প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ


প্রকাশিত :১২.১১.২০১৭, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারিতে দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেছিলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা। এরপর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। সম্প্রতি নানা বিতর্কে জড়িয়ে ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যান এসকে সিনহা। বেরিয়ে আসে অন্তরালের কিছু খবরও। এর মধ্যেই শুক্রবার রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি।

শুরুর দিকে তিনি দেশের আদালত ব্যবস্থায় বিচারকাজ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ ও আদালতগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনসহ সবাইকে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমের নির্দেশনা জারি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই এক সময় সুপ্রিম কোর্টের কজ লিস্ট (দৈনন্দিন মামলার কার্যতালিকা) কাগজের পরিবর্তে ওয়েবসাইটের আওতায় আনা হয়। এতে আইনজীবীরা ছাড়াও মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সহজেই তার মামলা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে পারেন। বিপুল অর্থেরও সাশ্রয় হয়। তিনি সুপ্রিম কোর্টে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর ফলে গরিব বিচারপ্রার্থীরা উপকৃত হন। আদালতে মামলার চাপ কমাতেও আইনজীবীদের আহ্বান জানান তিনি।

এসকে সিনহা প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বলেন, অবসরে গেলে কোনও বিচারপতি রায়ে স্বাক্ষর করতে পারবেন না। এই কারণে তিনি আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন মানিকের অবসরের পর পেনশন বন্ধ করেন। যা নিয়ে এসকে সিনহার সঙ্গে শামসুদ্দিন মানিকের মতবিরোধ দেখা দেয়।

এরপর ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে একটি বইমেলার উদ্বোধন করতে গিয়ে এসকে সিনহা অভিযোগ করেন, সরকারের নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগ থেকে ক্ষমতা নিয়ে নিতে চাচ্ছে। তার এমন মন্তব্যে সরকার অস্বস্তিতে পড়ে।

দেশের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলীসহ বেশ কিছু চূড়ান্ত রায় আসে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ থেকে।

তবে ২০১৬ সালে ৭ জুন জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাজে হতাশা প্রকাশ করেন এসকে সিনহা। এসময় প্রসিকিউটরদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিজিএমইএ ভবন, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি অপসারণে তার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের কার্যক্রম ছিল প্রশংসনীয়।

তবে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ভবনের সামনে ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়তে হয় সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেও আপত্তি তুলেছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ভাস্কর্যটি সরিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে প্রতিস্থাপন করা হয়।

নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করতে সরকারকে বারবার সময় দেন এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ। এসময় বিচার বিভাগের প্রতি সরকারের মনোভাব নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে ভর্ৎসনা করেন তিনি। এই বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক আদালতের তলবে হাজির হলে প্রধান বিচারপতি বলেন, বিধিমালা নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে ভুল বোঝানো হচ্ছে।

গত ১৮ মার্চ রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সেমিনার হলে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসকে সিনহা বলেন, একটি মহল প্রশাসনকে বিচার বিভাগ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছে। এজন্য বিচার বিভাগের সঙ্গে প্রশাসনের ভুল বোঝাবুঝি চলছে।

সর্বশেষ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে এসকে সিনহা বিভিন্ন মহলে সমালোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। গত ৩ জুলাই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন সুপ্রিম কোর্ট। এরপর পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১ আগস্ট প্রকাশিত হয়। রায় প্রকাশের পর এ নিয়ে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সংক্ষুব্ধ হয়।

ওই পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে সরকার সমর্থিত আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও তোলেন। এই বিতর্কের মুখে এসকে সিনহা ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যান। সেখান থেকে পরে তিনি সিঙ্গাপুর যান এবং সেখানে শুক্রবার বাংলাদেশ দূতাবাসে তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে পাঠান।

 

নিজস্ব প্রতিনিধি/ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon