১৭, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সিরাজ প্রামাণিক

সুমি খানম’র দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের মামলা কুষ্টিয়া আদালতে বিচারাধীন। দুই বছর আগে মামলা করেছেন তিনি। মামলা দায়েরের পর বিবাদীর কাছে সমন (মামলা সংক্রান্ত নোটিশ) জারি করতে আদালতের সময় লেগেছে এক বছর। এরপর প্রায় এক বছর ধরে বিচারকাজ চললেও মামলার খুব একটা অগ্রগতি নেই। অপরপক্ষ আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ায় তদবির করে মামলার ধার্য তারিখ দু-তিন মাস পর পর বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে খোরপোষের এ মামলা যে কবে শেষ হবে, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বাবার বাড়িতে নাবালক দুই সন্তানকে নিয়ে একারণে নিদারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তার। খোরপোশের মামলা নিষ্পত্তি হতে এত সময় লাগার কারণে তিনি ইতোমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলেছেন।

পারিবারিক আদালতে মামলা ঠুকেছেন সালমা খাতুন। ২০০৯ সালের জুনে একই গ্রামের কামাল মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়েতে দেড় লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য হয়। পরবর্তীতে সালমা ও কামালের দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি হলে সালমা দেনমোহরের এক লাখ টাকা দাবি করে নির্ধারিত পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত সালমার পক্ষে রায় দেন। কামাল মিয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। যথাসময়ে নিম্ন আদালত থেকে সালমা রায় পেলেও উচ্চ আদালতে দায়ের হওয়া নতুন এই আপিল মামলা চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য ও মনোবল তার নেই। মামলা করে যেন আরো বেকায়দায় পড়েছেন তিনি।

অধিকার আদায়ের সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে নারীরা আশ্রয় নেন পারিবারিক আদালতে। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, মামলা চালানোর অর্থাভাব, অপর পক্ষ থেকে মানসিক চাপ সবমিলিয়ে নারী হয়ে পড়ে চরম দুর্দশাগ্রস্থ। কারণ পারিবারিক আদালতে স্বল্প খরচে স্বল্প সময়ে মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হয় না। একজন নারী যিনি দেনমোহর বা মোহরানা আদায়ের মামলা দায়ের করবেন, তাকে যদি বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয় তাহলে ন্যায়বিচারের আশা উবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারলেই যেন রেহাই পান আবেদনকারিণী। যাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় তাদের আদালতযোগে সমন পাঠানো হলেও সমন জারিকারকদের উদাসীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে যথাসময়ে সমন জারি হয় না। ফলে বিচারকাজ শুরু হতে অযথাই দেরি হয়। কখনো আবার ভুক্তভোগী নারীর পক্ষে পারিবারিক আদালত রায় কিংবা ডিক্রি প্রদান করলেও অপর পক্ষ উচ্চ আদালতে ওই ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল করে। এতে আবেদনকারী নারীটির প্রাপ্য অধিকার দীর্ঘসূত্রতার জালে আবদ্ধ হয়। এভাবেই পারিবারিক আদালতে নারীর স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে কখনো কখনো।

বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৫ সালে প্রণয়ন করে ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ’। কিন্তু প্রণয়নের পর থেকেই আইনের ভাষ্য ও এর প্রয়োগ নিয়ে নানারকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান বিভ্রান্তি হচ্ছে আইনটির অধীনে কোন কোন জনগোষ্ঠী আদালতের কাছে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে যেতে পারবে? আইনটি কি শুধু মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্যই? এই বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কারণ আইনটির ৫ ধারায় বলা হয়েছে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর বিধান সাপেক্ষে পারিবারিক আদালতের নিম্নোক্ত বিষয়গুলোয় বিচার করার এখতিয়ার থাকবেঃ বিয়েবিচ্ছেদ, দেনমোহর, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারি।

আইনের এই বিভ্রান্তি পরে অবশ্য আদালতের বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী রায়ের মধ্য দিয়ে নিরসন হয়েছে। যেমন কৃষ্ণপদ তালুকদার বনাম গীতশ্রী তালুকদার ১৪ বিএলডি (হাইকোর্ট), ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ৪১৫ মামলাটি উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ কেবল মুসলিমদের জন্য পারিবারিক আদালতগুলো গঠিত বলে অভিমত দিয়ে বলে, ‘যেহেতু পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর ৫ ধারায় স্পষ্ট করে বলা আছে, পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর সাপেক্ষে নির্ধারিত হবে। তাই একথা বলার আর অবকাশ থাকে না যে, অধ্যাদেশের ৫ ধারায় যে পাঁচটি বিষয়ে যেমন বিবাহ-বিচ্ছেদ, মোহরানা, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারিত্ব পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার আছে, এসব ক্ষেত্রে শুধু মুসলিম প্রার্থীরাই আদালতের কাছে আসতে পারবে।’

নির্মল কান্তি দাস বনাম শ্রীমতী বিভা রানী ১৪, বিএলডি (হাইকোর্ট) ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ৪৬৭ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ সম্পূর্ণ ভিন্ন রায় প্রদান করে। আদালত তার রায়ে বলে, ৫ ধারায় যাই থাকুক না কেন, ৩ ধারায় কিন্তু এ কথা বলা আছে যে বাংলাদেশে প্রচলিত ‘অন্য যে আইনে’ যে বিধানই থাকুক না কেন, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ প্রাধান্য পাবে। এ থেকে বোঝা যায় মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, ১৯৮৫ সালের অধ্যাদেশের অধীনে থাকবে। তাই এ মামলায় আদালত তার রায়ে বলল, এই কারণে একজন মুসলমান স্ত্রীর মতো একজন হিন্দু মহিলাও ভরণপোষণের জন্য পারিবারিক আদালতে অবশ্যই মামলা করতে পারবে। এরপর মেহের নিগার বনাম মো. মজিবুর রহমান মামলাতেও আদালত একই রকম রায় প্রদান করে।

এই দুটি মামলার রায় থেকে দেখা গেল যে, হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চগুলো বিষয়টিতে একমত হতে পারছিল না। আর এ কারণে নিম্ন আদালতে উচ্চ আদালতের এই রায়কে নজির হিসেবে পেশ করাতে বেশ ঝামেলা হচ্ছিল।

তবে ১৯৯৭ সালে পচন ঋষি দাস বনাম খুকু রানী দাস এবং অন্যান্য ৫০ ডিএলআর (হাইকোর্ট), পৃষ্ঠা ৪৭ মামলার রায়ে আদালত যে মতামত প্রকাশ করে, তার ফলে সব ধরনের দ্বিধার অবসান ঘটে। রায়ে আদালত বলে, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে বসবাসকারী সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এর কারণ প্রথমত, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ যে কেবল মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য, তা আইনের নাম দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এই উদ্দেশ্য যদি পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর প্রণেতাদের প্রভাবিত করত, তাহলে আইনটির নাম হওয়া উচিত ছিল মুসলিম পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫। তা কিন্তু হয়নি। দ্বিতীয়ত, আইনের কোথাও কিন্তু কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীকে বাদ দেয়া হয়নি। আবার কোথাও কিন্তু এটাও বলা হয়নি, আইনটি কেবল মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য। তৃতীয়ত যারা বলে থাকেন, অধ্যাদেশের ৫ ধারায় যে পাঁচটি বিষয়ে আদালতের যে এখতিয়ার আছে, তার সব কটিই যেহেতু মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তাই স্বভাবতই বলা যায়, আইনটি আসলে মুসলমানদের জন্যই। এই যুক্তি খন্ডন করে আদালত বলে, কোনো কোনো বিষয় কোনো একটি ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে না বলেই সম্পূর্ণ আইনটিই তাদের জন্য অপ্রযোজ্য বলা যাবে না। সুতরাং সব মিলিয়ে বলা যায়, পারিবারিক আদালতে যে পাঁচটি বিষয়ের বিচার করা হয়ে থাকে, সে বিষয়গুলোর যখনই কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে মিলে যাবে, তিনিই আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন প্রতিকারের জন্য।

এছাড়া জামিলা খাতুন বনাম রুস্তম আলী ৪৮ ডিএলঅঅর (আপিল বিভাগ) পৃষ্ঠা ১১০ মামলায় দরিদ্র বাবা মা পারিবারিক আদালতে তাদের সামর্থ্যবান সন্তানদের বিরুদ্ধে ভরণপোষণের মামলা দায়ের করতে পারেন। সামর্থ্যহীন আত্মীয়-স্বজন, এমনকি স্ত্রীর চাকরও ভরণপোষণের জন্য মামলা দায়ের করতে পারে।

শাহ আলম বনাম ফরিদা বেগম ২ এমএলআর (আপীল বিভাগ) পৃষ্ঠা-১৫৩ মামলায় কোন নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল কি-না এমন প্রশ্ন উপস্থাপন না হওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক আদালত উক্ত বিষয় নিষ্পত্তি করতে এখতিয়ার সম্পন্ন মর্মে মহামান্য আপলি বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ এর ধারা ৪ অনুসারে পারিবারিক আদালত স্থাপিত। পারিবারিক সমস্যা নিয়ে এ আদালতে মামলা দায়ের করা যায়। এই আদালতের উদ্দশ্যে হল অল্প খরচে ও অল্প সময়ে নারীদের অধিকার দ্রুত নষ্পিত্তি করা। জেলা জজকোটে প্রতিটি উপজেলার জন্য একটি করে পারিবারিক আদালত আছে। এই আদালতের প্রধান একজন সহকারী জজ। বর্তমানে পারিবারিক সমস্যা বিচার করার এখতিয়ার শুধুমাত্র পারিবারিক আদালতের; কিন্তু‘ আগে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতেও বিচার করা যেত। তবে বিচার শুরু করার আগে পারিবারিক আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল আপোস-মিমাংসার চেষ্টা করা। যদি আপোস-মিমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হয় তবে আদালত তার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। এই বিচার ওপেন কোর্টেও হতে পারে আবার রুদ্ধদ্বার কক্ষেও হতে পারে। যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত লিখিত রায় ও ডিক্রি দিবে। আদালত ডিক্রির টাকা যে কোনভাবে পরিশোধের আদেশ দিতে পারেন (কিস্তির মাধ্যমেও)। আদালত ডিক্রির টাকা অনাদায়ে বিবাদীকে ৩ মাস বা টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কারাদন্ড দিতে পারেন। সংক্ষুব্ধ পক্ষ ইচ্ছা করলে আদালতের রায়, ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজের আদালতে আপীল করতে পারবেন। তবে মোহরানা ৫০০০ টাকার বেশী না হলে কোন আপীল করা যাবে না। কেউ যদি পারিবারিক আদালত অবমাননার দায়ে (ধারা ১৯) দোষী হয় তবে আদালত তার জরিমানা করতে পারেন যা ২০০ টাকার বেশী হবে না। সমস্যা যে জেলায় উদ্ভব হয় সেই জেলার পারিবারিক আদালতে বা স্বামী-স্ত্রী সর্বশেষ যে জেলায় বসবাস করেন সেই জেলার আদালতে বা স্ত্রী যে জেলায় বসবাস করছেন সেই জেলার পারিবারিক আদালতে মামলা করা যাবে।

যুগোপযোগী ও দ্রুততর বিচারিক পদ্ধতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে পারিবারিক আদালতকে ‘নারীবান্ধব আদালতে’ পরিণত করা জরুরি। ভাগ্যবিড়ম্বিত একজন অসহায় নারী যখন তার ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইন-আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে কোনো নারী যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। আইনজীবী ও বিচারকসহ আদালত সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ধরনের মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরো আন্তরিক ও যত্নবান হওয়া উচিত। বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া, যথাসময়ে সমন জারি না হওয়া এবং পারিবারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর ধরে আপিল-মামলা ঝুলে থাকা কিংবা অন্য কোনো জটিলতার কারণে কোনো নারী পারিবারিক আদালতে আশ্রয় গ্রহণ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেললে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা দরকার। সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক বিষয়ে উদ্ভূত সমস্যাগুলো নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আগে পারিবারিকভাবেই উভয় পক্ষের সম্মতিতে সমাধান করা হলে সেটা আরো বেশি কল্যাণকর। আদালতের সীমাবদ্ধতার এ জায়গাটায় এগিয়ে আসতে পারেন স্থানীয় গ্রাম আদালতও।

 

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইন গ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon